টিকতে পারলেন না সাইদুল, ১৫ মাসে ৩ ইউএনও বদলী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:১২ পিএম, ১৫ জুলাই ২০২০ বুধবার

টিকতে পারলেন না সাইদুল, ১৫ মাসে ৩ ইউএনও বদলী

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাইদুল ইসলামকে বদলীয় করা হয়েছে। ১৪ জুলাই অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার সেলিম রেজা সাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে এ বদলীর কথা জানানো হয়। এতে জানানো হয়, মো.সাইদুল ইসলামকে সোনারগাঁও থেকে টাঙ্গাইল সদর উপজেলায় বদলী করা হয়েছে। পাশাপাশি টাঙ্গাইল সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতিকুল ইসলামকে তার স্থলাভিষিক্ত হচ্ছেন।

নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের ওয়েব সাইট থেকে জানা যায়, ২২ নম্বর নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হিসেবে ছিলেন অঞ্জন কুমার সরকার। তিনি গত ২০১৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি যোগদানের পর ওই বছরের নভেম্বরে বদলী হন। পরবর্তীতে ওই বছরের ১১ নভেম্বর রকিবুর রহমান খান যোগদান করলেও মাত্র ৪ মাস পরেই ২০২০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি বাদলী হয়ে যান। বর্তমান ইউএনও মো. সাইদুল ইসলাম গত ১ মার্চ যোগদান করেন।

কিন্তু একই তথ্য ভান্ডারে দেখা যায় এর আগে যারাই ইউএনও হিসেবে ছিলেন তাদের প্রত্যেকেই একবছর কিংবা দুই বছর আবার কেউ তাদেরও বেশি সময় সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদের ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সোনারগাঁও আসনের জাতীয় পার্টির এমপি লিয়াকত হোসেন খোকার সঙ্গে স্থানীয় উপজেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা সাইদুল ইসলামের সঙ্গে কিছুদিন ধরেই নানা ইস্যুতে ভেতরগত বিরোধ চলে আসছিল। ক্রমশ সেটা দৃশ্যমানও হচ্ছিল। ওই সময়ে খোকা সমর্থিত লোকজন এ পরিশ্রমী ইউএনও এর বিরুদ্ধেও নানা ধরনের প্রপাগান্ডা, নানা ধরনের মিথ্যে অভিযোগও তুলছিলেন। চেষ্টা করছিলেন কলঙ্কের তিলক এটে দিতে। এ অবস্থায় যখন সোনারগাঁয়ে বিষয়টি বেশ আলোচিত তখন দুইজনকে দেখা গেছে এক মঞ্চে পাশাপাশি টেবিলে।

১০ জুলাই একটি অনুষ্ঠানে যেখন দুইজন বক্তব্য দেন তখন এমপি ও ইউএনও এর বক্তব্যে উঠে আসে সৌহার্দ্যরে কথা। কিন্তু দুইজন বার বার এও বলছিলেন আমাদের মধ্যে কোন বিরোধ ছিল না। কখনোই বিরোধ ছিল না। হয়তো চলার পথে ভুল থাকতে পারে।

সেখানে ইউএনও বক্তব্য দিতে গিয়ে এমপি খোকাকে ‘প্রিয় মানুষ’ আখ্যায়িত করেন। এ শব্দ শুনে বার বার করতালি দেন উপস্থিতিরা। তাছাড়া ইউএনও’র বক্তব্যে বার বার উঠে আসে খোকার গুণকীর্তন।

পরে এমপি খোকা বক্তব্য দিতে গিয়ে বলেন, আমার সঙ্গে কারো কোন বিরোধ নাই। হয়তো চলার পথে ভুল থাকতে পারে। সেটা আলোচনা করলেই শেষ হয়ে যেত। চলার পথে ভুল হলে সেটা আমি আমলে নেই নাই। সেটা আমলে নিলে তো আর মুরুব্বী হতে পারবো না।

কিন্তু এমপির প্রশংসা করার তিনদিন পরেই বদলী হলেন ইউএনও।

জানা গেছে সম্প্রতি সোনারগাঁয়ে মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জন্য সরকারি বরাদ্দের টাকা বণ্টনে অনিয়মের অভিযোগ উঠানো হয় ইউএনও বিরুদ্ধে। ওই উপজেলায় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের তালিকাভুক্ত ৫৯৭টি মসজিদ রয়েছে। যার মধ্যে ৮২টি মসজিদের নামে ডাবল চেক ইস্যু করেন ইউএনও সাইদুল ইসলাম।

এ নিয়ে স্থানীয় এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাও গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, উপজেলার যে মসজিদগুলোর তালিকা করা হয়েছে তার বাইরেও আরও অনেক মসজিদ রয়েছে। আর ৮২টি মসজিদের নামে ডাবল চেক ইস্যুর বিষয়টি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। কারণ ভুল হলে একটি-দুটির ক্ষেত্রে ভুল হতে পারে। এ ছাড়া ইউএনওর বিরুদ্ধে উত্থাপিত আরও কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখতে দুদক ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশনারের কাছে বেশ কয়েকটি অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।

তবে ইউএনও এ ব্যাপারে তার ফেসবুক পেজে বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘‘ঈদুল ফিতর এর আগে করোনা ভাইরাস পরিস্থিতি মোকাবেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সোনারগাঁ উপজেলায় ৫৯৭টি মসজিদের সম্মানিত ঈমাম মুয়াজ্জিনগনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা করে বরাদ্দ প্রদান করেন। এখানে লক্ষনীয় বিষয় এই যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন সোনারগাঁও শাখা আমাকে না জানিয়েই তালিকাটি জেলাতে প্রেরন করে। এটি কেনো করেছে আমার বোধগম্য না। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর প্রেরিত তালিকা অনুযায়ী চেক প্রস্তুত করার জন্য আমি নিজে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা প্রদান করি। প্রস্তুতচেক স্বাক্ষরের সময় আমার কাছে কিছু অসামঞ্জস্যতা ধরা পড়ে যেমন মোট ৮২ টি মসজিদের নাম দুইবার করে দেয়া হয়েছে। সাথে সাথে আমি সেই চেকগুলি নিজের হাতে লাল কালিতে লিখে বাতিল করি। এবং ওই চার লাখ ১০ হাজার টাকা বাদপড়া মসজিদে বরাদ্দ প্রদানের নির্দেশনা দেই। মসজিদের নাম সংগ্রহ করতে এই পেজে একটি স্ট্যাটাসও দেই। ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর প্রস্তুতকৃত তালিকা হতে সাবেক সংসদ সদস্য, উপজেলা চেয়ারম্যান মহোদয়, আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান অনেক রাজনীতিবিদের মসজিদের নাম সহ ঐতিহ্যবাহী অনেক মসজিদের নাম কে বা কারা কৌশলে বাদ দেয়। পরে বিস্তারিত তদন্ত করে জানতে পারি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আল আমিন নামের একজন ফ্লিড সুপারভাইজার কৌশলে টাকা হাতিয়ে নেয়ার জন্য এবং আমাকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিবিদদের কাছে বিতর্কিত করার জন্য দূরভিসন্ধিমূলকভাবে এই কাজটি করেছে। তাৎক্ষণিকভাবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য মন্ত্রনালয়ে একটি প্রতিবেদন দেই।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বর্তমান ইউএনও মো. সাইদুল ইসলাম অল্প সময়ে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। বিশেষ করে করোনাকালীন পরিস্থিতি মোকাবেলায় প্রধানমন্ত্রীর খাদ্য সামগ্রী উপহার মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়ে আলোচনায় আসেন। তাছাড়া করোনা সংক্রামণ রোধে কার্যকারী পদক্ষেপ ও মাঠ পর্যায়ে সামনে থেকে দায়িত্ব পালন করেও প্রশংসিত হন। এছাড়াও সামাজিক কর্মকান্ড ও পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন উপজেলা গড়তে তরুণ সমাজকে নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করেও সফল হন। সব শেষ মেঘনা নদীর তীড়ে জেগে উঠা চরে কয়েক শতাধিক বৃক্ষরোপণ করে ব্যাপক আলোচনায় আসেন।

এরই মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদ কার্যালয়, ইউএনওর বাসভবন ও উপজেলা পরিষদ চত্বরের বিভিন্ন অফিসের সিসি ক্যামেরা বিকল করে দিয়েছে দুষ্কৃতকারীরা। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের একটি মোটরসাইকেল চুরি করে নিয়ে গেছে। গত সপ্তাহে এ ঘটনায় ঘটে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সোনারগাঁও উপজেলা পরিষদ চত্বর, ইউএনওর বাসভবন ও উপজেলা পরিষদ কার্যালয় এলাকা নিরাপত্তার জন্য ১৭টি সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়। গভীর রাতে দুষ্কৃতকারীরা এ সব ক্যামেরার তারগুলো কেটে ফেলে ও অধিকাংশ ক্যামেরা ভেঙ্গে ফেলে।
সোনারগাঁয়ের স্থানীয় লোকজন মনে করেন, এসব প্রশংসনীয় কার্যক্রম করলেও উপজেলার প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধিদের কাছে প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেন। কারণ জনপ্রতিনিধিদের অনৈতিক কর্মকান্ডের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার ফলে এ দ্বন্ধ তৈরি হয়। আর শুরু হয় ইউএনও সাইদুল ইসলামের বিরুদ্ধে একের পর অভিযোগের আঙ্গুল। কোন কিছুতেই যখন ইউএনওকে দমানো যাচ্ছিলো না সবশেষ দুর্নীতির অভিযোগ দেয়া হয়।

প্রথম আলোর সোনারগাঁও সংবাদদাতা মনিরুজ্জামান মনির বলেন, ‘উপজেলা প্রশাসন আর জনপ্রতিনিধির মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকার কথা না। কিন্তু বর্তমানে দু’জনের মধ্যে একটি দূরত্বের খবর আমরা ইতোমধ্যে জানতে পেরেছি। এটা সোনারগাঁয়ে ওপেন সিক্রেট। সাধারণ মানুষ পর্যন্ত সেই বিষয় সম্পর্কে জানেন। তবে দু’জনের কেউ স্বীকার করেন না।’

তিনি আরো বলেন, ‘সাবেক ইউএনও রাকিবুর রহমান খান এখানে থাকা অবস্থায় এমন কোনো কাজ করেন নাই যে জনপ্রতিনিধিরা তাঁকে বয়কট করবে। এখানে নিশ্চয় কোন স্বার্থ জড়িত আছে। আমি যতটুকু জানি রাকিবুর রহমান ভালো মানের অফিসার। সে আসলো কয়েকদিন পর সে খারাপ। কি খারাপ? কয়েকজন তৃণমূল পর্যায়ের ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা ফোরাম করে রাকিবুর রহমানকে বয়কট করে। আমি জনপ্রতিনিধিদের সাথে কথা বলেছি যে এই লোকের অপরাধ কি? সে মাত্র আসলো। কেন সভা বয়কট করা হলো? কোনো জনপ্রতিনিধি উত্তর দিতে পারেনি।’

তিনি বলেন, ‘অল্প কিছুদিন পর পর সোনারগাঁও ইউএনও পরিবর্তন। সারা বাংলাদেশে কোথাও দেখিনি। এখনো শুনতে পাচ্ছি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে দেখতে পাচ্ছি অনেকে লিখছেন যে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে সরে যেতে হবে। কিন্তু এর কারণ বা তাঁর অপরাধ আমার জানা নাই।’


বিভাগ : ফিচার


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও