৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৪, বৃহস্পতিবার ২৩ নভেম্বর ২০১৭ , ১:৪৫ অপরাহ্ণ

বন্দুক শাহীনের উত্থান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলাতেও ছিল অধরা


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:২৮ পিএম, ১৩ অক্টোবর ২০১৭ শুক্রবার


বন্দুক শাহীনের উত্থান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর হামলাতেও ছিল অধরা

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত ও দুর্ধর্ষ মাদক ব্যবসায়ীদের একজন মনিরুজ্জামান শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীন। প্রকাশ্য মাদক বিকিকিনির এ হোতা শহরের মাসদাইর এলাকাতে নিজ বাড়ির ‘রঙ মহলে’ বসেই পরিচালনা করতো মাদক ব্যবসা। আর সে কারণে সেখানে প্রতিদিনই হাজির হতো বিভিন্ন এলাকার মাদকের খুচরা ব্যবসায়ীরা। এ আস্তানায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অনেকবার হানা দিলেও প্রায়শই তাদেরকে মারধরের শিকার হতে হয়। আর তখনই কৌশলে পালিয়ে যেত শাহীন।

তবে শুক্রবার ১৩ অক্টোবর ভোরে অবশ্য সে সুযোগটি দেয়নি জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) যাদের একাধিক দল শাহীনের আস্তানায় গিয়ে হামলা ও মারধরের শিকার হন।

যদিও এলাকাবাসীর অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অস্ত্র নিয়ে অভিযান চালালেও তাদের উপর মাদক ব্যবসায়ীদের হামলা রীতিমত প্রশ্নবিদ্ধ। সবশেষ ২০০৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর শাহীনকে জেলা ডিবি পুলিশ গ্রেপ্তার করলেও এর পর আর তাকে জেলহাজতে যেতে হয়নি।

শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীন মাসদাইর এলাকার আব্দুল জলিল ভূঁইয়ার ছেলে। শাহীনের বিরুদ্ধে একাধিক থানায় হত্যা, মাদক, চাঁদাবাজী সহ ১২টার বেশি মামলা রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক অঞ্চল) মো. শরফুদ্দিন জানান, ‘ভোরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শহরের গলাচিপা এলাকায় বন্দুক শাহীনের মাদকের আস্তানায় অভিযান চালাতে গেলে তার সহযোগিদের নিয়ে ডিবির উপর হামলা চালায় শাহীন। মাদক ব্যবসায়ীরা ডিবি পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে ডিবিও পাল্টা গুলি ছুড়ে। এসময় দুই পক্ষের মধ্যে বন্দুকযুদ্ধে শাহীন নিহত হয়। ঘটনাস্থল থেকে একটি ৭ পয়েন্ট ৬৫ বোরের পিস্তল ও ৪ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে।

শাহীন যেভাবে বন্দুক শাহীন
জানা গেছে, একসময়ের ভালো ব্যাডমিন্টন খেলোয়াড় হিসেবে সুখ্যাতি পাওয়া শাহীন ৯০ এর দশকের শেষ সময়ে স্থানীয় ক্যাডার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৬ সালে পুলিশের একটি থ্রি নট বন্দুক লুট করার পর শাহীনের নামের সঙ্গে যুক্ত হয় বন্দুক শব্দটি।

আলোচিত মাদক ব্যবসায়ি
২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ৪ দলীয় জোট সরকার গঠন করলে ওই সময়ের নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের তৎকালীন বিএনপিদলীয় এমপি মুহাম্মদ গিয়াস উদ্দিনের শেল্টারে শাহীন বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এ সময় ওপারেশন ক্লিনহার্ট অভিযানে গ্রেফতার হলেও গিয়াস উদ্দিনের তদবিরে রক্ষা পায়। ফিরে এসে এলাকায় চাঁদাবাজির সঙ্গে সে ও তার ছোট বোনের স্বামী তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আসলাম শহরের কলেজ রোড এলাকায় শুরু করে ফেনসিডিলের ব্যবসা। ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতা বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকারের মেজ ভাই ব্যবসায়ী নেতা সাব্বির আলম খন্দকার খুনের মামলায় সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন এবং শাহীন আসামি হয়।

শাহীনের মাদক ব্যবসায় প্রত্যক্ষভাবে পরিচালনার দায়িত্ব পায় ‘৪ খলিফা’খ্যাত তার আপন দুই ছোট ভাই মামুন ওরফে বাবা মামুন, মাসুমসহ ইভান ওরফে বাবা ইভান এবং খাজা রনি।

স্থানীয়দের মতে, গলাচিপা ও মাসদাইর এলাকাতে প্রকাশ্যে মাদক বিকিকিনি চলে যার প্রধানতম হলেন শাহীন। ২০১৪ সালে ৭ খুনের ঘটনার পর নূর হোসেন দেশ ত্যাগ করলে পুরো জেলার ইয়াবা ও ফেনসিডিলের একক আধিপত্য চলে আসে বন্দুক শাহীনের কাছে। শতাধিক খুচরো বিক্রেতা প্রকাশ্যেই এসব মাদক ব্যবসা করে থাকে।

এলাকাবাসী জানান, গলাচিপা এলাকার আউয়াল চেয়ারম্যানের বাড়ি থেকে মাসদাইর বাজার পর্যন্ত মোট পাঁচটি এলকায় মাদকের ব্যবসা পরিচালনা করেন বন্দুক শাহীন। ওই এলাকাগুলোতে ফেনসিডিল থেকে শুরু করে, গাঁজা, ইয়াবা, হেরোইনসহ সব ধরনের মাদকদ্রব্য পাওয়া যায়।

এর মধ্যে আউয়াল চেয়ারম্যানের বাগান বাড়ি গলি, কুড়িপাড়া এলাকায় প্রবেশ পথের গলি, মাসদাইর এলাকায় আলমাস আলীর বাড়ির গলি, মাসদাইর রিকশার গ্যারেজ ও মাসদাইর বাজার এলাকায় বন্দুক শাহীনের মাদক ব্যবসা ছিল।

পুলিশ ডিবির উপর বার বার হামলা
গত বছরের ২৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে গলাচিপা এলাকাতে অভিযান চালায়। তখন শাহীন সহ  আসামী সহ অজ্ঞাত আরো ১০-১২ জন বেআইনী জনতাবদ্ধ মারাত্মক অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে পুলিশের আইন সঙ্গত কাজে অন্যায়ভাবে বল প্রয়োগ করে বাধা প্রদান করে। পরে আমাদের উপর আক্রমণ চালায় ও আমাদের উপর ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। আসামীদের ইটের আঘাতে কনস্টেবল হুমায়ূন কবিরের বাম পায়ে গুরুতর রক্তাক্ত কাটা জখম হয়। এছাড়া কনস্টেবল জাহিদুল ইসলাম ও কাজী রেজার শরীরের বিভিন্ন স্থানে নীলাফুলা জখম হয়। ওই মামলায় আসামীর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা মনিরুজ্জামান ওরফে বন্দুক শাহীনকে করা হয়েছে তিন নাম্বার আসামী। প্রধান আসামী হলো খাজা রনি। অপর আসামীরা হলো রিপন ওরফে বুইট্টা রিপন, জয়ন্ত ওরফে সজীব, তারাল মনা, বাবু ওরফে কালা বাবু, সুমন, ইবান, মনির, ইকবাল, রাসেল ওরফে দেবার রাসেল, সজীব, রাব্বি, রিয়াদ, হৃদয়, ফারুক, ডাবলু মাসুদ, চায়না, সাইফুল ইসলাম, ফয়সাল, নাসির, আরমান, শাকিল ওরফে শাইক্কা, সুমন ২, আয়নাল হক, হারুন ও নান্টু।

গত বছরের ৭ জুলাই সন্ধ্যায় মাসদাইরে ডিবি পুলিশের অভিযানে মনিরুজ্জামান শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীনের উকিল মেয়ের জামাতা সাইফুল ইসলাম (২৮) ও তার সহযোগি শাকিল ওরফে পিচ্চি শাকিলকে (২৪) কয়েক বোতল ফেনসিডিল সহ আটক করা হয়। পরে বন্দুক শাহীনের বোন লাভলী, সহযোগি মাহাবুব, মনির ও রবিন সহ আরো কয়েকজন মিলে ডিবি পুলিশের উপর হামলা করে সাইফুল ইসলাম ও পিচ্চি শাকিলকে ছিনিয়ে নেয়।

ওই সময়ে ডিবির ওসি মামুনুর রশিদ মন্ডল জানিয়েছিলেন, দুই মাদক বিক্রেতাকে আটকের সময়ে অভিযান চালানোর সময়ে তারা পালিয়ে যায়। ওই দুইজনের কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি। ওই ঘটনায় ডিবি কোন মামলাও করেনি।

২০১৩ সালের ৩ মে মাসদাইরে একই স্থানে জেলা গোয়েন্দা পুলিশের এসআই সফিকুল ইসলাম ও এএসআই মনিরের নেতৃত্বে ডিবি পুলিশের একটি টিম অভিযান চালায়। অভিযানের সময় বাড়ির ছাদে অবস্থান করছিল বন্দুক শাহীন। এ সময় তারা ফেনসিডিলসহ তার ছোট ভাই মামুনকে আটক করে। পরে ফেনসিডিলসহ মামুনকে ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে আসার সময় মামুনকে ছিনিয়ে নিতে হামলা চালায়। ওই ঘটনায় ১১ জনের নাম উল্লেখ করে ৪৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে পুলিশ। এসব আসামীদের মধ্যে শাকিল ও সাইফুল ইসলামকেই গত ২৭ জুলাই ছিনতাই করে নিয়ে যায় সহযোগিরা।

২০১৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি রাতে শহরের গলাচিপা রূপার বাড়ি এলাকায় শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীনকে আটক করতে অভিযান চালায় র‌্যাবের একটি টিম। ওই সময়ে শাহীনের লোকজন র‌্যাব সদস্যদের ডাকাত আখ্যা দিয়ে মারধর করে এবং তাদের একটি মটরসাইকেল পুকুরে ফেলে দেয়। এ ঘটনায়ও শাহীন ওরফে বন্দুক শাহীনকে প্রধান আসামী করে ৯জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ৩০-৪০জনকে আসামী করা হয়।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ