৮ আষাঢ় ১৪২৫, শুক্রবার ২২ জুন ২০১৮ , ৩:৩৭ অপরাহ্ণ

বেঁচে যাচ্ছে জামায়াত শিবির, ফাঁসছে বিএনপি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫০ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০২:৫০ পিএম, ৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার


বেঁচে যাচ্ছে জামায়াত শিবির, ফাঁসছে বিএনপি

‘এতদিন ধরে জানতাম বিএনপির চেয়ে বেশী বর্বর দল জামায়াতে ইসলাম ও শিবির। কিন্তু হঠাৎ করে সেখানে ইউটার্ন দেখলাম যা বেশ প্রশ্নের সৃষ্টি। আমাদের বিএনপির সবার বিরুদ্ধে মামলা হলো কিন্তু জামায়াত শিবিরের কারো বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।’

নারায়ণগঞ্জে বিএনপির একজন সিনিয়র নেতা বেশ আক্ষেপ করেই কথাগুলো বলছিলেন।

নারায়ণগঞ্জে সম্প্রতি কয়েকটি মামলা নিয়ে বেশ আলোচিত হচ্ছে যেখানে বিএনপি নেতাদের আসামী করা হলেও তালিকাতে নেই জামায়াতের কোন নেতার নাম যাদের নেতৃত্বে চলছে ২০ দলীয় জোট। গত কয়েকদিনে নারায়ণগঞ্জ ৭ থানার মধ্যে ৬ থানা পুলিশ পৃথকভাবে ৭টি মামলা করেছে যেখানে বিএনপি ও এর সহযোগি সংগঠনের ৩৬০ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো অন্তত ৫০০জনকে আসামী করা হয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব মামলায় এমন কয়েকজনকে আসামী করা হয়েছে যারা বর্তমানে দেশের বাইরে রয়েছেন। বড় অবাকের বিষয় হলো কোন মামলাতেই জামায়াত সংশ্লিষ্টদের আসামী করা হয়নি।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, আওয়ামী লীগ ও প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের নেতাদের কণ্ঠে বেশীরভাগ সময়ে নাশকতাকারী হিসেবে জামায়াত শিবিরের নাম বেশী এসেছিল। সে হিসেবে গত কয়েকদিন ধরেই যেসব মামলা হয়েছে সেখানে নেই জামায়াতের নাম। অথচ মামলাতে দেখা গেছে বিএনপির এমন নেতাদের নাম দেওয়া হয়েছে যারা এখন দেশেই নাই। আছেন মারাত্মক অসুস্থ ও ইদানিং রাজনীতি বিমুখদের নামও। এসব নিয়ে দলের ভেতরে দেখা দিচ্ছে সমালোচনা। অনেকেই এসব মামলার ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, বছরখানেক আগেও জামায়াতে ইসলাম ও শিবিরকে টার্গেট করে প্রশাসনের অভিযান চলতো আর সেখানে বিএনপিকে ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন বিষয়টি উল্টো হচ্ছে। এখন জামায়াতকে একটু সাইড দিতে দেখা যাচ্ছে অনুমেয়। সাম্প্রতিক মামলারগুলোর অভিযোগ ও আসামীদের তালিকা দেখলেই এসব বোঝা যায়।

সবশেষ ২৭ জানুয়ারি এক সভায় শামীম ওসমান বলেন, ‘অনেকে বলেন নারায়ণগঞ্জে আওয়ামী লীগ বিএনপি জামায়াত সমান। কিন্তু আমি বলবো আওয়ামী লীগের সমান কেউ হতে পারে না। যে জামায়াত বিএনপি বাসে আগুন দিয়ে মানুষ হত্যা করে অন্তত তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কখনো এক হতে পারে না। যারা বিএনপি ও জামায়াতকে খুশী করে ক্ষমতার স্বাদ ভোগ করতে চান তাদের মনে রাখতে হবে এক সময়ে তারাই আপনাকে ছোবল দিবে। আগামীতে নারায়ণগঞ্জে বিএনপি জামায়াত নাশকতার পরিকল্পনা করছে। ওরা ওদের সর্বশক্তি নিয়োগ করবে। তারা চায় লিংক রোড, সাইনবোর্ড, কাঁচপুর দখল করতে। কারণ এসব দখল করতে পারলে এক্সপোর্ট ইমপোর্ট বন্ধ হয়ে যাবে। তারা চায় আমাকে ঘায়েল করতে। কারণ আমাকে ঘায়েল করতে পারলে তারা সফলকাম হবে। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে এটা নারায়ণগঞ্জ। এখানে আওয়ামীলীগের জন্ম। এখান আওয়ামী লীগ ছাড়াই কেউ টিকতে পারবে না।’

জানা গেছে, সদর উপজেলার ফতুল্লায় নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের আহবায়ক ও সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদকে প্রধান আসামী করে ৪০ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা আরো ৫০/৬০ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের হয়েছে। ৬ ফেব্রুয়ারী মঙ্গলবার দিনগত রাত ১২টায় দিকে ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) শাফিউল আলম বাদী হয়ে মামলা দায়ের করে।

পুলিশ মামলায় উল্লেখ করেন, মঙ্গলবার রাত ১১টায় ফতুল্লার কাশিপুর সম্রাট হল সংলগ্ন বিএনপি নেতা হারুন অর রশিদের রিকশার গ্যারেজে বসে মহানগর যুবদলের আহবায়ক ও সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদের নেতৃত্বে ঢাকা-মুন্সিগঞ্জ সড়ক অবরোধসহ বিভিন্ন স্থানে নাশকতার পরিকল্পনায় গোপন বৈঠক করছিল। এমন একটি সংবাদে ফতুল্লা থানা পুলিশের দুটি টিম গিয়ে অভিযান চালাতে গেলে বিএনপির নেতাকর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। এসময় তারা কয়েকটি ককটেল ফাটিয়ে পালিয়ে গেলেও দৌড়ে ৪ জনকে আটক করা হয়। পরে ঘটনাস্থল হতে কয়েকটি ককটেল, লাঠিসোটা ও ইটপাটকেল উদ্ধার করা হয়।

সদর মডেল থানার এস আই জয়নাল আবেদীন খান বাদী হয়ে ৪ ফেব্রুয়ারি রোববার রাতে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক আইনে মামলাটি দায়ের করেন। মামলায় ৩৪ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে সোমবার আটক মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান ও বিএনপি নেতা আনোয়ার প্রধান, রোববার রাতে আটক জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুকুল ইসলাম রাজীব ও সিটি করপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসরাফিল প্রধানকে ওই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তাদেরকেও আসামী করা হয়েছে। অপর আসামীরা হলো বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার, ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শাহ আলম, ফতুল্লা থানা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মনিরুল আলম সেন্টু, মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল, বিলুপ্ত শহর বিএনপির সভাপতি জাহাঙ্গীর কমিশনার, সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর যুবদলের আহবায়ক মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ, সবুজ, মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক রানা মুজিব, মহানগর ছাত্রদলের আহবায়ক ও মহানগর বিএনপির সহ সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম সজল, মহানগর ছাত্রদলের যুগ্ম আহবায়ক রাশিদুর রহমান রশু, মোশারফ হোসেন রুবেল, মহানগর যুবদলের যুগ্ম আহবায়ক মোয়াজ্জেম হোসেন মন্টি, মহানগর বিএনপির প্রচার সম্পাদক সুরুজ্জামান, সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান, বিলুপ্ত শহর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আহম্মেদ, বিএনপি নেতা নুরুল হক চৌধুরী দিপু, দর্পন প্রধান, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক আকরাম প্রধান, জেলা ছাত্রদলের য্গ্মু আহবায়ক মশিউর রহমান রনি, রিয়াদ হোসেন, যুবদল নেতা মাহাবুব হাসান জুলহাস, মহানগর ছাত্রদলের য্গ্মু আহবায়ক শাহেদ আহম্মেদ, জেলা ছাত্রদলের য্গ্মু আহবায়ক ফতেহ মোহাম্মদ রেজা রিপন, আরাফাত, মহিউদ্দিন, ফারুক আহম্মেদ, রিপন ওরফে পিচ্চি রিপন, অ্যাডভোকেট আব্দুল হামিদ খান ভাষানী, মনির হোসেন, লিখন ওরফে লিখন সরকার, রিটন দে, আনোয়ার হোসেন। এছাড়াও অজ্ঞাতনামা ১০ থেকে ১৫জন।

মামলায় পুলিশ উল্লেখ করেন আগামী ৮ ফেব্রুয়ারী বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার দুর্নীতি মামলার রায়কে কেন্দ্র করে সরকারকে উৎখাত করার পরিকল্পনায়সহ নানা ধরনের নাশকতার পরিকল্পনায় রোববার বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বিএনপিসহ ২০ দলীয় নেতাকর্মীরা গোপন বৈঠক করে। তাদের পরিকল্পনা করছিল সরকারকে উৎখাত করার লক্ষ্যে সড়ক পথ, নৌ-পথ, রেলপথ অচলসহ মিল কারখানা বন্ধ করার বৈঠক করছিল। এসময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদেরকে বাধা দেয়া হয়। পরে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় রাজীবকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছে।

অপরদিকে ৪ বিএনপি নেতাকর্মীসহ ২০ জনের নাম উল্লেখ করে ও ৩০ থেকে ৪০ জনকে অজ্ঞাত আসামী করে বন্দর থানায় এ মামলা দায়ের হয়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক নজরুল ইসলাম আজাদ ও উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক জুয়েল হোসেনকে আসামি করে একটি বিশেষ ক্ষমতা আইনে নাশকতার মামলা দায়ের করেছে আড়াইহাজার থানা পুলিশ। ৫ ফেব্রুয়ারি সোমবার বিকেলে আড়াইহাজার থানা পুলিশের এসআই আরিফুল ইসলাম বাদি হয়ে ৩৬ জন নাম উল্লেখ করে মামলাটি দায়ের করেন। ৪ ফেব্রুয়ারী রূপগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো: সাব্বির বাদী হয়ে রূপগঞ্জ থানায় মামলাটি দায়ের করে। মামলার আসামীদের মধ্যে কাঞ্চন পৌরসভার মেয়র আবুল বাশার বাদশাহসহ ৬জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।  ৯৪জনকে আসামী করে সোনারগাঁ থানার এসআই মুজিবুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। অপরদিকে সোনারগাঁ থানার এএসআই এনামুল হক ৮৯জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করেন। বিএনপি দলীয় সাবেক এমপির দুই ছেলে সহ ১০জনের বিরুদ্ধে গাড়ি ভাঙচুরের অভিযোগে মামলা করেছে পুলিশ। এর মধ্যে দুইজন নির্বাচিত কাউন্সিলর রয়েছে। ওই মামলায় রোববার দুপুরে সিটি করপোরেশনের ৯ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি বাবুল প্রধানকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ