১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৫, শনিবার ২৬ মে ২০১৮ , ১:৫৮ অপরাহ্ণ

ভ্যালেন্টাইন স্পেশাল

কাউন্সিলর খোরশেদের স্কুল জীবনের প্রেম


মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ || কাউন্সিলর ১৩ নং ওয়ার্ড ও আহবায়ক মহানগর যুবদল

প্রকাশিত : ০৮:৫৬ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ মঙ্গলবার | আপডেট: ০৮:৫৮ পিএম, ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ বুধবার


কাউন্সিলর খোরশেদের স্কুল জীবনের প্রেম

মধ্যবিত্তের ভালবাসা নিয়ে প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহম্মেদের একটি জনপ্রিয় উক্তি আছে। তিনি তার একাধিক উপন্যাসে বলেছেন,“মধ্যবিত্তের প্রেম ভালবাসার শুরুটা হয় নিজের চাচাতো, মামাতো, খালাতো ভাই বোনের মধ্যে”। হুমায়ুন আহম্মেদ স্যারের ভালবাসা বিষয়ক তত্ত্ব¡টি আমার জীবনে ফলেছে অক্ষরে অক্ষরে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসাবে আমার জীবনেও ভালবাসার হাতেখড়ি চাচাতো বোন লুনাকে ভাল লাগার মধ্য দিয়ে। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ভাল লাগার অনুভূতি হওয়ার পরে যাকে প্রথম ভাল লেগেছে সেই লুনার সাথেই দীর্ঘ দেড় যুগের প্রেম পর্বের কন্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে জীবন সঙ্গী করেছি। যা আমার জীবনে আল্লাহর অশেষ রহমত।

স্কুল জীবনের ভাললাগা কলেজ জীবনে এসে পরিণত হয় ভালবাসায়। লুনারা থাকত ঢাকার মিরপুরে, আমরা নারায়ণগঞ্জে। প্রেমের প্রথম দিকে পারিবারিক অনুষ্ঠানাদিই ছিল আমাদের দেখা সাক্ষাতের একমাত্র সুযোগ। তাই আমরা দুই জনই কোন আত্মীয় স্বজনের অনুষ্ঠান মিস করতাম না। আমাদের বিভিন্ন দিকের কাজিনদের মধ্যে আমরা বেশ জনপ্রিয় ছিলাম। ওরাই আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দিত। মাঝে মাঝে ল্যান্ড ফোনে কথা হতো,তাও খুব কম সময়ের জন্য। আবার কখনো দশ বার ফোন করলে একবার লুনা ধরার সুযোগ পেত, অন্য কেউ ধরলে রেখে দিতাম। আর আমার বাবার ভয়ে লুনা আমাদের বাসার ফোনে কখনো ফোন দিত না। লুনাদের প্রাইভেট কারের দীর্ঘদিনের ড্রাইভার আব্বাস ভাইও ছিল আমাদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। লুনার চিঠি আব্বাস ভাই আমাকে পোস্ট করে দিত, আর আমি আব্বাস ভাইয়ের ঠিকানায় চিঠি পাঠাতাম। সেই চিঠি তিনি লুনাকে পৌছে দিতেন। দীর্ঘদিন এভাবে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই আমাদের প্রেম চলেছে।

১৯৯৩ সালে এসএসসি পাশ করে লুনা ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হয়। আর আমি ১৯৯৪ সালে ডিগ্রী পাশ করে শাব্বির ভাইয়ের সাথে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করি। ইচ্ছা করেই আমি গার্মেন্টের কমার্শিয়াল বিভাগের দায়িত্ব নেই। ফলে ব্যাংক, ইপিবি, বিজেএমইএ, শিপিং লাইন, বায়িং হাউজ ইত্যাদির কাজে সপ্তাহের ৬ দিনই আমার ঢাকা যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দুপুরের মধ্যে অফিসিয়াল কাজ শেষ করে প্রতিদিনই আমার গন্তব্য ছিল সিটি কলেজের কাছের এলিফ্যান্ট রোডের “ডাক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে”। কেউ দেখে ফেলার ভয়ে আমরা কখনো পার্কে বা রিক্সায় ঘুরতাম না।

এতদিন নীরবে দু’জনের মন দেয়া নেয়া, চিঠি চালাচালি, দেখা সাক্ষাৎ চললেও ১৯৯৫ সালের দিকে উভয় পরিবারের মধ্যে আমাদের সর্ম্পকের কথা জেনে যায়। যথারীতি শুরু হয় বিভিন্ন ঝামেলা। যেহেতু আমরা আপন চাচাতো ভাই বোন সেই জন্যই আমার পরিবার বেশী আপত্তি তোলে। তাদের প্রধান যুক্তি মেডিক্যাল সাইন্স অনুযায়ী একই পরিবারের মধ্য বৈবাহিক সম্পর্ক হলে সন্তান প্রতিবন্ধি হওয়ার সম্ভবনা থাকে। অতএব আমাদের সর্ম্পক কোন ভাবেই মেনে না নেয়ার জন্য উভয় পরিবার ঐক্য জোট করে। অপর দিকে আমি ও লুনাও মনস্থির করি আমাদের ভালবাসার চুড়ান্ত পরিণতি দিতে হবে। তবে আমরা উভয়েই আমার বাবাকে এত ভয় পেতাম যে তার বিরুদ্ধে গিয়ে কখনো কিছু করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এবং আমাদের পরিবার তো দূরের কথা আমাদেও বংশে কিংবা এমন কোন পারিবারিক বন্ধু বা শুভাকাংখী নাই যে আমার বাবাকে ম্যানেজ করতে পারে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যত দিনই লাগুক না কেন, যতই কষ্টই হোক না কেন আমরা আমাদের পরিবারের সম্মতি আদায় করেই ও তাদের আয়োজনেই যা কিছু করার করবো। কোনদিনই বাবা মায়ের অসম্মতিতে কিছু করবো না।

বছরের পর বছর চলতে থাকে আমাদের অপেক্ষার পালা। সময়ের ব্যবধানে লুনা ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বি,কম ও জগন্নাথ কলেজ থেকে এম.কম পাশ করে ফেলে। ১৯৯৮ সালে এম.কম পাশ করার পরে লুনার পরিবার লুনাকে বিয়ের জন্য প্রচন্ড চাপ দিতে শুরু করে। প্রায় প্রতিদিনই লুনাকে তার পরিবারের সম্মখীন হতে হয়। লুনা এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে রাগ করে একদিন ওর বান্ধবী জয়ার বাসাবোর বাসায় চলে আসে। ততদিনে আমি কোম্পানীর কাজে মোবাইল ফোন পেয়েছি। লুনা আমাকে ফোন করে জয়ার বাসায় যেতে বলে। দুপুরের দিকে জয়ার বাসায় গিয়ে জানতে পারি লুনা বাসা থেকে চলে এসেছে,আর বাসায় ফিরবে না। যেহেতু পরিবারের সম্মতির বাইরে আমার কিছু করার সাহস নেই, সেহেতু বাধ্য হয়েই একটা রাজাকারী বুদ্ধি আটি। লুনাকে বলি আজকে তো আমি রেডী হয়ে আসিনি, আজ তুমি জয়াদের বাসায় থাকো। কাল সকালে এসে তোমাকে আমি নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাব। লুনাও সরল মনে আমার কথা বিস্বাস করে। আমি জয়াদের বাসা থেকে বেড়িয়ে রিক্সা নিয়ে মতিঝিলে এসে আমার আরেক চাচাতো ভাইকে ফোন করে জানিয়ে দেই লুনা জয়াদের বাসায় আছে। কিছুক্ষন পরেই লুনার ভাই ভাবী ওকে জয়াদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে আসে। লুনার সাথে বেঈমানী করে ওই সময় কষ্ট পেলেও আজো ঐদিনের কথা মনে করে হাসি পায়।

আমাদের বয়সের চেয়ে আমাদের প্রেমের তুলনামূলক বয়স অনেক বেশী। বলতে ও শুনতে আশ্চর্য লাগলেও আমাদের ভাললাগা ও প্রেমের বয়স দেড় যুগ। দেড় যুগ সাধনার পরে আল্লাহ মুখ তুলে তাকালেন আমাদের দিকে। আমার বাবার ভয়ে এতদিন কেউ সাহস না করলেও অবশেষে তৈমূর ভাইয়ের সম্মতি নিয়ে শাব্বির ভাই আমার বড় বোনকে সাথে নিয়ে আব্বার সাথে কথা বলেন ও আমাদের একাগ্রতার কথা বলে কোনমতে রাজী করান। অবশেষে ২০০১ সালের ২৫ মে পারিবারিক ভাবে আমাদের বিয়ে হয়। শুরু হয় নতুন জীবনের।

লুনা একাধারে যেমন আমার প্রেমিকা, তেমনি আমার বন্ধুও। লুনা স্ত্রীর চেয়ে আমার বন্ধুই বেশী। বিয়ের পরের বছরই আমি কাউন্সিলর হই,পাশাপাশি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হই। সমাজ সেবা,রাজনীতি,ব্যবসা করে বাড়ী সামলানোর মত সময় আমি এখনো করতে পারি না। যদি লুনার ব্লাইন্ড সমর্থন ও সহযোগিতা না পেতাম তবে আমার ২য় বার কাউন্সিলর হওয়া কঠিন হত। অন্য দশ জন স্বামীর মত আমাকে যদি বাড়ীর বাজার,বাচ্চার স্কুল,পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে হতো তবে আজকের খোরশেদ আমার হওয়া হতো না। আমাদের প্রেমে আমার বাবার সবচেয়ে বেশী বাধা থাকলেও শেষ পর্যন্ত লুনাকেই তিনি আমার চেয়ে বেশী প্রধান্য দিতেন। আমার মায়ের দীর্ঘ চিকিৎসার দায়িত্ব লুনা যেভাবে পালন করেছে সে ঋন আমি কোনদিন শোধ করতে পারবো না। লুনা গর্ভবতী অবস্থায়ও মধ্যরাতে মাকে নিয়ে হাসপাতালে ছুঠে গেছে। আজ যে ডুপ্লেক্স বাড়ী তারও একক কৃতিত্ব লুনার। আমার নিজের প্রতি নিজের যে অবহেলা তাতে আমার পক্ষে কুড়েঘর বানানোও কষ্ট হতো। আমার বোন ভাগ্নি, ভাবী ভাতিজীদের সবার প্রিয় লুনাই এখন আমাদের পরিবারের লিয়াজো অফিসার। লুনা আছে বলেই আমি মাসের পরে মাস, বছরের পর বছর ফেরারী থাকতে পারি, রাজনীতিতে নাম করতে পেরেছি। মানুষের জন্য নিজের সময় বিলিয়ে দিতে পারছি। আমার বাবা মায়ের পরে তৈমূর ভাই যেমন আমার ভরসাস্থল। তেমনি লুনাও আমার শেষ ভরসা। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমরা ৩ সন্তানের পিতা-মাতা। সবার কাছে আমি আমার পরিবারের সবার জন্য দোয়া চাই। দোয়া করবেন লুনা যেন সব সময় এভাবেই পরিবারকে আগলে রাখতে পারে। তবেই আমি নিজেকে মানুষের সেবায় সার্বক্ষনিক নিয়োজিত রাখতে পারবো।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ