৪ আষাঢ় ১৪২৫, সোমবার ১৮ জুন ২০১৮ , ৩:২৬ অপরাহ্ণ

৮০ লাখ বাণিজ্য : আসামী ‘জামাই আদরে’, ডিবির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ১০:০৯ পিএম, ৫ মার্চ ২০১৮ সোমবার | আপডেট: ০৪:০৯ পিএম, ৫ মার্চ ২০১৮ সোমবার


৮০ লাখ বাণিজ্য : আসামী ‘জামাই আদরে’, ডিবির ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ

নারায়ণগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের জন্য কোচিং সেন্টার খুলে ২০ জন চাকরি প্রার্থীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা করে সর্বমোট ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় আসামী না হলেও গ্রেফতারকৃত পুলিশ কর্মকর্তাকে জামাই আদরে রাখা হয়েছে বলে গুরুত্বর অভিযোগ পাওয়া গেছে। গ্রেফতারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তাকে কোন সরকারী হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে একটি বেসরকারী হাসপাতালে রেখে অসুস্থ প্রচার করে জামিনের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছে তার আইনজীবীরা। সে প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।

অপরদিকে আসামীকে রিমান্ডে না নিয়ে এবং তাকে পুলিশ হাসপাতাল কিংবা সরকারী কোন হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে আসামীকে বেসরকারী হাসপাতালে ভর্তি করানোর কারণে মামলার তদন্তকারী সংস্থা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ইমেজও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। গ্রেফতারকৃত ওই পুলিশ কর্মকর্তা ও তার নেপথ্যের গডফাদারদের যেন বাঁচানোর মিশনে নেমেছে ডিবি পুলিশ এমন অভিযোগও করেছেন অনেকে। যদিও এ ধরনের অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারক।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের জন্য কোচিং সেন্টার খুলে ২০ জন চাকরি প্রার্থীদের প্রত্যেকের কাছ থেকে ৪ লাখ টাকা করে সর্বমোট ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় এজাহারনামীয় আসামী না হলেও গ্রেফতারকৃত পুলিশ কর্মকর্তাকে রিমান্ডে নিয়ে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসবে নাটের গুরু কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধানসহ জড়িত অন্যদের নাম আসতে পারে বলে মনে করছেন স্থানীয় এলাকাবাসী। ঘটনার শুরুতে ওই কোচিং সেন্টার এবং অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে বিতর্কিত ওই ইউপি চেয়ারম্যানের জড়িত থাকার অভিযোগ শোনা গেলেও রহস্যজনক কারণে দেলোয়ার প্রধানের বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায়। কারণ যে ২০ জন প্রতারণার শিকার হয়েছে তাদেরকে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ পরীক্ষার দিন ফতুল্লার মাসদাইরে অবস্থিত পুলিশ লাইনসে শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষার দিন নিয়ে গিয়েছিল চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধানের লোকজন। আর তার লোকজন কর্তৃক পুলিশ লাইনসে নেয়ার বিষয়টি ওইদিন গণমাধ্যমের কাছে স্বীকারও করেছিলেন দেলোয়ার হোসেন প্রধান।

এদিকে গ্রেফতারকৃত এএএসআই শাহাবুদ্দিনকে হাসপাতালে রেখে অসুস্থ প্রচার করে জামিনের জন্য আবেদন করতে যাচ্ছে তার আইনজীবীরা। সে প্রস্তুতিও ইতোমধ্যে চূড়ান্ত হয়েছে।

জানা গেছে, গত ২৪ ফেব্রুয়ারী সকাল থেকে বিকেল অবধি ফতুল্লার পুলিশ লাইনসের মাঠে প্রথম ধাপে শারিরীক ফিটনেসের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ওই শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় পুরুষ কনস্টেবল পদে হাজারো যুবক ও নারী কনস্টেবল পদে শতাধিক যুবতী অংশ নেয়। শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় সর্বমোট ৬ শতাধিক উত্তীর্ন হন।

তবে ওইদিন গত ২৪ ফেব্রুয়ারী শারিরীক পরীক্ষায় অর্থ প্রদানকারী যুবকদের অনেকেই বাদ পড়লে ৮০ লাখ টাকা আত্মসাতের বিষয়টি ফাঁস হয়ে যায়।

ওই সময় অভিযোগ উঠেছিল পুলিশের ঢাকার বিশেষ শাখার (এসবি) সহকারী উপ পরিদর্শক (এএসআই) শাহাবুদ্দিনের সঙ্গে বন্দর উপজেলার কলাগাছিয়া ইউনিয়নের বাইতুল্লাহ মসজিদের পূর্বপাশে গালাক্সি স্কুলের ভেতরে প্রতাশা নামে পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে একটি কোচিং সেন্টার খুলে ২০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে জনপ্রতি ৪ লাখ টাকা করে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার সঙ্গে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা দেলোয়ার প্রধানও জড়িত ছিল। কারণ ওই ২০ জন চাকুরী প্রার্থী যুবকদের গত ২৪ ফেব্রুয়ারী এএসআই শাহাবুদ্দিন দালাল বাদশার মাধ্যমে এবং চেয়ারম্যান দেলোয়ার প্রধান তার দফাদার (চৌকিদার) আসাদ, আনাছ মিয়া, আবু নাইম, শিপন, অনিকসহ কয়েকজনের পুলিশ লাইনসে পাঠান শারিরীক ফিটনেস পরীক্ষায় অংশ নেয়ার জন্য।

২৪ ফেব্রুয়ারী রাতে কলাগাছিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার প্রধানের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি বলেছিলেন, দফাদার আসাদুল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদের দফাদার হিসেবে কর্মরত। তার ছেলে এবং মেয়ে দুজনই পুলিশের চাকুরী করে। আমার ইউনিয়নের অনেক ছেলেপেলে পুলিশের চাকুরীতে আবেদন করেছে। তাদের বলেছি আসাদুল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করতে। সে তাদের অনেক বিষয়ে বুঝিয়ে দিবে। এখন টাকা পয়সার কথা আসবে কেন। তার দুই ছেলে মেয়ে চাকুরীতে ঢুকতে ১০০ টাকাও লাগে নাই।

এদিকে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর ২৫ ফেব্রুয়ারী সকালে পুলিশ অভিযান চালিয়ে যে ১৪ জনকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল তাদের মধ্যে দেলোয়ার হোসেন প্রধানের অনুগামী হিসেবে পরিচিত কলাগাছিয়া ইউনিয়নের শুভকরদী এলাকার মৃত আব্দুল রব মিয়ার ছেলে দফাদার (চৌকিদার) আসাদুল্লাহ (৫০) ও কলাগাছিয়া নিশং এলাকার শাহাবুল্লাহ মিয়ার ছেলে দফাদার (চৌকিদার) মনির হোসেনকেও আটক করা হয়েছিল। তবে রহস্যজনক কারণে তাদের বিষয়টি এড়িয়ে গেছে পুলিশ। অথচ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান নিজেই গণমাধ্যমের কাছে স্বীকার করেছিলেন তিনি আসাদুল্লাহর মাধ্যমে চাকুরী প্রার্থীদের পুলিশ লাইনসে পাঠিয়েছিলেন। তিনি যদি জড়িত নাই থাকতেন তাহলে তিনি কেন চাকরি প্রার্থীদেরকে তার অনুগামীদের দ্বারা পুলিশ লাইনসে পাঠাবেন।

এদিকে আগেও যেমন বহু অপকর্ম করে অবৈধ অর্থবিত্তের জোরে ইউপি চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন প্রধান পার পেয়ে গিয়েছিল তেমন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগের প্রতারণার ঘটনাতেও দেলোয়ার হোসেন প্রধানের জড়িত থাকার বিষয়টি চাপা পড়ে গেছে। যদিও স্থানীয়রা বলছেন, চাকুরী প্রার্থীদের সকলেই স্থানীয় মধ্যবিত্ত ও নি¤œবিত্ত ঘরের সন্তান। অপরদিকে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান একদিকে যেমন বিত্তশালী অপরদিকে ক্ষমতাসীন দলের ছত্রছায়ায় জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে সে আরো বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে বিগত দিনে তেল চুরির পাশাপাশি অবৈধ গ্যাস সংযোগের বাণিজ্যসহ ভূমিদস্যুতা ও নানান অপকর্ম করে ইউপি চেয়ারম্যান ও জাপা নেতা দেলোয়ার হোসেন প্রধান কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেলেও প্রশাসনের কাছে সে অনেকটা দুধে ধোয়া তুলশী পাতার মতোই। যদিও তার বিরুদ্ধে দুদক অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিল কিন্তু তারপরেও সে রয়েছে বহাল তবিয়তে। যে কারণে প্রতারণার শিকার ওই যুবকরা দেলোয়ার হোসেন প্রধানের জড়িত থাকার বিষয়টি জেনেও ভয়ে না জানার ভান করে থাকতে পারে। অথবা স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন দেলোয়ার হোসেন প্রধানের সঙ্গে সখ্যতা থাকার কারণে তাকে ছাড় দিয়ে থাকতে পারে এমনটিই মনে করছেন স্থানীয় অধিবাসীরা। কারণ এর আগেও বন্দরে আলোচিত শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তের লাঞ্ছনার ইস্যুতে দেলোয়ার হোসেন প্রধানের জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলেও কোন এক অদৃশ্য কারণে তার নাম চাপা পড়ে যায়।

কথায় আছে চোরের দশদিন আর পুলিশের এক দিন অর্থাৎ পুলিশ কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিনকে রিমান্ডে নিয়ে সঠিকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই বেরিয়ে আসতে পারে দেলোয়ার হোসেন প্রধানের নাম। আর কান টানলে যেমন মাথা আসে তেমনি দেলোয়ার হোসেন প্রধানকে আইনের আওতায় আনলে বেরিয়ে আসবে তার অপকর্মের গডফাদারদেরও নাম এমনটিই মনে করছেন এলাকাবাসী। কারণ অবৈধ অর্থের জোরে দেলোয়ার হোসেন প্রধান অনেক অপকর্ম করেও বার বার ধরা ছোয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

অপরদিকে পুলিশ কর্মকর্তা শাহাবুদ্দিনকে পুলিশ হাসপাতাল কিংবা সরকারী কোন হাসপাতালে ভর্তি না করিয়ে কেন বেসরকারী পপুলার হাসপাতালে ভর্তি করা হলো সেটা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

জানা গেছে, এএসআই শাহাবুদ্দিনকে অসুস্থতার ভান করে পপুলার হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। সে ওই হাসপাতালের বেডে সময় পার করলেও তার গুরুত্বর কোন অসুখ হয়নি। শুধুমাত্র উচ্চ আদালত থেকে জামিনের ব্যবস্থা করানোর জন্যই তাকে ওই হাসপাতালে ভর্তি রাখা হয়েছে। এছাড়া এএসআই শাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতারের ৬ দিন ইতিমধ্যে অতিবাহিত হলেও তাকে রিমান্ডে নেয়ার জন্য কোন ধরনের আবেদন করেনি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারক। এতে করে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

এএসআই শাহাবুদ্দিনের অসুস্থতার বিষয়ে জানতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের পরিদর্শক মোহাম্মদ রাশেদ মোবারকের মুঠোফোনে কল করা হলে তিনি জানান, এএসআই শাহাবুদ্দিন এর আগে ব্রেন স্ট্রোক করেছিল। তার হার্টেও সমস্যা রয়েছে। সে বিবিধ রোগে আক্রান্ত। সে পুলিশ প্রহরায় চিকিৎসাধীন রয়েছে। এএসআই শাহাবুদ্দিনকে কেন পুলিশ হাসপাতাল কিংবা সরকারী কোন হাসপাতালে রাখা হলো সে বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তার উর্ধ্বতনরাই ভাল বলতে পারবেন। তিনি এ বিষয়ে ওসি ডিবির সঙ্গে কথা বলতে বলেন। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা তিনি হলেও তার উপরে ওসি এসপি রয়েছেন। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই এএসআই শাহাবুদ্দিনকে বেসরকারী হাসপাতালে রাখা হয়েছে। কারণ একটা মানুষের জীবন সবার আগে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে এএসআই শাহাবুদ্দিনকে গ্রেফতার এবং রিমান্ডে না নেয়ার বিষয়ে কোন লুকোচুরি নেই বলেও দাবি করেন ওই পুলিশ কর্মকর্তা। সে সুস্থ হলেই তাকে রিমান্ডে নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ