৮ আশ্বিন ১৪২৫, রবিবার ২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৯:০২ অপরাহ্ণ

জামায়াত শিবিরে আসক্ত পুলিশের ড্যামকেয়ার শামীম ওসমানকে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫৫ পিএম, ৭ মার্চ ২০১৮ বুধবার


জামায়াত শিবিরে আসক্ত পুলিশের ড্যামকেয়ার শামীম ওসমানকে

নারায়ণগঞ্জে পুলিশের কতিপয় সদস্য জামায়াত ও শিবির সম্পৃক্ত অনেকের সঙ্গে সু সম্পর্ক রাখলেও প্রভাবশালী এমপি শামীম ওসমানকে রীতিমত ‘ড্যামকেয়ার’ করছে। কারণ শামীম ওসমান ইস্যুতে দুটি ঘটনার একটিরও কোন কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। অথচ পুলিশকে দেখা যাচ্ছে জামায়াত ও শিবিরের পৃষ্ঠপোশকদের সঙ্গে। এতে করে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

গত এক মাসে শামীম ওসমানও এসব নিয়ে বেশ কিছু আক্ষেপের বিষয় তুলে ধরেছেন। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। শামীম ওসমানের মত এমপির ঘটনায় যেখানে পুলিশ নীরবতা দেখাচ্ছে সেখানে সাধারণ মানুষের অবস্থাও যে ভয়াবহ সেটাও প্রমাণিত হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অনেক সময় টাকা ছাড়া মামলাও গ্রহণ হয় না। আবার অনেক মামলা কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে রেকর্ড হচ্ছে। আর ওইসব টাকা দিচ্ছে জামায়াত শিবির সম্পৃক্ত বিএনপি অনেক নেতা। আর এসব পুলিশকেই দেখা গেছে পুলিশের দায়ের করা মামলার অভিযুক্তের সঙ্গে খোশগল্পে মত্ত থাকতে।

জানা গেছে, শামীম ওসমানের বাড়ী থেকে গ্রেফতারকৃত প্রবাসী যুবক সুলতান মাহমুদ শুভ ওরফে শুভ খান বিষয়ে তদন্তের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে পুলিশ জানালেও এখন বলছে অগ্রগতি তেমন নাই। অথচ কয়েকদিন আগেও মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবির পরিদর্শক মাজহারুল ইসলাম জানান, আমরা ইতোমধ্যে মামলার অনেক তথ্য উদঘাটন করতে সক্ষম হয়েছি। তবে এখন আর তদন্ত খুব একটা আগায়নি।

ডিবির একটি সূত্র জানিয়েছে, শুভ ইসলামী ছাত্র শিবিরের সক্রিয় সদস্য সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। তবে তাঁর পেছনে কারা করছে সেটাকে খতিয়ে দেখার নাম বলেই পার করা হচ্ছে সময়। প্রশ্ন উঠেছে তাহলে পুলিশ কী জামায়াত ও শিবিরকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কী না।

এর আগে শামীম ওসমান গণমাধ্যমকে জানান, ‘১০ ডিসেম্বর রাতে শহরের নিতাইগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতে আমাদের মালিকানাধীন কার্গো জাহাজের কর্মচারীরা রাতের খাবারের পরই সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন। ভাগ্যক্রমে একজন কর্মচারী তখনো খাবার না খাওয়ায় তিনি বিষয়টি বুঝে ফেলেন এবং আমাদের জানান। মোট ১৪ জন কর্মচারী জ্ঞান হারান এবং পরদিন সন্ধ্যায় জ্ঞান ফিরে পান। জাহাজটির ইঞ্জিনে বেশকিছু লোহার রড পাওয়া গেছে যেগুলো ইঞ্জিন চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জাহাজটিকে ক্ষতিগ্রস্ত করত। হয়তো যারা কাজটি করেছে তারা কর্মচারীদের সংজ্ঞাহীন করে জাহাজে অবৈধ পণ্য রেখে আমাকে হেয় করার চক্রান্ত করেছিল’

ওই ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি মামলা হয়। তদন্তকারী কর্মকর্তা এস আই শফিকুর জানান, দুইজনকে সন্দেহজনক গ্রেফতার করা হয়েছিল। মামলাটির তেমন কোন অগ্রগতি নাই।

গত ১৭ জানুয়ারী সংবাদ সম্মেলনে ফতুল্লার জোড়া খুনের আসামীরা এখনো ধরা না পড়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এমপি শামীম ওসমান সেই সঙ্গে তিনি এ ঘটনায় প্রশাসনেরও সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেছেন, জোড়া খুনের আসামীরা প্রকাশ্যে ঘুরছে কিন্তু পুলিশ তাদের ধরছে না।

শামীম ওসমানের মামলা নিয়ে পুলিশ গড়িমসি, শামীম ওসমানের বাড়ি থেকে শিবিরের ক্যাডার গ্রেপ্তার হলেও সদর মডেল থানায় দায়ের করা প্রথম সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলায় জামায়াত শিবির ও নাশকতাকারীদের পৃষ্ঠপোশক হিসেবে নাম থাকা ব্যবসায়ী আল জয়নালকে দেখা গেছে পুলিশের সঙ্গে।

৩০ জানুয়ারী আল জয়নাল নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে যোগ দেওয়া নতুন ওসি কামরুল ইসলামকে গিয়ে ফুল দেন জয়নাল। কামরুল ইসলাম গত ২৮ জানুয়ারী থানায় ওসি হিসেবে যোগ দেন।

জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনে প্রথমবারের মত মামলা হয়। মামলায় ১১ জনকে আসামী করা হয়। সন্ত্রাস বিরোধী আইনে ২০০৯ এর ৬(২)/১০/১৩ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়েছে। মামলায় আসামীদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ সংঘঠন, গোপন ষড়যন্ত্র, অপরাধ সংঘঠেন পরস্পর সহযোগিতা ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে প্ররোচিত করার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলায় উল্লেখ করা হয়, আসামীদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় আসামীরা নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসনকে অস্থিতিশীল ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায়। আসামীরা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিরুদ্ধে গোপন সন্ত্রাসের মাধ্যমে ষড়যন্ত্র করে আসছিল। আসামীদের বিভিন্ন সন্ত্রাসীমূলক কর্মকান্ডে পৃষ্ঠপোশকতা ও আর্থিক সহায়তাকরী হিসেবে খবিরউদ্দিন, জয়নাল, আলমাস ও ইব্রাহিম সহ অনেকেই সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত রয়েছে বলে জানা গেছে।

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৫ সালের ৩ মে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে সদর উপজেলার আলীরটেক ইউনিয়নের কুড়েঁরপাড়ে ধলেশ্বরীর শাখানদীর তীরে ৩৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বেসরকারি বিদ্যুৎ কেন্দ্র উদ্বোধন করেন। তবে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগে থেকেই সিনহা পিপলস এনার্জির মালিকানাধীন ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে আসছিল। বিদ্যুৎ কেন্দ্রটিতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয় সিঙ্গাপুর  থেকে আমদানি করা ফার্নেস তেল। ৭ মে থেকে ফার্নেস তেলবাহী ট্যাংকার নোঙর করার জন্য নির্মিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রটির নিজস্ব জেটির দুই পাশে একটি খালি বার্জ ও একটি খালি লাইটারেজ জাহাজ নোঙর করে রাখে সায়েম নামের একজন সন্ত্রাসী। ফলে তখন বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। এ নিয়ে থানায় মামলাও হয়। সায়েমের বিরুদ্ধে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গত ২৪ এপ্রিল চাঁদাবাজী, মারামারি, হত্যার উদ্দেশ্যে গুম সহ বিভিন্ন অভিযোগে একটি মামলা হয়। মামলা নং ৬১। এছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সদর থানায় ২০১৩ সালের ২০ জুন আরো একটি মামলা হয় যেখানে তার বিরুদ্ধে চুরি, ছিনতাই, চাঁদাবাজীর অভিযোগ আনা হয়েছিল। মামলা নং-২৬। মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় চাঁদাবাজী, হত্যার চেষ্টা, মারধর, চাঁদা আদায় সহ বিভিন্ন অভিযোগে ২০১৫ সালের ২৯ জুন একটি মামলা হয়। মামলা নং -৭৬।

গত ৩০ ডিসেম্বর নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় অনলাইন নিউজ পোর্টাল নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের সম্পাদক ও নির্বাহী সম্পাদকের বিরুদ্ধে ৫৭ ধারায় মামলা করেন সায়েম। তখন থানার ভারপ্রাপ্ত ওসি ছিলেন আবদুর রাজ্জাক। কোন প্রকার তদন্ত ছাড়াই বিশেষ কারণে তিনি মামলাটি গ্রহণ করেন।

এছাড়া আবদুর রাজ্জাকের বিরুদ্ধেও আছে অভিযোগ। ২৭ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জের ওসমানী স্টেডিয়ামে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠন, জনপ্রতিনিধিদের প্রস্তুতিমূলক সভায় শামীম ওসমান পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ‘যাদের নামে অভিযোগ হয়েছে তাদের ধরা তো দূরের কথা মাথার চুলের আগা ধরলে আগুন ধরিয়ে দিব। আমি প্রশাসনকে বলছি ডাবল গেম করবেন না। নিয়াজুলের অস্ত্র নিয়ে নাটক করবেন না। কারা অস্ত্র লুট করেছে তাদের ধরেন। এসব নাটক করবেন না। আমি এর জবাব দিব। আমার ধৈর্যের বাধ ভেঙে গেছে।’

ওই ঘটনার পর আবদুর রাজ্জাক বলেছিলেন, শামীম ওসমানের এসব বক্তব্য রাজনৈতিক।

অপরদিকে ৫৭ ধারা মামলা রুজুর ক্ষেত্রে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের আইন বিভাগের সম্মতি, অভিযোগ তদন্ত ও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) হতে প্রতিবেদন প্রাপ্তির আগেই পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করে। এদিকে মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতেও গড়িমসি করছে পুলিশ। অভিযোগ ইতোমধ্যে এ ক্ষেত্রে প্রায় আড়াইলাখ টাকার লেনদেন হয়েছে।

সায়েম মামলার আর্জিতে নিজেকে এনএন নিটিং ও এনএন কন্সট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী, বাংলাদেশ হোসিয়ারী অ্যাসোসিয়েশন, ইয়ার্ন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং বাংলাদেশ চেম্বার কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্য দাবী করেছেন। তবে সবগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার কারণে তিনি এসব পরিচয় দিতে আইনগত বৈধতা নেই। তার পরেও পুলিশ মামলাটি গ্রহণ করলেও কোন ব্যবস্থা নেয়নি।

নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল বলেন, ‘২০১৩ এর সনদে কখনো বৈধ সদস্য না। আমাদের চেম্বারের নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর নবায়ন করতে হয়। যেহেতু নতুন নবায়ন সনদ নেই সেহেতু অবৈধ সদস্য।’

২০১৩ সনদ ব্যবহার করে সদস্য দাবি করা প্রতারণার শামিল কি না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অস্ত্রের লাইসেন্স যেমন প্রতিবছর বছর নবায়ন করতে হয়। না হলে যেমন অবৈধ তেমনি চেম্বারের সদস্য পদ নবায়ন করতে হবে। অন্যথায় অবৈধ সদস্য।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ