৭ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৩ অক্টোবর ২০১৮ , ৩:৪৭ পূর্বাহ্ণ

UMo

হারাম খান না খেতেও দেন না শামীম ওসমান! কোটি টাকার চাঁদাবাজী কার


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:৩৬ পিএম, ২৪ মার্চ ২০১৮ শনিবার


হারাম খান না খেতেও দেন না শামীম ওসমান! কোটি টাকার চাঁদাবাজী কার

‘আমি হারাম খাইনা, হারাম খাইতেও দিমু না। আল্লাহ অখুশি হন, এমন কাজ আমি করবো না।’ নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান যিনি প্রভাবশালীদের একজন তাঁর কণ্ঠে এমন বক্তব্য আসার পর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে তাঁর এলাকাতে শ্রমিকদের রক্তচুষে মাসে যে কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজী হচ্ছে সে ব্যাপারে তিনি কেন নীরব। ফতুল্লার অনেক শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের ঘামে ঝরানো টাকা দেদারছে লুটে নেওয়া হচ্ছে।

সম্প্রতি দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় শিল্প গ্রুপের প্রায় ১৫ কোটি টাকার পাথর লুটের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছিল। ফতুল্লার আলীগঞ্জে পাথর ঘাটে ওই পাথর লুটের চেষ্টা হয়। পরে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় এমপি শামীম ওসমানও বিষয়টি জানতে পেরে সমাধান করেন।

স্থানীয়রা জানান, ওই ঘটনায় ২ ট্রাক পাথর লুট করে অন্যত্র রেখে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেটাও ফেরত দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় স্থানীয় আওয়ামী লীগের ইমেজ মারাত্মক প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

সম্প্রতি হরিহরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এনায়েতনগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের কর্মী সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে শামীম ওসমানের সামনে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের অনেক নেতা প্রশ্ন তলে আক্ষেপ করে বলেন, ‘একজন শ্রমিক নেতা কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজী করায় আমাদের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে।’

জবাবে শামীম ওসমান ওই শ্রমিক লীগ নেতার বিপক্ষে কোন পদক্ষেপ না নেওয়ার মনোভাব দেখায় তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

জানা গেছে, সদর উপজেলার ফতুল্লায় একটি মাঠে উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও সেখানে কোরবানীর অস্থায়ী পশুর হাট বসানোর অনুমোদন দিয়েছিল প্রশাসন। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিবছর এ স্থানে হাট বসানো নিয়ে লাখ লাখ টাকার লেনদেন ঘটে। গত বছর এ হাট নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের উত্তেজনার পর শেষে মোটা অংকের টাকার দেনদরবারে সমঝোতা হয়েছিল।

জানা গেছে, ফতুল্লার আলীগঞ্জের ১১ দশমিক ৬৫ একর জমিতে সরকারি কর্মকর্তাদের আবাসনের জন্য ৮টি ১৫ তলা ভবনে মোট ৬৭২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং নির্মাণ কাজ চলছে। তবে ১১ দশমিক ৬৫ একর জমির মধ্যে ৫ একর ৭০ শতাংশ জমিতে ঐতিহ্যবাহী আলীগঞ্জ খেলার মাঠটি অবস্থিত। সরকারের সেই সিদ্ধান্তের বৈধতাকে চ্যালেঞ্জ করে গেল বছরের ৭ এপ্রিল আলীগঞ্জ ক্লাব ও আলীগঞ্জ হাইস্কুল কমিটির সভাপতি কাউসার আহাম্মেদ পলাশ সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করেন। ১০ এপ্রিল সুপ্রীম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ওবায়দুল হাসান ও বিচারপতি কৃষ্ণা দেবনাথের সমন্বয়ে গঠিত দ্বৈত বেঞ্চ শুনানী শেষে ফতুল্লার আলীগঞ্জ খেলার মাঠে সরকারী কর্মকর্তাদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণে একনেকের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবেনা সে মর্মে মন্ত্রী পরিষদ সচিব, প্রধানমন্ত্রীর মূখ্যসচিব, অর্থসচিব, পরিকল্পনা সচিব, পূর্ত সচিব, নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক, গণপূর্ত নারায়ণগঞ্জ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীসহ ৮ কর্মকর্তার উপর রুল নিশি জারি করেন। সর্বশেষ চলতি বছরের ৬ জুন হাইকোর্টের বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি আবু তাহের মোঃ সাইফুর রহমান এর দ্বৈত বেঞ্চ ‘আলীগঞ্জ খেলার মাঠ’ এর কোনরূপ আকৃতি, প্রকৃতি যাতে পরিবর্তন করা না হয় এই মর্মে নিষেধাজ্ঞাটি জারি করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার আলীগঞ্জ থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে আছে অসংখ্য কল কারখানা। এ সড়কের পাশেই বুড়িগঙ্গা নদী। ওই নদী থেকে হয় মালামাল লোড আনলোড। এ সড়কের পাশে আছে অসংখ্য স্টিল মিল কারখানা। আছে গার্মেন্ট ফ্যাক্টরী। এখানে আছে ট্রাকের একটি স্ট্যান্ডও। এ কয়েক কিলোমিটার এলাকা থেকে প্রতি সপ্তাহে উঠছে অন্তত ২ কোটি টাকা। একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিচ্ছে এ টাকা। আর সেটার ভাগ যাচ্ছে প্রভাবশালী অনেকের কাছে।

সম্প্রতি একটি সংস্থা এ ব্যাপারে খোঁজ খবর নিতে শুরু করে। তাদের কাছেই এসেছে চাঁদাবাজীর ভয়ংকর চিত্র। তবে এখানে এ চাঁদাবাজী হচ্ছে মূলত একজন শ্রমিক লীগ নেতার পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ ইন্ধনে। আর ওই শ্রমিক লীগ নেতার ৬জনের একটি দল আছে যারা চাঁদাবাজীর এসব সেক্টর নিয়ন্ত্রন করে আসছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এ সড়কের দুই পাশে লোড আনলোড সেক্টর নিয়ন্ত্রন করে জেলার বাইরের একজন মূর্খ লোক। তিনি থাকেন নারায়ণগঞ্জ শহরের জামতলা এলাকাতে। আলিশান ফ্ল্যাটেই শুধু থাকেন না চড়েন কোটি টাকা মূল্যের পাজারো গাড়িতেও। ওই নেতার নিয়ন্ত্রনে মূলত লোড আনলোড। বুড়িগঙ্গা নদী থেকে মালামাল লোড আনলোডে প্রতিটি বস্তা কিংবা পন্য হতে সমিতি ও ইউনিয়নের নামে আদায় করা হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।

একাধিক শ্রমিক বলেন, ‘আমরা দিনমজুর হিসেবে কাজ করি। এখানে একজন নেতার কল্যাণে কাজ করে থাকি। তবে আমাদের শর্ত থাকে বিভিন্ন শ্রমিক দিবসে মিছিল করতে হবে। সেদিন আমাদের রোজগার হয় না। এখানে সিন্ডিকেট ছাড়া কাজ করা যায় না। পেটের দায়েই কাজ করে যাচ্ছি। তবে যা আয় করি তার অর্ধে দিতে হয় চাঁদা হিসেবে।’

ব্যাটারি চালিত অটো রিকশা যিনি নিয়ন্ত্রন করেন তিনিই আবার গার্মেন্ট সেক্টরের একটি অংশও দেখভাল করেন। এজন্য আলাদা কমিটিও আছে। অটো রিকশা হতে প্রতিদিন শ্রমিক সংগঠনের নামে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে এক থেকে দেড় শ টাকা। বলা হচ্ছে এ টাকার একটি অংশ দেওয়া হয় প্রশাসনকেও। সে কারণেই নাকি প্রশাসন ঝামেলা করে না। আর যখন প্রশাসন এ ব্যাপারে অভিযান চালায় তখন ম্যানেজের কথা বলে এ চাঁদার হার বাড়িয়ে দেওয়া হয় কয়েক গুণ।

বেশ কয়েকটি গার্মেন্ট ছিল এ সড়কের পাশে। অব্যাহত চাঁদাবাজীর কারণে অনেক গার্মেন্ট এখান থেকে গুটিয়ে চলে গেছে। পঞ্চবটিতে রপ্তানিমুখী গার্মেন্ট কারখানা পাইওনিয়ার ও পোস্ট অফিস রোডের বিপরীতে হামিদ ফ্যাশন বন্ধ হয়ে গেছে ওই শ্রমিক নেতার কারণে। এসব কারখানায় কিছুদিন পর পর যে ঝামেলার সৃষ্টি হতো তার নেপথ্যে ছিল একজন শ্রমিক নেতা।

স্থানীয়রা জানান, জেলা পরিষদের অনেক জায়গা বেদখল আছে শ্রমিক নেতার নামে। গার্মেন্ট কারখানা, বিভিন্ন কারখানা, লোড আনলোড, পাথরের গদি, অটো রিকশা থেকে প্রতি মাসে ২ কোটি টাকারও বেশী চাঁদাবাজী হচ্ছে। গত নির্বাচনে সমঝোতায় পঞ্চবটি থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত শ্রমিক নেতার কব্জায় থাকলেও আগামী নির্বাচনের আগে চাহিদা বেড়েছে। এখন চাহিদা আলীগঞ্জ থেকে পঞ্চবটি, আর পঞ্চবটি থেকে মুক্তারপুর পর্যন্ত এরিয়া।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ