৮ বৈশাখ ১৪২৫, রবিবার ২২ এপ্রিল ২০১৮ , ৮:৪৭ পূর্বাহ্ণ

Kothareya1150x300

প্রথম আলোর চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট : চাঁদাবাজীর ভয়ে দুই কারখানা বন্ধ


রোজিনা ইসলাম || প্রথম আলো

প্রকাশিত : ০৮:৩৯ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০৯:৩৬ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০১৮ শুক্রবার


প্রথম আলোর চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট : চাঁদাবাজীর ভয়ে দুই কারখানা বন্ধ

চাঁদাবাজির কারণে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ রপ্তানিমুখী সোয়েটার কারখানা পাইওনিয়ার সোয়েটারস লিমিটেড অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারখানাটিতে ২৫৫০ শ্রমিক কাজ করতেন।

শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও ইউনাইটেড ফেডারেশন অব গার্মেন্টস ওয়ার্কসের কেন্দ্রীয় কার্যকরি সভাপতি কাউসার আহমেদ ওরফে পলাশের ভয়ে কারখানাটি বন্ধ করতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন কারখানার মালিক, শ্রমিক ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা। কাউসার আওয়ামী লীগের স্থানীয় একজন প্রভাবশালী নেতার ছত্রচ্ছায়ায় চলেন।

কারখানার মালিক পরিস্থিতির নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, শ্রম, বাণিজ্য, স্বরাষ্ট্র ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে দুই দফা চিঠি দিয়েছেন। কারখানার কর্মকর্তাদের টেলিফোনে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। এর আগে গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিকেএমইএর সভাপতিকে চিঠি দিয়ে পরিস্থিতি জানানো হয়। গত ৫ এপ্রিল বন্ধ করে দেওয়া হয়।

জানা গেছে, বছর দেড়েক আগে ফতুল্লায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের মালিকানাধীন হামিদ ফ্যাশনও কাউসার আহমেদের চাপে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল।

সূত্রগুলো বলছে, ফতুল্লার রপ্তানিমুখী টাইম সোয়েটারস, র‌্যাডিকেল, মেট্রো, মাইক্রোফাইবার, পলমল, লিবার্টি, মিশওয়্যারের মতো বৃহৎ কারখানাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। র‌্যাডিকেল ছাড়া বাকি কারখানাগুলো গত নভেম্বর থেকে আবার চালু করা হয়েছে। কাউসার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিকদের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এগুলো চালু করা হয়।’

ফতুল্লার বন্ধ হওয়া চারটি কারখানার কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সব ঘটনার সঙ্গে কাউসার আহমেদের সংশ্লিষ্টতা আছে। প্রতিটি কারখানা বন্ধ ও চালুর ঘটনাও প্রায় একই রকম। প্রথমে চাঁদা দাবি করা হয়। চাঁদা না পেলে শ্রমিকদের উসকে দেওয়া হয়। বহিরাগত শ্রমিকদের কারখানায় ঢুকিয়ে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়। কারখানার নিয়মিত শ্রমিকদের পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নেওয়া হয়। পরিচয়পত্র ছাড়া শ্রমিকেরা বেতন তুলতে পারেন না। শুরু হয় ক্ষোভ-বিক্ষোভ ও দরকষাকষি। সমঝোতা না হলে একপর্যায়ে মালিক কারখানা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন।

জানতে চাইলে হামিদ ফ্যাশনস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইন্তেখাবুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শুধু যদি চাঁদা চাইতো, তবে তো রক্ষা পেতাম। আমাদের বলেছিল একেবারেই হামিদ ফ্যাশনস কারখানাটি কাউসার আহমেদের তত্ত্বাবধানে দিয়ে দিতে। এ না করায় শুরু হয় উৎপাত, কারখানার ভেতরে গিয়ে নৈরাজ্য। বহিরাগতদের কারখানার ভেতরে ঢুকিয়ে কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য করা হয়। পরে আমরা কারখানাটি আবু বকর সিদ্দিকের কাছে হস্তান্তর করি।’

এ বিষয়ে কাউছার আহমেদ বলেন, ‘হামিদ ফ্যাশনসের কর্মকর্তারা আমাদের দলীয় লোক হিসেবে তাঁদের অনুরোধ করেছিলাম। বলেছি, লোক দিয়ে নয়, নিজেদের কারখানা নিজেরা এসে পরিচালনা করেন। তাঁদের কারখানা আমি কেন চালাতে চাইব? বরং শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ের জন্য তাঁদের বিরুদ্ধে আমরা মামলা করেছিলাম। তাই তাঁরা আমার উপর খ্যাপা।’

পলমলের পরিচালক (প্রশাসন) মাহতাব উদ্দিন বলেন, ‘নানা বিষয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। এ কারণে এখানকার অনেক কারখানার মতো এটাও বন্ধ করতে হয়েছিল। পরে আবার চালু করেছি।’ তিনি এর বেশি সুনির্দিষ্ট করে আর কিছু বলতে রাজি হননি।

পাইওনিয়ারও বন্ধ
সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে কারখানামালিকের দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, বহিরাগত সন্ত্রাসীদের কাছে কারখানার সব কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিকেরা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তাই আইন মেনে কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, বহিরাগত ও কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিক সাধারণ শ্রমিকদের বেতন নিতে বাধা দেন এবং তাঁদের পরিচয়পত্র ছিনিয়ে নিয়ে তাঁদের জিম্মি করেন। এ কারণে সব প্রস্তুতি থাকলেও মার্চের বেতন এখনো শ্রমিকদের দেওয়া সম্ভব হয়নি। পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পেলে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ করার উদ্যোগ নেবে মালিকপক্ষ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে কারখানার মালিক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. বাদশা মিয়া জানান, ‘এক বছর ধরে স্থানীয় বহিরাগত চাঁদাবাজ সন্ত্রাসীরা বেআইনিভাবে অস্ত্র নিয়ে কারখানায় প্রবেশ করে কারখানার কিছু উচ্ছৃঙ্খল শ্রমিককে দিয়ে বেআইনি দাবিদাওয়া তুলে কারখানার ভেতরে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে। এ সময় তারা মেশিন ভাঙচুর, মারধর, উৎপাদন বন্ধ করার মতো কর্মকান্ড করে। এতে প্রতিষ্ঠানের ৬০ কোটি টাকা আর্থিকভাবে ক্ষতি হয়েছে। ...ইতিমধ্যে বিপুল অঙ্কের রপ্তানি আদেশ বাতিল হয়েছে।’

বাদশা মিয়া প্রথম আলোর কাছে দাবি করেন, ‘আমার কারখানায় কোনো শ্রমিকের কোনো রকম পাওনা বকেয়া থাকে না। বরং সরকারের ধার্য করা নিম্নতম মজুরির চেয়ে বেশি বেতন-ভাতা দেওয়া হয়।’ তিনি আরও বলেন, প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর আধুনিক স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশে এবং শ্রমসহ সব আইন মেনে দীর্ঘদিন ধরে ২৫৫০ জন শ্রমিক নিয়ে এ কারখানা পরিচালিত হচ্ছে। কিন্তু চাঁদাবাজদের অত্যাচারে আর টেকা যাচ্ছে না।

কারা চাঁদা চাইছে জানতে চাইলে বলেন, নারায়ণগঞ্জ এলাকায় যাঁরা প্রভাবশালী, তাঁদের ভয় দেখিয়ে অনেক সন্ত্রাসী এমন নৈরাজ্য করছে। তিনি নির্দিষ্ট করে কারও নাম বলতে রাজি হননি। বাদশা মিয়া বলেন, ‘আজ নাম বললে কাল আমার ওপর আরও অত্যাচার নেমে আসবে।’ তিনি এদের অবিলম্বে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।

তবে কারখানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা ও শ্রমিকেরা চাঁদাবাজির জন্য শ্রমিক লীগের নেতা কাউসার আহমেদের দিকে আঙুল তুলেছেন।

জানতে চাইলে কাউসার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘শ্রমিকদের পক্ষে কথা বললেই আমি চাঁদাবাজ হয়ে যাই। আমাকে কারখানার মালিক ৫০ লাখ টাকা উৎকোচের প্রস্তাব দিয়েছেন, নেইনি। সবাই শ্রমিক অসন্তোষ বন্ধে টাকাপয়সা দিতে চায়। নেই না বলেই আমার এত বদনাম।’ তিনি আরও বলেন, শ্রমিকদের কম মজুরি দেওয়ার কারণেই কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

কাউসার আহমেদ বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যে প্রভাবশালীর নেতার সঙ্গে আমার সখ্য রয়েছে বলা হচ্ছে, তা ঠিক নয়। তাঁর সাথে আমার বৈরী সম্পর্ক। আমি এখানে ২৫টি ট্রেড ইউনিয়ন চালাই।’ কাউসার স্বীকার করেন, পাইওনিয়ারের রপ্তানি আদেশ বাতিলের জন্য তিনি বিদেশি ক্রেতাদের চিঠিও দিয়েছিলেন।

উৎকোচের বিষয়ে জানতে চাইলে বাদশা মিয়া বলেন, ‘যদি টাকা দিতে চাইতাম, তবে কি আর কারখানা বন্ধ করতে হতো? সরকারের সহায়তাও চাইতে হতো না।’

জানতে চাইলে নিট পোশাকমালিক সমিতি বিকেএমইএর সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে আমি শ্রম, বাণিজ্য সহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী-সচিবদের সাথে কথা বলেছি। আমি বলেছি, আপনারা তদন্ত করুন, যদি মালিকের সামান্যতম অপরাধ পান, তবে তাঁকে যে শাস্তি দেন, আমরা একমত পোষণ করব। কিন্তু যদি তাঁর কোনো অপরাধ না পান বা এ ঘটনায় অন্য কারও ইন্ধন থাকে, চাঁদাবাজির অভিযোগ থাকে, তবে তাঁর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেবেন, তা-ও আমাদের জানাতে হবে।’ তিনি বলেন, এ পোশাক কারখানাটি সম্পর্কে সবাই জানে। তাঁরা সরকার-নির্ধারিত মজুরির চেয়ে বেশি মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকেন।

পাইওনিয়ার কর্তৃপক্ষের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে শ্রমসচিব মিকাইল শিপার প্রথম আলোকে বলেন, ‘কারখানাটির সুনাম রয়েছে। কারা কারখানা বন্ধ করতে বাধ্য করেছে, তা জানতে আমরা একটি তদন্ত প্রতিবেদন চেয়েছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে।’

জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি। যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০১৪।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ