৩ আশ্বিন ১৪২৫, বুধবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৬:১৪ পূর্বাহ্ণ

ফের বিতর্কে বিঁধলেন বিএনপির নিয়ন্ত্রক শাহআলম


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৪৪ পিএম, ২২ জুন ২০১৮ শুক্রবার


ফের বিতর্কে বিঁধলেন বিএনপির নিয়ন্ত্রক শাহআলম

কর ফাঁকির ঘটনায় আবারও বিতর্কে বিঁধলেন নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নিয়ন্ত্রকদের একজন শিল্পপতি শাহআলম। শুধু শাহআলম না তাদের পুরো পরিবারের কর ফাঁকির চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস হয়ে গেছে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিগত দিনে বিএনপির এমপি ছিলেন গিয়াসউদ্দিন যার নামের আগে ‘গডফাদার’ তকমা লেগে যায়। কেরাবুন কাতিবুন খ্যাত জামান ও সেলিমের মত দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের লালন পালন আর তোষণের কারণে গিয়াসউদ্দিন ছিলেন বেশ বিতর্কিত। এবার সেই গিয়াসউদ্দিনের আসনে এমপি হতে বাসনা জাগা ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শাহআলম চাচ্ছেন ‘গডফাদার’ রূপে আবির্ভূত হতে। আর সে কারণেই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের তিনি কাছে টেনে নিচ্ছেন।

সবশেষ ফতুল্লা থানা পুলিশের তালিকাভুক্ত ধর্ষণ, হত্যা সহ ডজন মামলার আসামী সন্ত্রাসীদের একজন তুষার আহমেদ মিঠুকে এবার ফুল দিয়ে বরণ করেছেন জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও ফতুল্লা থানা কমিটির সভাপতি শাহআলম। সঙ্গে ছিলেন জেলা বিএনপির শীর্ষ নেতারাও। সেই সঙ্গে মিঠুকে দিতে যাচ্ছেন শ্রমিক দলেরও দায়িত্ব। বিএনপির নেতারা বলছেন, হঠাৎ করেই এ ধরনের সন্ত্রাসীদের কাছে টেনে নেওয়াটা হচ্ছে শাহআলমের জন সবচেয়ে বোকামি।

২০০৯ সালের ৬ নভেম্বর শাহআলম তার ব্যবসায়িক শিল্প প্রতিষ্ঠানে তড়িগড়ি করে এক সভা করে নিজেই থানা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়। নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ৬ নভেম্বর সম্মেলনের তারিখ ছিল না। এসময় সভাপতি পদে আগ্রহী থানা বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক সভাপতি অধ্যাপক খন্দকার মনিরুল ইসলাম, বিএনপি নেতা এম এ হোসেন সাঈদ ও সদর উপজেলার চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ সম্মেলন করে কমিটি গঠনের ওপর জোর দেন। কিন্তু তাদের মতামতকে উপক্ষো করে সভাপতি নির্বাচিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ পদে আগ্রহী তিন প্রার্থীর সঙ্গে শাহআলমের ঘণ্টায় ঘণ্টায় কয়েক দফা সমন্বিত ও পৃথক বৈঠক করে নিজেকে সভাপতি পদে একক প্রার্থী ঘোষণা করলে বাকীরা তাকে সমর্থন দেয়।

২০০৭ সালের ওয়ান এলেভেনের পর থেকে হঠাৎ করেই আলোচনায় আসার চেষ্টা করেন ফতুল্লার জালালউদ্দিন আহম্মেদ এর ছেলে শাহআলম। ওই বছরের তৃতীয় ধারার কিছু রাজনৈতিক দল গঠন হলে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন শাহআলম। তিনি তখন নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিমিটেডে একটি ইফতার মাহফিলে মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিমকে অতিথি করেন। এ অনুষ্ঠানে অতিথিরা দেশের দুই দলের দুই নেত্রীর তীব্র ভর্ৎসনা করেন। ওই বছরের ৪ ডিসেম্বর রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে একটি মিলনায়তনে কিংস পার্টি খ্যাত কল্যাণ পার্টির আত্মপ্রকাশ ঘটে। এ অনুষ্ঠানে লোকজন নিয়ে শাহআলম উপস্থিত হন। অনুষ্ঠানে তিনি বক্তব্য দিয়ে কল্যাণ পার্টির জন্য কাজ করার অঙ্গীকার করেন। কল্যাণ পার্টির প্রধান মেজর জেনারেল (অব.) ইবরাহিম সেদিন তার বক্তব্যে শাহআলমের উপর দলের সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রদান করেন। শুরু হয় শাহআলমের রাজনীতি। তখন শাহআলম মোটা অঙ্কের টাকা কল্যাণ পার্টিকে অনুদান দেন। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শেষ মুহূর্তে বিএনপির মনোনয়ন পান শাহআলম। এ নির্বাচন নিয়েও অনেক নাটকীয়তা হয়। নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী সারাহ বেগম কবরীর সঙ্গে পরাজিত হয়।

এদিকে এর আগেই সরকার দলের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও অনেক নেতার তদারক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া শিল্পপতি শাহআলমের গোপন আঁতাতের খবর আরো পোক্ত হতে শুরু করেছে। পুলিশের দায়ের করা একটি বিস্ফোরক মামলায় চার্জশীট থেকে অব্যাহতি পেয়েছেন তিনি। যদিও একই মামলায় অভিযুক্ত আছেন সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিন যাঁর সঙ্গে মনোনয়ন নিয়ে মারাত্মক বিরোধীতা রয়েছে।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানান, গত কয়েক বছর ধরেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপন আঁতাত করে রাজনীতি করে আসছেন শাহআলম। শিল্পপতি এ নেতার তকমায় গত ১০ অক্টোবর সোনারগাঁয়ের একটি বিস্ফোরক মামলা ছাড়া আর কোন তিলক নাই। যদিও মামলার পরেই প্রশ্ন উঠে নির্বাচনের আগে নিজেকে জাহির করতেই প্রশাসনের সঙ্গে আঁতাত করেই মামলাটি দায়ের করা হয়। সবশেষ চার্জশীটে শাহআলমকে চার্জশীট থেকে অব্যাহতির আবেদনও প্রশ্নবিদ্ধ হয়।

বিএনপির একাধিক নেতা জানান, ১০ অক্টোবরের ঘটনার ৯দিন পর ১৯ অক্টোবর ফতুল্লার দেলপাড়া মাঠে ডিএনডির মেগা প্রকল্পের উদ্বোধনের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাতে আয়োজিত সমাবেশে শাহআলমের আস্থাভাজন ও একনিষ্ট নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি আজাদ বিশ্বাস বলেন, আমার নেতা শামীম ওসমানের হাত দিয়ে স্মরণকালের সেরা কাজ আমার উপজেলায় হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের সকল রাস্তাঘাট শামীম ওসমানের হাত ধরে পরিবর্তন হয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে আর্থিক সক্ষমতা কতটা আছে আমি জানিনা কিন্ত শামীম ওসমান বলেছেন সংসদে এই জলাবদ্ধতা নিরসন না হলে আমি পদত্যাগ করবো। তিনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সন্তান তাই আমি বলেছি আমার উপজেলা পরিষদবাসীকে যদি কেউ এই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্তি দিতে পারে তাহলে তা একমাত্র শামীম ওসমান।’

আজাদ বিশ্বাসের ওই বক্তব্যের পর যখন নারায়ণগঞ্জ শহরে তোলপাড় সৃষ্টি হয় তখনও আজাদ বিশ্বাসকেই সঙ্গে রাখেন শাহআলম। যদিও তখন গণমাধ্যমে একটি বিবৃতি দিয়ে নিজেকে দায়সারার চেষ্টা করেন শাহআলম। এরই মধ্যে জেলা বিএনপির অনেক নেতাই এ নিয়ে মন্তব্য করেন প্রতিবাদ জানান। যদিও এতে কোন কর্ণপাত করেনি শাহআলম।

বিএনপির নেতারা জানান, আগে থেকেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চলে আসছেন শাহআলম ও আজাদ বিশ্বাস। সেটা আবারও প্রমাণিত হলো। কারণ ১০ অক্টোবরের মামলায় একই অভিযোগে অভিযুক্ত ছিলেন শাহআলম ও গিয়াসউদ্দিন।

এদিকে কল্যাণপার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির এক সময়কার কোষাধ্যক্ষ ও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির অঘোষিত নিয়ন্ত্রক মুহাম্মদ শাহআলম সহ তাঁর ভাইদের বিরুদ্ধে সরকারের কর ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। ওইসব ভাইয়েরা শাহআলমদের মালিকানাধীন শাহজালাল স্পিনিং মিল ও শাহ ফতেহউল্লাহ টেক্সটাইল মিলের বিভিন্ন পদে রয়েছেন।

শাহআলম ছাড়াও তাঁর আরো ৫ ভাই এবং জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস লিমিটেড ও শাহ ফতেহউল্লাহ টেক্সটাইল মিলের বিরুদ্ধেও রয়েছে কর ফাঁকির অভিযোগ। সবার ঠিকানা দেওয়া হেেছ রাজধানীর দিলকুশাতে ইউনুস সেন্টারে। আর কারখানার ঠিকানা দেওয়া আছে লালপুর এলাকাতে।

ইতোমধ্যে এনবিআর ও দুদকে এ সম্পর্কিত বিস্তারিত নথি জমা হয়েছে। সেখানে ৬জনের নাম ও দুটি শিল্প কারখানার বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। সেখানে কিভাবে কর ফাঁকি দেওয়া হয়েছে তার আদ্যোপান্তও তুলে ধরা হয়।

অভিযোগে জানা গেছে, জেলা বিএনপি সহ সভাপতি মুহাম্মদ শাহআলম, জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস লিমিটেড এবং শাহ ফতেউল্লাহ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড এর পরিচালক। ঠিকানা ১৯ ইউনুস সেন্টার, ৫২-৫৩ দিলকুশা বা/এ, ঢাকা। সার্কেল-৭৩ (কোম্পানীজ), জোন-০৪ ঢাকা। টিআইএন নং- ৫২২০৮৪৪৯০৫১৪, জাতীয় পরিচয় পত্র নং- ৬৭১৫৮৩৭৪০০২২৭।

সে শাহ ফতেউল্লাহ টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড, টিআইএন নং-৩৬৩২৯১৩৯৮৬২২ থেকে মাসে ৬১ লাখ টাকা পরিতোষিক গ্রহণ করেন আর ৫ লাখ পারিতোষিক দেখিয়ে আয়কর রিটার্ন প্রদান করেন। সে হিসেবে মাসে যদি ৫৬ লাখ টাকার উপর আয়কর ফাঁকি দেন তবে বছরে আয়কর ফাঁকি দেওয়া হয় ৬ কোটি ৭২ লাখ টাকা। মোট ২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা বছরে হলে ২০ বছরে হবে ৫২ কোটি ৬০ লাখ টাকার উপরে। তার নিজের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে অনেক ব্যাংক হিসাব রয়েছে তার প্রতি বছর বিভিন্ন ব্যাংকে ব্যাংক হিসাব খুলে আবার বন্ধ করে। আবার কোম্পানীর নামে হিসাব খুলে ব্যক্তিগত ভাবে হিসাব পরিচালনা করে যাহা কোম্পানরি ব্যালেন্স শীট/ ফিন্যান্সসিয়ালস এ দেখানে হয় না ব্যাংক হিসাব সার্চ দিলেই এসব লোমহর্ষক তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। জোয়ার সাহারা, বাড্ডা, বারিধারা, বসুন্ধরা এ ব্লক হতে ৫ কাঠা করে তিনটি প্লট ক্রয় করে ৬ কোটি ৫২ লাখ ৫০ হাজার টাকায় কিন্তু আয়কর ফাইলে দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৫২ হাজার ৫শ টাকা। এছাড়া তাদের নামে বেনামে আরো অনেক ফ্লাট আছে যা দেখানো হয়নি। স্ত্রী ও সন্তানের নামে বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক ব্যাংক হিসাব রয়েছে আর এফডিআরও রয়েছে। আর সেসব ব্যাংক হিসাবের কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়। তার এক ছেলে এবং দুই মেয়ে লন্ডনে পড়াশোনা করছে যার সমস্ত খরচ মানি লন্ডারিং করে টাকা পাচার করা হয়েছে।

এছাড়াও জালাল আহমেদ স্পিনিং মিলস এবং শাহ ফতেউল্লাহ টেক্সটাইল মিলস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহজাহান, সেলিম আহমেদ, শফিউদ্দিন আহমেদ, মো. শহিদ আলম, মো. আশরাফুল আলম সম্পর্কেও বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।

এ ব্যাপারে শাহআলম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি নিজে আসলে অভিযোগ সম্পর্কে অবগত না। আমি কোন ধরনের নথিও পাই নাই। আর এ ধরনের অভিযোগও সত্য না। কারণ আমি যথা নিয়মে ট্যাক্স ভ্যাট দিয়েই ব্যবসা পরিচালনা করে আসছি। হয়তো কেউ হয়রানির জন্য এসব করছে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ