৫ শ্রাবণ ১৪২৫, শুক্রবার ২০ জুলাই ২০১৮ , ২:৩১ অপরাহ্ণ

ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থে পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত ‘মেরুদন্ডহীন’ বিএনপি


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৭:১০ পিএম, ৪ জুলাই ২০১৮ বুধবার | আপডেট: ০৮:৩১ পিএম, ৬ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার


ঘুরে দাঁড়াতে ব্যর্থে পিঠ বাঁচাতেই ব্যস্ত ‘মেরুদন্ডহীন’ বিএনপি

নারায়ণগঞ্জ জেলাতে ক্ষমতাসীন দল মহাজোটে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ইস্যুতে যখন ল্যাং মারা রাজনীতি দৃশ্যমান হচ্ছিল তখন বিএনপি নেতাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সুবর্ণ সুযোগ ছিল। এর মধ্যে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ের কমিটি ঘোষণার মধ্য দিয়ে দলের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করতে চাইছেন। তবে দলের নেতাকর্মীরা নতুন কমিটির পদ-পদবী সহ নানা ইস্যুতে ফের বিতর্কে জড়িয়ে নিজেদের মধ্যে উল্টো দ্বন্দ্ব-বিভক্তির সৃষ্টি করছে। এদিকে হামলা-মামলা, জেল-জুলুমের ভয়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে সখ্যতার চিত্র দৃশ্যমান হলে মেরুদ-হীনতার চরম সীমা অতিক্রম করে। এরুপ মেরুদ-হীন নেতদের কর্মকান্ডে বারবার বিপাকে পড়ছে বিএনপি দল।

বেগম খালেদা জিয়া ইস্যুতে বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা ঠুকে দেয়া হয়। এতে জেলার ৭ টি থানায় কয়েক হাজার নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে করা এসব মামলায় জেলার শীর্ষ পদীয় নেতাদের কারাবন্দী করা হয়। এর মধ্যে পুলিশি হামলা, মামলা, জেলা-হাজত ও ধরপাকড়ের মধ্য দিয়ে অনেকটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে বিএনপি নেতারা। এমনকি দলীয় কর্মসূচি করতে পুলিশের বাধার মুখে অনেকটা দিশেহারা হয়ে পড়ে এই দলটি। আর জেলা-হাজত ও ধরপাকড়ের ভয়ে অনেক নেতাকর্মী আত্মগোপনে চলে যায়। জেলে পেরণ করা নেতাকর্মীরা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে একে একে মুক্তি পায়। দলের এমন পরিস্থিতিতে ঘুরে দাঁড়াতে ও দলকে চাঙ্গা করতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে নতুন ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ঈদের আগে থেকে সেই কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। জেলা ও মহানগর ছাত্রদলের ও মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের নতুন কমিটি ঘোষণা দেয়া হয়। তবে কমিটি ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই কমিটি বাতিলের বর উঠে। এমনকি কমিটি বাতিদের দাবিতে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বচনের মনোনয়ন ইস্যুতে সমালোচনা করে বক্তব্য দিলে বিরোধীতা দৃশ্যমান হতে থাকে। জেলার শীর্ষ পদীয় নেতারা নৌকা প্রতীকে প্রার্থী দেয়ার দাবিতে রব তুলে। আর আওয়ামীলীগের শরীক দল জাতীয় পার্টি ও এই দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী নেতাদের বিরোধীতা করে বক্তব্য দিয়ে আসছে। এতে করে মহাজোটের নেতাকর্মীদের মধ্যে পরিস্থিতি অনেকটা উত্তপ্ত হয়ে ঘোলাটে আকার ধারণ করে।

এদিকে গত ২৬ জুন খানপুর ৩শ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল সংলগ্ন এমপি সেলিম ওসমানকে দেয়া বিশাল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাকে নিয়ে বিএনপি, আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি দলের নেতাকর্মী, ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও চেয়ারম্যানরা গুণকীর্তন করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার জোরালো দাবি জানান।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপি দলীয় বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল, মহানগর বিএনপির দফতর সম্পাদক কাউন্সিলর হান্নান সরকার, ২২ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সুলতান আহম্মেদ সহ আরো কয়েকজন বক্তব্য রাখেন যারা সেলিম ওসমানকে ‘আগামীতে এমপি হিসেবে দেখতে চাই’ বলেন।

ওই অনুষ্ঠানে মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি ও বন্দর উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান মুকুল বলেন, ‘গত উপজেলা নির্বাচনের আগে আমাকে সেলিম ওসমান ডেকেছিলেন। তখন বলেছিলেন তার জন্য যেন আমি খেয়াল রাখি। আমিও তখন বলেছিলাম আমার জন্য তিনি যেন খেয়াল রাখেন। নাসিম ওসমানও আমাকে খুব পছন্দ করতেন। রাজনীতি আর সম্পর্ক আলাদা জিনিস। আমি সেলিম ভাইয়ের পক্ষে আছি।’

বিএনপি নেতা ও ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর হান্নান সরকার বলেন, সেলিম ওসমান একের পর এক উন্নয়ন করেছেন। অনুদান ছাড়াও কলেজ স্কুল করেছেন। আগামীতে আবারও তিনি নির্বাচন করবেন। আমরা তার পক্ষে কাজ করবো প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। কারণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে সেলিম ওসমান একজন মডেল।

২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা সুলতান আহমেদ বলেন, আমি গত ৪ বছরে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি যে সেলিম ওসমান দল মত নির্বিশেষে সবার জন্য কাজ করেছেন। সেলিম ওসমান জনগণের জন্য কাজ করছে বিধায় তাঁর জন্য আজ আমি মঞ্চে এসেছি। আমার এলাকার লোকজন আমাকে চাপ দেয় যে কেন এমপি সেলিম ওসমানের কাছে যাই না। এলাকাবাসীর কথামত আমি সেলিম ওসমানের কাছে এসেছি। আমি এলাকাবাসীর দাবীর মতে ওয়াসার পানি সমস্যার জন্য এমপির দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। এমপি সাহেব ওয়াসাকে বলে দিলে সমস্যার সমাধান হবে। তখন এলাকাবাসী সেলিম ওসমানের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো। আগামীতে সেলিম ওসমানকে নিয়ে এগিয়ে যাবো।

বিএনপি নেতা ও ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম নবী মুরাদ বলেন, সেলিম ওসমান উন্নয়ন ও অনুদানে কোন দল দেখেনি। এতে আমি অভিভূত। আমি সেলিম ওসমানের সঙ্গে আছি।

জাানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের বিএনপি দলীয় অনেক কাউন্সিলর ইতোমধ্যে মামলার আসামী হয়ে কারাভোগ শেষে সরকার দলের লেজুরবৃত্তি প্রকাশ্য শুরু করলেও এখনো কারাবন্দী ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। একের পর এক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। যতবার তিনি জামিন পাচ্ছেন ততবারই গ্রেফতার হচ্ছেন। এতে প্রতীয়মান হচ্ছে স্থানীয় প্রভাবশালী থেকে শুরু করে সরকারের সংশ্লিষ্টরাও খোরশেদের ব্যাপারে নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছেন। খোরশেদ যখন কারাগারে তখন বিএনপির অনেক জনপ্রতিনিধিকে দেখা যাচ্ছে সরাসরি সরকার দলের লেজুরবৃত্তি করতে। আর এ নিয়ে দলের ভেতরে ও বাইরে চলছে নানা সমালোচনা।

সিদ্ধিরগঞ্জে মামলার আসামী করা হয়েছিল সিটি করপোরেশনের ২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা ইকবাল হোসেন (৪০), সাবেক সংসদ সদস্য গিয়াসউদ্দিনের ছেলে ৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম মোহাম্মদ সাদরিল। এছাড়া সাদরিল বন্দর থানার দায়েরকৃত মামলার আসামী হয়েছিলেন। নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৯নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ইসরাফিল প্রধানও দীর্ঘদিন কারাভোগের পরে মুক্তি পেয়েছেন। বন্দর থানার মামলায় গ্রেপ্তার হয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের ২৭ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা কামরুজ্জামান বাবুল ও ২০নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর গোলাম নবী মুরাদ। বর্তমানে তারা কারামুক্ত হয়েছেন। ২১ নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও মহানগর বিএনপি নেতা হান্নান সরকারকে একাধিক মামলায় শ্যোন এরেষ্ট দেখানো হয়েছিল। তিনিও জামিন পেয়েছেন। উচ্চ আদালত থেকে জামিনে রয়েছেন জামায়াত নেতা ও উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, ২২নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর সুলতান আহাম্মেদ, ২৫নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর এনায়েত হোসেন।

বিএনপি নেতাদের একটি নির্দিষ্ট সূত্র বলছে, ‘ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাথে সখ্যতা রাখলে জেলা-জুলুম, হামলা-মামলা সহ্য করতে হয়না। এসব এড়াতে কৌশলে ক্ষমতাসীনদের সাথে সখ্যতা করতে হচ্ছে। কারণ ¯্রােতের বিপরীতে গেলে ডুবে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। আর যদি কোন ভাবে তীরে পৌঁছাতে পারলেও তা খুবই কষ্টকর হয়ে পড়বে। দল যখন ক্ষমতায় আসবে তখন নিজ নিজ পজিসন বুঝে নিব। এখন একটু কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘বিএনপি দলটি ঘুরে দাঁড়ানোর অনেক সুযোগ পেয়েছিল। কিন্তু দলের ভেতরে লেজুরবৃত্তি প্রকৃতির মেরুদ-হীন নেতাদের কারণে দলটি ঘুরে দাঁড়াতে পারছেনা। আর সাংগঠনিকভাবে বারবার দুর্বল হয়ে পড়ছে। এমনকি নিজেদের অন্তদ্বন্দ্বের কারণে বারবার নিজেরা বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। এতে করে ঘুরে দাড়ানোর সুযোগ হেলায় হারাচ্ছে।এতে করে দলের মেরুদ-হীন এসব নেতাদের নিয়ে বিপাকে পড়ছে ত্যাগী নেতারা। আর হাইকমা- তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে ব্যর্থ হচ্ছে।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ