৮ শ্রাবণ ১৪২৫, সোমবার ২৩ জুলাই ২০১৮ , ১২:০৮ অপরাহ্ণ

কালো তালিকাতে গাজী!


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৭:৩১ পিএম, ৬ জুলাই ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ০২:৪২ পিএম, ৮ জুলাই ২০১৮ রবিবার


কালো তালিকাতে গাজী!

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বর্তমানে আওয়ামী লীগের থাকা অন্তত শতাধিক এমপি কালো তালিকাতে রয়েছেন এমন খবর আসছে দেশের প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোতে। প্রাথমিকভাবে ১৩৫ আসনে আওয়ামী লীগের এমপিদের একটি তালিকা প্রকাশ পেলেও সেখানে নেই  নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর নাম।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের দুটি আসনে কারা মনোনয়ন পাচ্ছেন এমন একটি খবর প্রকাশ করেছেন দেশের প্রথম সারির দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন। এতে বলা হয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম বাবু মনোনয়ন পেতে যাচ্ছেন। তাদের মনোনয়ন নিশ্চিত। যদিও বর্তমানে এ দুটি আসনে তারাই এমপি।

বাংলাদেশ প্রতিদিনের ওই খবরে বলা হয়, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলীয় পর্যবেক্ষণ এবং বিভিন্ন জরিপের ভিত্তিতে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের বেছে নেওয়া হচ্ছে। বিএনপি নির্বাচনে আসবে এমনটা ধরে নিয়েই প্রার্থী তালিকা করা হচ্ছে। নানা কারণে বিতর্কিত হয়েছেন কিংবা দল ও সরকারের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন এমন শতাধিক এমপি-মন্ত্রী দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হতে পারেন। জনপ্রিয়তায় যারা এগিয়ে রয়েছেন, তাদেরই নৌকায় তুলছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একটি সুনির্দিষ্ট সময়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে মনোনীত প্রার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হবে বলে জানা গেছে। 

দলীয় সূত্রমতে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মূল লক্ষ্য ২১০টি আসন। বাকি ৯০টি আসন মহাজোটের জন্য রাখা হবে। ২১০টি আসনকে লক্ষ্যমাত্রা ধরে এরই মধ্যে ১৩৫টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা নিশ্চিত করেছেন। তারা বলছেন, সেপ্টেম্বরের আগেই দলের প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। জোটের প্রার্থীদের আসনও বণ্টন করা হবে তফসিল ঘোষণার আগেই। মনোনয়নবঞ্চিতরা যেন দলের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে না পারে, সে জন্য কেন্দ্র থেকে নানা বিকল্প দেখিয়ে তাদের সন্তুষ্ট করা হবে এবং সবাইকে দলের মনোনীত প্রার্থীকে পাস করানোর জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করার কথা বলা হবে। ১৩৫টি আসনের মধ্যে ১১টি আসনে দুজন করে প্রার্থী রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে একটু সময় নেওয়া হচ্ছে।

রূপগঞ্জের রাজনীতির মাঠে ক্রমেই কোনঠাসা হয়ে পড়ছেন গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতিক)। তিনিটি কারণে গোলাম দস্তগীর গাজী নেতাকর্মী শূণ্য হয়ে পড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী নির্বাচনে দল থেকে যদি তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয় তাহলে ভরাডুবির আশঙ্কা করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রূপগঞ্জের রাজনীতির মাঠে ক্রমেই একা হয়ে পড়ছেন গোলাম দস্তগীর গাজী। রূপগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তোফাজ্জল মোল্লা, সহসভাপতি শেখ সাইফুল ইসলাম, আজমত আলী ও মানজারে আলম টুটুল ছাড়া থানার কমিটির অন্য কোন সদস্যদের দেখা মেলে না তার সঙ্গে। এ চার নেতা নিজ নিজ এলাকায় ভোটারহীন। তাদের ব্যক্তিগত কোন ভোট ব্যাংক নেই। এছাড়ার অঙ্গসংগঠন যুবলীগের সভাপতি কামরুল হাসান তুহিন ও সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন এবং স্বেচ্ছাসেবকলীগ সভাপতি মাহাবুবুর রহমান মেহের ও সাধারণ সম্পাদক নাঈম ভূইয়া ছাড়া আর কেউ পাশে নেই। আর এ চার নেতার মধ্যে মোস্তাফিজুর রহমান শাহীনের জনপ্রিয়তা থাকলেও বাকীরা নিজ নিজ এলাকায় ঘৃণার পাত্র হিসাবে বিবেচিত। এ মুহূর্তে গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রধান ভরসা ‘মহিলালীগ’ এমনটা দাবী দলের সবার।

এদিকে গাজীর বিরোধী শিবিরে একাট্টা হয়েছেন সাবেক সাংসদ ও সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, উপজেলা চেয়ারম্যান ও থানা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়া, থানা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি খন্দকার আবুল বাশার টুকু, সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক, দপ্তর সম্পাদক আব্দুল আজিজ ছাড়াও থানা কমিটির ৪৪ নেতা। এছাড়া কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম রফিক, রূপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হোসেন ভূইয়া রানু ও দাউদপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবু হোসেন ভূইয়া রানু। রয়েছেন মনোনয়ন প্রত্যাশী আওয়ামীলীগ নেতা মেজর (অবঃ) মশিহুর রহমান বাবুল, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা মোশারফ হোসেন বাবু, ডাঃ খালেদা আক্তার, ব্যারিষ্টার পারভেজ। যুক্ত হয়েছেন তারাব পৌরসভার সাবেক মেয়র মাহবুবুর রহমান খান। এছাড়া যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও মহিলালীগের বিশাল বহর রয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রটি আরো জানান, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দু’বছর পর রূপগঞ্জ আওয়ামীলীগের বৃহৎ অংশের সঙ্গে গোলাম দস্তগীর গাজীর বিরোধের সৃষ্টি হয়। মিথ্যা মামলা, হামলাসহ নানা কারণে  দীর্ঘদিনের এ বিরোধ এখন পুঞ্জীভূত ক্ষোভে পরিণত হয়েছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগের সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক সংসদ মেজর জেনারেল কে এম শফিউল্লাহ, উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ও উপজেলা চেয়ারম্যান শাহজাহান ভূইয়া, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও আওয়ামীলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রফিক, আওয়ামীলীগ নেতা মেজর মশিহুর রহমান বাবুল, ব্যারিষ্টার শাহজাহান ভূইয়া, কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা মোশারফ হোসেন বাবু, ডাঃ খালেদা আক্তার, আবুল ফজল রাজুসহ ৯ জন একাট্টা। আর গোলাম দস্তগীর গাজী একা পথে হাঁটছেন। ঐ নয় জনের সঙ্গে উপজেলা আওয়ামীলীগের

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৫০ হাজার ভোটে বিএনপির প্রার্থী কাজী মনিরুজ্জামানকে পরাজিত করে নৌকার পালে হাওয়া তুলেন গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতিক)। ওই সময় সারাদেশে আওয়ামীলীগের জোয়ার থাকায় এবং রূপগঞ্জ আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা সঙ্গে থাকায় এমনটি সম্ভব হয়েছে বলে মনে করেন অনেকে। আচার আচরণ আর কর্মীদের খোঁজখবর নেওয়ার কারণে অল্প সময়ে গোলাম দস্তগীর গাজী দলীয় ঐ সময় কর্মীদের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে ২০১১ সালের এপ্রিলে মাসে উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূইয়ার সঙ্গে দ্বন্ধে জড়িয়ে পড়েন এমপি গাজী। শুরু হয় পাল্টাপাল্টি গ্রপিং লবিং। এ অবস্থা চলতে থাকে দশম সংসদ নির্বাচনের সময় পর্যন্ত। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর বিনা ভোটের নির্বাচনে পুনরায় গোলাম দস্তগীর গাজী পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এরপর থেকে গাজী-শাহজাহানের দ্বন্ধ আরো প্রকট হতে থাকে।

অনুসন্ধানে আরো জানা গেছে, দ্বন্ধের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ক্ষোভও বাড়তে থাকে গাজীর প্রতি। যেসব নেতাকর্মী ২০০৫ সালে অসহযোগ আন্দোলনে ও ওয়ান-ইলেভেনে রাজপথে গাজীর পাশে থেকে আন্দোলন-সংগ্রামে জড়িত ছিলেন তারাই এখন আওয়ামীলীগে থেকে ছিটকে পড়েছেন। তাদের স্থলে স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন হাইব্রীড, অতি উৎসাহী ও সুবিধাভোগী কতিপয় বিএনপির নেতাকর্মীরা। তাদের কারণে সরে দাঁড়িয়েছেন আওয়ামীলীগ ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৬ সাল থেকে গাজী-শাহজাহানের দ্বন্ধ সংঘাতে রূপ নেয়। এসময় আওয়ামীলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম রফিকের সঙ্গেও বাধ সাধে এমপি গোলাম দস্তগীর গাজীর। এ দ্বন্ধ-সংঘাত এখন হামলা-মামলায় জড়িয়ে পড়েছে।

নেতাকর্মীরা বলেন, গোলাম দস্তগীর গাজী মনোনয়ন পেলে শাহজাহান শিবির ও থানা আওয়ামীলীগের বড় একটি অংশ ভেতরে ভেতরে বিরোধীতা করবে। অপরদিকে শাহজাহান শিবিরের কেউ মনোনয়ন পেলে সেক্ষেত্রে এমপি শিবির ভেতরে ভেতরে বিরোধীতা করবে। এক্ষেত্রে ফলাফল দাঁড়াবে শূণ্যের কোঠায়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এমপি শিবিরের কয়েকজন নেতাকর্মী বলেন, নানা কারণে এমপি বলয়ের লোকজন কমে যাচ্ছে। দলীয় নেতামর্কীদের চেয়ে হাইব্রীড, মহিলালীগ ও বিএনপি-জামায়াতের লোকজন সুবিধা নিচ্ছে। যারা অসহোযোগ আন্দোলন ও ওয়ান-ইলেভেনে রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন তারা আজ নানাভাবে নির্যাতিত-নিগৃহীত।

নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ এলাকা একটি শিল্প এলাকা। পূর্ব পুরুষদের স্থানীয় বাসিন্দা না হলেও রূপগঞ্জে বর্তমানে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করতে যাচ্ছেন শিল্পপতি এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বীর প্রতীক।

নেতাকর্মীরা জানিয়েছেন, প্রায় দুই যুগ ধরে কোন্দলে জর্জরিত জেলার রূপগঞ্জ উপজেলা আওয়ামীলীগ। আর এ কোন্দল এখন আওয়ামী লীগের সকল অঙ্গসংগঠনের ভিতরেও। ছড়িয়ে পড়েছে থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামীলীগেও। ৮০ দশকের পর থেকে এ কোন্দল বেড়েই চলছে। কোন্দলের এই ঝড়ে বঙ্গবন্ধুর অনেক ত্যাগী সৈনিক অকালে ঝড়ে গেছে। অনেকে আবার রাজনীতি ছেড়ে বঙ্গবন্ধুর নাম বুকে নিয়ে নীরবে দিন কাটাচ্ছে। আবার কেউবা নিরবে বাচাঁর সংগ্রাম করছেন।

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ