৯ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ২:০৯ পূর্বাহ্ণ

নৌকা দাবীতে ‘জোর’ কমছে


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৯:২৯ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ বুধবার


নৌকা দাবীতে ‘জোর’ কমছে

আগামী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ অনেক আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনেই নৌকা প্রতিকের দাবী জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে তারা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে কোনভাবেই ছাড় দিতে রাজী নয়। তবে বরাবরই নৌকা প্রতিকের দাবী জানিয়ে আসলেও নারায়ণগঞ্জ আওয়ামীলীগ বারবার খেই হারিয়ে ফেলছেন। তারা তাদের দাবীর সাথে ধারাবাহিকতা রক্ষা করে চলতে পারছেন না। বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যেই দ্বন্দ্বে লিপ্ত হচ্ছেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে নৌকার দাবিতে রব তোলা আওয়ামীলীগ নেতারা ধীরে ধীরে নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছেন। নৌকার দাবিতে জোরালো কণ্ঠে এখন নরম সুর ভাসছে। আর নৌকার দাবিতে মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ধীরে ধীরে চুপসে যাচ্ছে। যার ফলে নৌকার দাবি থেকে আওয়ামীলীগ নেতারা সরে আসছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি দীর্ঘদিন ধরে জেলার প্রভাবশালী ওসমার পরিবারের সদস্যদের দখলে চলে আসছে। আর এটা হয়ে আসছে জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতিকের টিকেটে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে। আর এই সুযোগে নৌকা প্রতিকের দোহাই দিয়ে ওসমান পরিবারের বিরোধী পক্ষ আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে নৌকা প্রতিকের দাবি জানিয়ে আসছেন।

তাদের অভিযোগ, নারায়ণগঞ্জ-৫ সংসদীয় এলাকায় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টির দ্বারা নির্যাতিত, নিপেড়িত, নিস্পেষিত ও অত্যাচারিত হয়ে আসছে।

তাদের এই দাবীটি জোরালো হতে থাকে গত বছরের ২৫ নভেম্বর ৭৪ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটির অনুমোদন দেয়ার মধ্য দিয়ে। এরপর থেকেই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারী এবং নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি ও সেক্রেটারীসহ অধিকাংশ নেতাকর্মীরা নৌকার পক্ষে বিভিন্ন সভা সমাবেশে একের পর এই বক্তব্য দিয়ে আসছেন। তবে নৌকার পক্ষে বক্তব্য দিয়ে আসলেও তারা তাদের দাবীর সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না। বিভিন্ন সময় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছেন।

নেতাকর্মীদের সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসন কেন্দ্রিক নৌকা প্রতিকের দাবী তুঙ্গে থাকা অবস্থায় পবিত্র রমজান উপলক্ষে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের উদ্যোগে ইফতার পার্টির আয়োজন করা হয়। এই ইফতার পার্টির আয়োজনকে কেন্দ্র করে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। একে অপরকে নানা অভিযোগের তীরে বিদ্ধ করেন। ইফতার পার্টিতে অংশ নেয়নি অধিকাংশ নেতাকর্মী। ফলশ্রুতিতে জেলা আওয়ামীলীগের এই ইফতার পার্টি সফল হয়নি। কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে নৌকা প্রতিকের দাবীটিও জোড়ালো হয়নি।

এরপর আগামী সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে দলীয় প্রচার-প্রচারণা জোরদার করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় নির্দেশনা আসে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের খালি পড়ে থাকা পদগুলো পূরনের জন্য। কিন্তু এসকল পদ পূরণে গত ২৯ জুলাই ও ৩১ জুলাই পর পর দুইবার সভা করেও তারা ব্যর্থ হয়েছেন। একে অপরের সাথে লিপ্ত হয়েছেন উচ্চ্য বাক্যলাপে। সর্বশেষ বিষয়টি নিয়ে ঝুলে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ। যদিও তারা শোকের মাস আগস্ট উপলক্ষে সভার মূলতবি করেছিলেন।

এদিকে গত ২ সেপ্টেম্বর ছিল হিন্দু ধর্মালম্বীদের জন্মাষ্টমী। দিনটি উপলক্ষ্যে সে রাতে শহরের দেওভোগে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান সংষদ সদস্য সেলিম ওসমান। একই অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামীলীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেন ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। সেলিম ওসমানের উপস্থিতিতে তারা দুইজনেই নৌকা প্রতিকের দাবিতে মিইয়ে গেছেন।

নৌকা প্রতিকের মনোনয়ন প্রত্যাশী খোকন সাহা বক্তৃতায় বলেন, ‘প্রিয় ভাইয়েরা এটা ধর্মীয় অনুষ্ঠান, এখানে রাজনৈতিক বক্তব্য চলে না। তারপরেও বলতে চাই, ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন উনার প্রার্থী, উনার প্রার্থী যেই হবেন তাকে আমরা জয়যুক্ত করবো। আগামীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আবার ক্ষমতায় আনবেন শেখ হাসিনার প্রার্থীকে জয়ী করে।’ অথচ এই খোকন সাহা কিছুদিন আগের বক্তৃতায়ও নৌকা প্রতিক নির্বাচন করার লক্ষ্যে দৃঢ় মনোবল ব্যক্ত করেছিলেন।

এই নেতাও নৌকার দাবিতে বেশ কড়া বক্তব্য রেখে আসছিলেন। তিনি নিজেও এ আসনে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেন। বলেন, ‘১৭ বছর ধরে এ আসনে নৌকা নাই। এবার আমরা এ আসনে নৌকার মাঝি চাই।’

এছাড়া লাঙলের ভার জনগণ সইতে পারছেনা বলেও তীব্র সমালোচনাও করেন এই নেতা। তখন এই নেতাকে বেশ উজ্জীবিত দেখা গেছে। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই নেতা অনেকটা চুপসে যায়। আর ভিন্ন সুরে কথা বলতে শুরে করে।

অপরদিকে আনোয়ার হোসেনও তার বক্তৃতায় নৌকা প্রতিক নিয়ে কোনো কথা বলেননি। তার বক্তৃতা ছিল অনেকটা এড়িয়ে যাওয়ার মতো। যিনি এর আগে প্রায় সকল বক্তৃতায় নৌকা প্রতিকের পক্ষে কথা বলেছেন। কোন কোন সময় জ্বালাময়ী বক্তব্যও দিয়েছেন। কিন্তু এদিনের অনুষ্ঠানে নৌকার পক্ষে কোনো আওয়াজই করেন নি। যদিও অনুষ্ঠানটি ছিল ধর্মীয়। তবে নির্বাচনের কাছাকাছি সময়ে এসে হিন্দু সম্প্রদায়ের মনযোগ আকর্ষণের জন্য অনুষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাছাড়া এই অনুষ্ঠানে দলীয় নেতাকর্মীদের মিলনমেলাও ঘটেছিল। তারপরেও নৌকা প্রতিকের বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছেন তিনি।

৪ সেপ্টেম্বরে আলোচনা সভায় জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষ্যে আমাদের মধ্যে কোন দ্বন্দ্ব নেই। আমরাও শেখ হাসিনার কথা বলি এবং সেলিম ওসমানও শেখ হাসিনার কথা বলে। দল যাকে ভাল মনে করে তাকেই সিলেকশন করবে। আমাদের সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার বাইরে না। কে নির্বাচন করবে এটা উপরওয়ালা জানেন। যদি উপরওয়ালা থেকে নির্ধারণ করা হয়ে থাকে সেলিম ওসমান নির্বাচন করবেন তাহলে তিনিই নির্বাচন করবেন। যদি আমি নির্ধারিত হয়ে থাকি তাহলে আমি নির্বাচন করবো।

অথচ এক সময়ে মনোনয়ন ইসুতে নিজ বলয়ের নেতার সাথে বাকযুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এই নেতা। জাতীয় পার্টি থেকে নির্বাচিত নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানের ভাই শামীম ওসমানের ঘনিষ্ট বন্ধু হওয়া সত্ত্বেও বাদল নির্বাচন ইস্যুতে সেলিম ওসমানের সাথে বাকযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিলেন। পরে অবশ্য এ বিষয়ে বিবৃতিও দিয়েছিলেন। তারপরেও নির্বাচনের এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে শামীম ওসমান ও সেলিম ওসমানের সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয় বাদলের। তবে এবার তার দাবি থেকে সড়ে এসে কিছুটা নমনীয় হয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনেই আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী সবচেয়ে বেশী। এই আসনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন বিগত নির্বাচনে আওয়ামীলীগের মনোনয়ন পাওয়ার পরেও শেখ হাসিনার নির্দেশে প্রার্থীতা প্রত্যাহার করা শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ, জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল ওরফে ভিপি বাদল, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি আরজু রহমান ভূইয়া, জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক একেএম আবু সুফিয়ান, জেলা আওয়ামীলীগের সহসভাপতি ও জেলা যুবলীগের সভাপতি আব্দুল কাদির, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিছুর রহমান দিপু, মহানগর আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জিএম আরাফাত।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের আগে নৌকার মনোনয়ন প্রত্যাশীদের হঠাৎ করে চুপসে গিয়ে নরম সুর দিচ্ছে। তাদের নৌকার পালে হাওয়া পাল্টে যায়। তারা নৌকার দাবি থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছেন। এক সময় তারা দাবি করতেন, অন্য কোন আসনে দিলেও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে নৌকা ছাড় দেয়া যাবেনা। কিন্তু এখন সেই জোরালো দাবি হাওয়া পরিবর্তন করে ভিন্ন সুরে বাজতে শুরু করেছে। আর এই আসনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশী এমপি সেলিম ওসমানের সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হতে দেখা যাচ্ছে। এতে করে এই আসনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়ার ফরে তারা হয়তো নৌকার দাবি থেকে দূরে সরে আসছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘নৌকা দাবিতে জ্বলে উঠা নেতারা যখন থমকে যায় তখন নৌকার হাওয়া অন্য পালে লাগতে শুরু করেছে এটা অনেকটা স্পষ্ট হচ্ছে। আর আওয়ামীলীগের শরীক দল জাতীয় পার্টির মনোনিত প্রার্থীর সাথে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া সহ তার সুরে কথা বলার বিষয়টিতে এই আসনে ছাড় দেয়ার দৃষ্টান্ত তৈরি হতে পারে। তবে নৌকার দাবি থেকে আওয়ামীলীগ নেতাদের সরে আসার পেছনে কারণ হিসেবে অন্তর্গত সমঝোতা কিংবা কেন্দ্রীয় চাপের মত দুটি বিষয় থাকতে পারে। আর দলের হেবিওয়েট নেতারা এভাবে নৌকার দাবি থেকে সরে আসলে বাকিরা এমনিতে চুপশে যাবে। যেকারণে নৌকার দাবি থেকে আওয়ামীলীগ নেতাদের সরে আসার বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হচ্ছে।’

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ