২৯ কার্তিক ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৩ নভেম্বর ২০১৮ , ১:৪২ অপরাহ্ণ

UMo

জমিয়তের আড়ালে জামায়াতে ইসলামের প্রার্থী!


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৩২ পিএম, ২০ অক্টোবর ২০১৮ শনিবার


বায়ে গোল চিহ্নিত মনির হোসাইন ও ডানে মাওলানা মঈনউদ্দিন

বায়ে গোল চিহ্নিত মনির হোসাইন ও ডানে মাওলানা মঈনউদ্দিন

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ২০ দলীয় জোটের শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জেলার সভাপতি মুফতি মনির হোসাইনকে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে ঘোষণা দেয়া হয়। কিন্তু জমিয়ত ইসলাম দলটির সাথে জামায়াতের প্রকাশ্য সম্পর্ক রয়েছে যা বিগত দিনের জমিয়তের অনুষ্ঠানগুলোতে দেখা গেছে। তবে সরকারী দলের বিভিন্ন লোকজনদের সাথে আতাঁত করে চলা হেফাজত ও জমিয়ত নেতারা ভেততে ভেতরে নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াতে ইসলামের এজেন্ড বাস্তবায়ন করছে এটা অনেকটা ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গোপন বৈঠকের সময় মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদ সহ ৯জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা করার জন্য ওই বৈঠক করছিল বলে দাবি পুলিশের।

১৯ অক্টোবর শুক্রবার সকালে ফতুল্লা হাজীগঞ্জ এলাকায় মাওলানা মঈনুদ্দিন আহমাদের নিজ বাসা থেকে তাদের আটক করা হয়। আটককৃত অন্যরা হলেন মো. রাশেদ ব্যাপারী (৭০), আলমগীর বাহার (৫৫), মো. আল আমিন (৪২), শহিদুল ইসলাম পিন্টু (৪৮), আনোয়ার হোসেন (৪৫), হারুন অর রশিদ (২৭), জাকির হোসেন (৫৫)। তারা প্রত্যেকে জামায়াতে ইসলামীর শহর ও বন্দর শাখার সক্রিয় সদস্য।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মঞ্জুর কাদের জানান, নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা করার উদ্দেশ্যে জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা গোপন বৈঠক করছিল এমন সংবাদের ভিত্তিতে তাদের ৯জনকে আটক করা হয়। তারা প্রত্যেকে শহর ও বন্দর শাখার সক্রিয় সদস্য। মঈনউদ্দিনের বাসা থেকে ৫টি ককটেল, ৭টি আতশবাজি ও বেশ কিছু রডের টুকরো উদ্ধার করে।

গত ৫ অক্টোবর বিকেলে নারায়ণগঞ্জ শহরের একটি চাইনিজ রেস্টুরেন্টে সভা করে জমিয়তের প্রার্থীতা ঘোষণা দেওয়া হয় যেখানে জমিয়ত ও হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন। দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতাদের উপস্থিতিতে প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে ঘোষণা আসে।

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিএনপির চেয়ে হেফাজত ও জমিয়তের সঙ্গে জামায়াতের সখ্যতা বেশী। সে কারণেই অনেকেই চাচ্ছেন জামায়াতের ভোট ব্যাংককে কাজে লাগাতে। সে কারণেই এ আসনটি জমিয়ত চাচ্ছে। তাছাড়া গত দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জমিয়ত, হেফাজত ও জামায়াত ভেতরগত জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করেছিল। ২০১১ সালের নির্বাচনে এ জোট সরাসরি মেয়র প্রার্থী শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে গিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে কাজ করেছিল। পরে সবশেষ ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনেও এ জোট কাজ করেছিল আইভীর পক্ষে পরোক্ষভাবে। তখন এ জোট পরোক্ষভাবে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছিল।

সেই জোট এবার নিজেরাই প্রার্থীতা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ইতোমধ্যে জামায়াতের সঙ্গে তাদের একাধিক বৈঠকও হয়েছে। আর বিগত দিনে জমিয়তের সবগুলো অনুষ্ঠানেই হাজির হয়েছিলেন জামায়াতের শীর্ষ নেতারা।

গত ২৫ মে শুক্রবার জমিয়তে উলামা ইসলাম যে কমিটির নেতৃত্বে আবার হেফাজতে ইসলামের নেতারাও তাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ যিনি সম্প্রতি নাশকতা মামলায় গ্রেফতার হয়েছেন। এর আগে তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগ করেছিলেন। এই অনুষ্ঠানের সভাপতিত্বে ছিলেন জেলা জমিয়তের সভাপতি মুফতি মনির হোসাইন।

জানা গেছে, যুদ্ধাপরাধ অভিযোগে জামায়াতের অনেক শীর্ষ নেতার কারাদন্ড হয়েছে। এখনো কারাগারে আছে অনেকে। এসব কারণে দলটির নিবন্ধনও বাতিল হয়ে গেছে। ২০ দলীয় জোটে জামায়াত থাকলেও সেটা না থাকার মত। কারণ জামায়াতকে বর্তমান প্রজন্ম ও সাধারণ জনতাও এখন ভিন্ন চোখে দেখে, নাক সিটকায়। সেই জামায়াতে নারায়ণগঞ্জে হেফাজতে ইসলাম নতুন করে সামনে নিয়ে আসছে। হেফাজতের ভেতরগত সংগঠন জমিয়তে উলামা ইসলাম ইফতার ও আলোচনা সভা করে।

এর আগে গত ২৩ মে বাদ আসর শহরের চাষাঢ়ায় হোয়াইট হাউজে ইসলামী আন্দোলন নারায়ণগঞ্জ মহানগরের উদ্যোগে বিশিষ্ট সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্টজনদের সম্মানে আয়োজিত আলোচনা সভা ও ইফতার মাহফিলে মহানগর হেফাজতে ইসলামের সভাপতি মাওলানা ফেদাউসুর রহমান বলেন, আজকে বাম পন্থী দলগুলো কি পরিমাণ ভোট পাবে। একটি অংশীদার হওয়ার কারণে বাম পন্থী দলের অনেক নেতা আজকে সরকারের নানা সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে। অথচ আমরা ইসলামী দলগুলো কেন এক মঞ্চে আসতে পারছিনা। আজকে যদি আমরা এক পতাকাতলে আসতে পারি তাহলে আমার বিশ্বাস আওয়ামীলীগ বিএনপি মিলেও আমাদেরকে পরাজিত করতে পারবেনা।

হেফাজতে ইসলামের একাধিক নেতা জানান, ইতোমধ্যে স্থানীয় জামায়াতের নেতাদের সঙ্গে একাধিবার বৈঠক হয়েছে হেফাজত ও জমিয়তের একাধিক নেতার। তাদের বৈঠকের মূল বিষয় ছিল আগামী নির্বাচন। ওই নির্বাচনে নিজেদের মেলে ধরার জন্য হেফাজত মোটা অংকের একটি বাজেট দেয় জামায়াতকে। আর জামায়াতও সেটা লুফে নিয়ে পৃষ্ঠপোশকতার আশ্বাস দেন।

একাধিক সূত্র বলছে, ‘নিষিদ্ধ ঘোষিত জামায়াত ইসলাম দলটির যেসব নেতারা চিহ্নিত হয়ে গেছে তারা জামায়াতের নাম চাইলেও মুছে ফেলতে পারছেনা। একারণে তাদের অনুগামীদের বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের নামে তারা এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছে। আর সেই সব ইসলামিক সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে জামায়াতের অনুগামীদের পদায়িত করা হচ্ছে। এতে করে জামায়াত দলটি প্রকাশ্যে না আসলেও সেসব দলের আড়ালে থেকেও তারা দলটির কার্যক্রম ও টার্গেট পূরণ করতে পারছে। তাই হেফাজত ও জমিয়তের মত দলগুলো নামে ভিন্ন হলেও মূলত জামায়াতে ইসলাম লোক ভিড়িয়ে তাতে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এতে করে হেফাজত ও জমিয়তকে জামায়াতের বি টিম বলা হচ্ছে। এটা অবশ্য ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী প্রথম থেকে বলে আসলেও তখন কেউ কর্ণপাত করেনি। কিন্তু এখন এই বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে।’

জামায়াতে ইসলাম দলটি অনেকটি অনেকটা বেকায়াদায় থাকার ফলে তারা কৌশলে বিভিন্ন সংগঠনের নামে আবারো ক্ষমতায় আসতে চাইছে। যেকারণে তারা নানা ইসলামিক দলের নামে তাদের লোকজনদের ক্ষমতায় বসাতে চাইছে। এতে করে তারা বেশ কৌশলে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলটির সাথে পূর্বে চরম দ্বৈরথ থাকলেও বর্তমানে আতাঁত করে এগিয়ে চলছে। এতে করে নানা রকম ঝামেলা এড়িয়ে দলটি নিজস্ব ক্ষমতা কায়েম করার লক্ষ্যে এগোচ্ছে। তাই নানা উপায়ে জামায়াতে ইসলামর বি টিম অর্থাৎ হেফাজত ও জমিয়তের নেতাদের ফের ক্ষমতায় আনতে চাইছে। তাই নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে এবার সেই লক্ষ্যে জেলা জমিয়তের সভাপতি মুফতি মনির হোসাইনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘কৌশলী জামায়াতে ইসলাম দলটি কৌশলের পারদর্শীতায় বিভিন্ন ইসলামিক সংগঠনের নামে তাদের লোকজনদেন ক্ষমতায় বসাতে চাইছেন। তাই জমিয়ত ও হেফাজতের লোকজনদের নির্বাচন নিয়ে জামায়াত দলটি নানা আলোচনা শুরু হয়েছে যা ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে। তাই মূলত জমিয়তের প্রার্থী মুফতি মনির হোসাইন মূলত জমিয়তের আড়ালে জামায়াতের প্রার্থী। তবে জমিয়ত ও হেফাজত দলীটি ক্ষমতার পেছনে তাড়া করে এখন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সাথে আতাঁত করে এগোচ্ছে। কিন্তু ক্ষমতা হাসিল হয়ে গেছে তারা প্রকৃত চেহারায় ফিরে আসবে। মূলত জামায়াতের বি টিম জমিয়ত ও হেফাজতের মূল লক্ষ্য হচ্ছে যে কোন মূল্যে ক্ষমতা হাসিল করা।’

সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, বিএনপির চেয়ে হেফাজত ও জমিয়তের সঙ্গে জামায়াতের সখ্যতা বেশী। সে কারণেই অনেকেই চাচ্ছেন জামায়াতের ভোট ব্যাংককে কাজে লাগাতে। সে কারণেই এ আসনটি জমিয়ত চাচ্ছে। তাছাড়া গত দুটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও জমিয়ত, হেফাজত ও জামায়াত ভেতরগত জোটবদ্ধ হয়ে কাজ করেছিল। ২০১১ সালের নির্বাচনে এ জোট সরাসরি মেয়র প্রার্থী শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে গিয়ে সেলিনা হায়াৎ আইভীর পক্ষে কাজ করেছিল। পরে সবশেষ ২০১৬ সালের ২২ ডিসেম্বর নির্বাচনেও এ জোট কাজ করেছিল আইভীর পক্ষে পরোক্ষভাবে। তখন এ জোট পরোক্ষভাবে ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেন প্রার্থীর বিরুদ্ধে কাজ করেছিল।

জানা গেছে, এক সময়ে রাজনীতিতে সক্রিয় জামায়াতে ইসলাম এখন নানা কারণে বিতর্কিত। যুদ্ধাপরাধ সম্পৃক্ত এ দলটি ইতোমধ্যে ভোটে অযোগ্য হতে চলেছে। কিন্তু জামায়াত এবার তলে তলে হেফাজত ও জমিয়তকেই পেছন থেকে পৃষ্ঠপোশকতা করছে। মোটা অংকের টাকা প্রদান করা হচ্ছে হেফাজতকে। মূলত আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখেই এ টাকা পৃষ্ঠপোশকতা করা হচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জে বিতর্কিত হেফাজতে ইসলামের নেতারা রাজনৈতিক অরাজনৈতিক বিভিন্ন ইসলামী সংগঠন পরিচালনা করে আসছে। কখনো ওলামা পরিষদ, কখনো জমিয়ত সহ বিভিন্ন সংগঠনের মধ্য দিয়ে হেফাজতের নেতারা তাদের স্বার্থ হাসিল করে থাকে। রাজনৈতিক লোভ লালসা, স্বার্থের কারণে ক্ষমতার প্রচন্ড লোভ তাড়া করে বেড়িয়েছিল এ সংগঠনের নেতাদের।

এবছরও জমিয়তে উলামা ইসলাম যে কমিটির নেতৃত্বে আবার হেফাজতে ইসলামের নেতারাও তাদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ যিনি সম্প্রতি নাশকতা মামলায় গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেছিলেন।

হেফাজতের একজন নেতা জানান, আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক। এ দেশে মুক্তিযুদ্ধের অনেক দিবস আছে। যেমন একুশে ফেব্রুয়ারী মাতৃভাষা দিবস, ঐতিহাসিক ৭ মার্চ, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবস, ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস, ২৬ মার্চ মহান স্বাধীনতা দিবস, ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস, ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবি হত্যা দিবস, ১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস সহ এ ধরনের কোন দিবসের অনুষ্ঠানে হেফাজতের অংশগ্রহণ নাই। বিগত দিনে কোন সময়ে এসব অনুষ্ঠান পালন করা হয়নি। যদিও এসব দিবসে কদাচিৎ মাদ্রাসাও খোলা রাখে হেফাজত নেতারা। তাদের যুক্তি এসব দিবসে কোন অনুষ্ঠান করা হারাম।

শহীদ মিনার, চাষাঢ়া বিজয় স্তম্ভে কখনো শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে ফুল দিতেও দেখা যায়নি হেফাজত নেতাদের। বরং মহান আল্লাহ ও রাসূলকে (সা.) নিয়ে সবচেয়ে বাজে মন্তব্য করা ব্লগার রাজীব হায়দার শোভনকে হত্যার পর তাঁর নামে যারা চাষাঢ়ায় চত্বর ঘোষণা করেছিল সেসব নেতাদেরকে নিয়েই বরং এখন পথ চলছে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর হেফাজত। যদিও তাদের সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে।

rabbhaban

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

রাজনীতি -এর সর্বশেষ