শামীম গিয়াস মনোনয়নের পরে লড়বে আসল চ্যালেঞ্জে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৫:৫১ পিএম, ২১ নভেম্বর ২০১৮ বুধবার



শামীম গিয়াস মনোনয়নের পরে লড়বে আসল চ্যালেঞ্জে

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলের সাংসদ শামীম ওসমান ও বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনের মধ্যে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছোড়াছুড়ির ঘটনা রীতিমত টক অব দ্যা টাউনে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে জল কম ঘোলা হয়নি।

এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুই নেতা নিজ নিজ দল থেকে মনোনয়ন প্রত্যাশা করেছেন। এখন যদি মনোনয়ন রেসে টিকে যায় তবেই ভোটের লড়াইয়ে এই দুইজন মুখোমুখি হবে। আর তাতে করে ওপেন চ্যালেঞ্জে মুখোমুখি হবেন প্রভাবশালী দুই নেতা।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দামামা ইতোমধ্যে বাজতে শুরু করেছে। রাজনীতিক দলগুলো মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মনোনয়ন ফরম ও দাখিল কাজটি করছেন। খুব শিঘ্রই দলের মনোনয়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রার্থী ঘোষণা করবে রাজনৈতিক দলগুলো। এর মধ্যে রয়েছে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের আওয়ামীলীগের সাংসদ শামীম ওসমান। অন্যদিকে এই আসন থেকেই বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

গত ৫ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের মিজমিজি পশ্চিম পাড়া উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে কর্মীসভায় শামীম ওসমান সাবেক সাংসদ মুহাম্মদ গিয়াসউদ্দিনের ব্যাপক সমালোচনা করে বলেছিলেন, ‘আপনি অন্য এলাকার কোনো কাজ করেন নাই। তাই বলে নিজের এলাকার উন্নয়নও করবেন না! আসলে তিনি উন্নয়ন করবেন কি, তিনি তো শুধু খাই, খাই আর খাই করেই পার করেছেন ৫ বছর। এই যে রেবতী মোহন স্কুল। এই স্কুলে সারাজীবন উনিই চেয়ারম্যান ছিলেন। উনিই সব কিছু। অথচ উনি এই স্কুলেরর জন্য কিছুই করলেন না। আমি আইসা এই স্কুলে ৪ থেকে সাড়ে ৪ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করে দিলাম।’

এমপি শামীম ওসমানের সামলোচনার প্রেক্ষিতে ৭ অক্টোবর গিয়াসউদ্দিনও পাল্টা জবাব দেন। প্রতিক্রিয়ায় গিয়াসউদ্দিন বলেছেন, শামীম ওসমান আসলে একজন কাপুরুষ। তিনি (শামীম ওসমান) বলে বেড়ান ৭ হাজার ৪শ কোটি টাকার কাজ করেছেন। এত টাকার উন্নয়ন তিনি কোথায় করলেন? আমি বিশ্বাস করি এর হিসেব তিনি নিজেও দিতে পারবেন না। বলার জন্য তিনি এসব বলে বেড়াচ্ছেন যা গলাবাজি ছাড়া আর কিছু নয়। উনি নিজেকে খুব চালাক ভাবেন আর সাধারণ মানুষকে বোকা মনে করেন। আসতে তিনি নিজেই বোকার স্বর্গে বাস করছেন। এখনকার মানুষ যথেষ্ট সচেতন। তারা ভালো মন্দের নির্ণয় করতে জানেন। তারা বুঝেন শামীম ওসমানের গলাবাজিটা। তাই এই জনগণই সময় হলে শামীম ওসমানের এমন গলাবাজির জবাব দিয়ে দিবেন।”

গিয়াসউদ্দিন চ্যালেঞ্জ করে বলেন, “আমার ৫ বছরে আমি যতটুকু কাজ করেছি সেই কাজের উপর দাঁড়িয়েই তিনি মিথ্যা বলে বেড়ান। আমার কাজের উপর দাঁড়িয়েই তিনি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। আমার কাজের উপর দাঁড়িয়েই তিনি সভা সমাবেশ করেন। ফতুল্লা সিদ্ধিরগঞ্জের মানুষ জানেন, তিনি কতটুকু কাজ করেছেন আর আমি কতটুকু করেছি। তিনি যদি বেশি কাজ করে থাকেন তাহলে নিশ্চয় জনগণ তাকে বেশি ভালোবাসবেন? তাহলে এত ভয় কেন? দিক না সুষ্ঠু একটা নির্বাচন আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করুক, তখনই প্রমাণ হবে জনগণ কাকে বেছে নেয় আর কাকে ছুড়ে ফেলে দেয়।”

এর মাত্র একদিন পর ৮ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জের সাইলা এলাকাতে ৫ নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের কর্মীসভায় গিয়াসউদ্দিনকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান পাল্টা চ্যালেঞ্জ করে বলেন, ‘আপনি ভয় পাইয়েন না। আমি পুলিশের হাতে পায়ে ধরে বলবো আপনাকে যেন গ্রেফতার না করে। আমি একা থাকবো স্টেজে। আপনি আপনার লোক নিয়ে থাইকেন। আসেন একটা চ্যালেঞ্জ নেই। ৯৬ থেকে ২০০১ আর ২০০৮ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত আমি কি করছি আ আপনি কি করছেন। সমান সমান হওয়ার দরকার নাই। আপনি যদি আমার কাজের ৫ ভাগের ১ ভাগও করে থাকেন তাহলে আমি আর নির্বাচন করবো না।’’

গত ১০ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বিএনপি দলীয় সাবেক সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ্য করে শামীম ওসমান বলেন, যেভাবে সম্পদ লুট করেছেন, সেই হিসাবে বেশীদিন টিকবেন না। যদি আপনি আমার ২০ ভাগের ১ ভাগ উন্নয়নও করে থাকেন, তবে রাজনীতি ছেড়ে দিব। আপনি আসেন, সাহস থাকলে এক মঞ্চে উঠেন কে কত উন্নয়ন করেছেন জনগণের কাছে প্রকাশ করি। মঞ্চে শুধু আপনার সাথে বিএনপির লোক থাকবে। আর আমি থাকবো একা।

শামীম গিয়াসের পাল্টাপাল্টি চ্যালেঞ্জের মধ্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ইস্যুতে এই দুজন টিকে গেলে ভোটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে। এতে করে সাংসদ শামীম ওসমান গিয়সউদ্দিনের চ্যালেঞ্জে অংশগ্রহণ করা হয়ে যাবে। কিন্তু শামীম ওসমানের দেয়া চ্যালেঞ্জে গিয়াসউদ্দিন সেই ক্ষেত্রে পিছিয়ে আছে। কারণ তিনি শামীম ওসমানের চ্যালেঞ্জ এখনো অংশগ্রহণ করেনি। তবে ভোটের লড়াইয়ে শামীম ও গিয়াসের মধ্য যে চ্যালেঞ্জ দেয়া হয়েছে যদি তারা দুজন মনোনয়নের গন্ডি পেরিয়ে ভোটের লড়াইয়ে অংশগ্রহণ করে তখন সেই চ্যালেঞ্জ বাস্তবে দেখা যাবে। আর তাতে করে ভোটের লড়াই শুধুমাত্র নির্বাচনী ইস্যুতে সীমাবদ্ধ থাকবেনা। বরং এটি তাদের জন্য প্রেসটিজ ইস্যুতে পরিণত হবে। কারণ চ্যালেঞ্জে কেউ কাউকে ছাড় দিতে নারাজ। তাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সেই বিষয়টি ফুঁটে উঠেছে। এতে করে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই দুই প্রার্থীর মধ্যে ভোটের লড়াই চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হবে। আর তারা দুইজনের সেই চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে প্রাণপন লড়াই করে যাচ্ছে। এতে করে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই দেখা যাবে এই আসনে যদি এই দুজন মনোনয়ন রেসে টিকে যায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের দুই প্রভাবশালী নেতা শামীম ওসমান ও গিয়াসউদ্দিন ভোটের লড়াইয়ে মুখোমুখি হয়েছিলেন। এর সেই যুদ্ধে গিয়াসউদ্দিন বিশাল শামীম ওসমানকে পরাজিত করেন। এরপর একাদশ নির্বাচনে যদি ফের এই দুই নেতা মুখোমুখি হলে খেলা জমে উঠবে। একদিকে শামীম ওসমান ২০০১ সালের নির্বাচনে পরজয়ের প্রতিশোধ নিয়ে সম্প্রতি দেয়া ওপেন চ্যালেঞ্জে জয়ী হতে চাইবে। অন্যদিকে গিয়াসউদ্দিন ফের এই আসনে শামীম ওসমানের বিরুদ্ধে জয়ের ধারা অব্যাহত করে দলকে এগিয়ে নিয়ে যাবে আর শামীম ওসমানকে দেয়া তার ওপেন চ্যালেঞ্জে জয়ী হয়ে উঠবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগের টিকেটে একেএম শামীম ওসমান ৭৩ হাজার ৩৪৯ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়। আর তার নিকটতম প্রতিদ্বন্ধী কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৬৩ হাজার ৮৯৯ ভোট। ২০০০ সালের ১৬ এপ্রিল দেশ বরেণ্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে তোলারাম কলেজে জাহানারা ইমাম ভবন উদ্বোধনের পর মুক্তমঞ্চের সমাবেশ থেকে নারায়ণগঞ্জে নিজামী, খালেদা জিয়াকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। এ নিষেধাজ্ঞা সংবলিত একটি সাইনবোর্ড নারায়ণগঞ্জে প্রবেশ মুখ লিংক রোডে স্থাপন করা হয়। এসব ঘটনার কারণে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়।

সূত্র মতে, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার ভোটযুদ্ধে নামেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের সন্তান শামীম ওসমান ও এই আসনের আরেক প্রভাবশালী নেতা গিয়াসউদ্দীন। শামীম ওসমান আওয়ামীলীগ থেকে নৌকা প্রতীকে অন্যদিকে গিয়াসউদ্দীন বিএনপি থেকে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহন করেন। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের নির্বাচনে বিএনপি দলীয় গিয়াসউদ্দিন ১ লাখ ৩৭ হাজার ৩২৩ ভোট পেয়ে এমপি নির্বাচিত হয়। আর শামীম ওসমান পেয়েছিলেন ১ লাখ ৬ হাজার ১০৪ ভোট। সে নির্বাচনে ১৯৩ আসনে জয়লাভ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি সরকার গঠন করে। নির্বাচনে শামীম ওসমান পরাজিত হোন। তবে সেই লড়াইটি অনেকটাই উপভোগ্য ছিলো বলে মন্তব্য করেছেন জেলার রাজনৈতিক বোদ্ধাগন।

পরবর্তীতে শামীম ওসমান ২০০৮ সালে মনোনয়ন না পাওয়ায় এমপি নির্বাচিত হন সারাহ বেগম কবরী। শামীম ওসমান পরবর্তীতে ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও