নরঘাতক নূর হোসেন কারাগারে : সিদ্ধিরগঞ্জে বেকায়দায় শাহআলম

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:০৩ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০১৮ শুক্রবার



নরঘাতক নূর হোসেন কারাগারে : সিদ্ধিরগঞ্জে বেকায়দায় শাহআলম

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত প্রধান আসামী নূর হোসেন। তিনি যখন ছিলেন মুক্ত বিহঙ্গনে তখন তার ছায়াতে রাজনীতির মাঠ দাবড়ে বেড়াতেন ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি শাহআলম। সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাতে নূর হোসেনের কারণেই কদাচিৎ চষে বেড়াতেন তিনি। তবে নূর হোসেন কারাগারে থাকায় আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বেশ বেকায়দায় পড়েছেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য শিল্পপতি মুহাম্মদ শাহআলম। কারণ তিনি নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থী। আর এ আসনটি সিদ্ধিরগঞ্জ ও ফতুল্লা থানা কেন্দ্রীক। অনেকেই বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে যখন নূর হোসেনের দাপট ছিল তখন শাহআলমকে মামলার আসামি হতে হয়নি।

জানা গেছে, এক সময়ের ট্রাকচালক নূর হোসেন ২০০৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই সিদ্ধিরগঞ্জে টাকার রাজ্য ও নানা অপরাধের জগত। আওয়ামী লীগের নেতা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তারা পেত তেমনি টাকার একটি ভাগ যেত স্থানীয় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পকেটে। বিএনপি নেতারা শুধু নূর হোসেনের টাকাই নয় সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপিকে আলিশান কার্যালয় করে দিয়েছিল নূর হোসেন।

নূর হোসেনের আমলে বিএনপির বিভিন্ন স্তরের নেতাদেরকে নূর হোসেনের আস্তানায় দেখা গেছে অনেকবার। মাঝারি সারির নেতাদেরকে দিয়ে শীর্ষ নেতারা নিয়মিত মাসোহারাও নিত। কয়েক বছর পূর্বে শিমরাইলে হেফাজতের লংমার্চ সহ অন্য কর্মসূচিতেও নূর হোসেন মোটা অংকের টাকা প্রদান করেছিল। সেভেন মার্ডারের পর তদন্ত করতে গিয়ে একটি গোয়েন্দা সংস্থা এসব তথ্য পেয়েছিল।

নূর হোসেনের আপন বড় ভাই মিয়া মোহাম্মদ নূর উদ্দিন সিদ্ধিরগঞ্জে থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক। মূলত তার সূত্র ধরেই নূর হোসেনের সঙ্গে কানেকশন ছিল বিএনপি নেতাদের। সম্পৃক্ত নেতাদের মধ্যে ফতুল্ল¬া থানা বিএনপির সভাপতি মোহাম্মদ শাহআলমের ঘনিষ্টতা ছিল বেশি। যে কারণে নূর হোসেন সিদ্ধিরগঞ্জ শিমরাইলে আলিশান ভবনে বিশাল একটি বিএনপি কার্যালয় করে দেন। ওই কার্যালয়টি ভাড়া ও অগ্রিম পরিশোধের ব্যবস্থা করেছিলেন নূর হোসেন। সাত খুনের ঘটনায় ভারতে নূর হোসেন পালিয়ে গেলে বিএনপির কার্যালয়টি আবারো ভবন মালিক দখলে নেয়। যে কারনে ওই কার্যালয়টি এখন বিএনপির নেই।

সাত খুনের পর নূর হোসেনের ছোট ভাই নুরুদ্দিন পলাতক ছিল। নূর হোসেনের সাঁজা হওয়ার পর প্রকাশ্যে আসে নুরউদ্দীন। নুরউদ্দীন বিএনপির রাজনীতি করলেও এ সরকারের আমলেই বড় ভাই নূর হোসেনের কারিশমায় শটগানের লাইসেন্স পায়। যদিও পরবর্তীতে প্রশাসন সেই অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করে দেয়।

ওই সময় নেতাকর্মীরা বলেছিলেন, নূর হোসেনের অন্যতম প্রতিপক্ষ বিএনপি দলীয় সাবেক এমপি গিয়াসউদ্দিনকে কোনটাসা করতেই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপি নেতাদের টাকা দিয়ে চাঙ্গা রাখতো নূর হোসেন। গিয়াসউদ্দিন যাতে বিএনপির আলোচনায় আসতে না পারে সেজন্য জেলা বিএনপির একজন শীর্ষ নেতার সঙ্গে তরুণ দলের এক নেতা মাধ্যমে পরোক্ষ সখ্যতা গড়ে তুলে নূর হোসেন। আর সে সূত্র ধরেই নূর হোসেনের ভাই মিয়া নূরউদ্দিনকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক করা হয়। ওই সময় জেলা বিএনপির সেক্রেটারি ছিলেন বর্তমান সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান মনির এবং ওই কমিটিতেও জেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি ছিলেন শিল্পপতি মুহাম্মদ শাহআলম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সহ সভাপতি শাহ আলমের সঙ্গে নূরউদ্দিনের ছিল ভালো সম্পর্ক। নূরউদ্দিন সিদ্ধিরগঞ্জের রাজনীতি করলেও ফতুল্লাতে ছিল তার দাপট। কুতুবপুরের বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম পান্না মোল্লার বন্ধু নূরউদ্দিনের নিয়মিত যাতায়াত ছিল শাহআলমের ফতুল্লার বাসাতে। এর রেশ ধরেই নূর হোসেনের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে শাহআলম। যার ফলশ্রুতিতে নূর হোসেনের গানম্যান আনোয়ার হোসেন আশিককে করা হয়েছিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানা শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক ও মহানগর শ্রমিকদলের সাধারণ সম্পাদক। ওই সময় নূর হোসেনের গানম্যান আনোয়ার হোসেন আশিক সিদ্ধিরগঞ্জে শাহআলমের ব্যানার পোস্টার ফ্যাস্টুন লাগাতেন।

২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার সহ ৭ জনের লাশ উদ্ধারের পর পুলিশের অভিযানে নূর হোসেনের ওই বিলাসবহুল বাড়ি থেকে রক্তমাখা হাইএস গাড়ি উদ্ধার সহ ১৬ জনকে আটক করা হয়েছিল। ওই মামলায় আনোয়ার হোসেন আশিককেও আসামি করা হয়েছিল। তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পেলে বিএনপি ছেড়ে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন।

আরও জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা তরুণ দলের সভাপতি টিএইচ তোফার মাধ্যমে নূর হোসেনের সঙ্গে লিয়াজো করাতো বিএনপির শীর্ষ নেতারা। তোফা প্রতি মাসে নূর হোসেনের কাছ থেকে ২ লাখ টাকা নিয়ে আসতেন আর সেই টাকা যেত নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির বেশকজন শীর্ষ নেতার পকেটে। তোফাও ছিল ট্রাক স্ট্যান্ড থেকে চাঁদা আদায়কারী।

এছাড়াও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির বেশকজন নেতাও নূর হোসেনের কাছ থেকে আর্থিক সহযোগীতা নিতো। মুলত নারায়ণগঞ্জ ৪ আসনে যাতে গিয়াসউদ্দীন প্রভাব বিস্তার  করতে না পারে সে লক্ষ্যেই শাহআলম ও নূর হোসেনের মধ্যে লিয়োজা করা হয়। তবে শাহআলমের কাছ থেকে নূর হোসেন টাকা না দিলেও প্রতি ঈদে শাহআলম নূর হোসেনকে বিশেষ পাঞ্জাবি উপহার দিতো। যে পাঞ্জাবি শুধুমাত্র একটি গার্মেন্টস থেকে নূর হোসেনের জন্য একটি পাঞ্জাবিই বানানো হতো।

একসময়ের বিএনপির ঘাঁটি হিসাবে পরিচিত ফতুল্লা থানা বিএনপির ধ্বংসের কারিগর হচ্ছেন শাহ আলম। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে আসিন হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে বিএনপি ধ্বংসের দিকে ধাবিত হতে শুরু করে। একপর্যায়ে বিএনপির মধ্যে দু’ভাগে বিভক্ত করে দলের নেতাকর্মীদের মাঝে বিভাজন সৃষ্টি করে। আর কেন্দ্রীয় বিএনপির নেতাদের ম্যানেজ করে নির্বাচিত ফতুল্লা থানা বিএনপির কমিটিকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে শাহআলম নিজের কব্জায় নিয়ে যায়। নির্বাচিত কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মনিরুল ইসলামকে বাদ দিয়ে স্বঘোষিত ভাবে সভাপতি হয় এই শাহআলম। আর নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক মনিরুল আলম সেন্টুকে বাদ দিয়ে তার পছন্দকৃত ব্যক্তি আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাসকে সাধারন সম্পাদক করে নিজের মনগড়া কমিটি গঠন করে। এতে করে ফতুল্লা থানা বিএনপি অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। আর শাহ আলম স্বঘোষিত সভাপতি হওয়ার পর দলের নেতাকর্মীদের তার কারখানার শ্রমিক হিসাবে ভাবতে শুরু করে। এখনো সেই শাহআলম জেলা বিএনপির একজন কান্ডারী হিসাবে পদে আসিন হন। যাকে আওয়ামী সরকার বিরোধী আন্দোলনে কখনো মাঠে দেখা যায়নি। বরং যারা আন্দোলন করতে ইচ্ছে পোষন করে তাদেরকে ধমক দিয়ে দুরে সরিয়ে রাখে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও