শামীম ওসমানে হেরে গেলেন আইভী!

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৬ পিএম, ১ ডিসেম্বর ২০১৮ শনিবার



শামীম ওসমানে হেরে গেলেন আইভী!

নারায়ণগঞ্জ জেলার দুটি ঐহিত্যবাহী ওসমান ও চুনকা পরিবারের দ্বন্দ্বে ফলে এ জেলার আওয়ামীলীগের রাজনীতি দীর্ঘদিন ধরে দুভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি মেরুতে পরিণত হয়েছে। এই দুটি পরিবারের কর্ণধার এমপি শামীম ওসমান ও মেয়র আইভীর মধ্যে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীতা অনেক আগে থেকেই বিরাজ করছে। যেকারণে এই দুই মেরুর একজন আরেক জনকে ছাড় দিতে নারাজ। এবার আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ইস্যুতে এই দুই মেরুর মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয়। তবে এবার জেলার ৫ টি আসনের মধ্যে ৪টি মেরুতে ওসমান মেরুর অনুগামীরা থাকার ফলে আইভী মেরু মূলত হেরে গেছে। এ যাত্রায় ওসমান মেরু মনোনয়ন লড়াইয়ে জয়ী হয়েছে।

এতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘আইভী শামীম যুদ্ধ কখনো প্রকাশ্য আকার ধারণ করে আবার কখনো অন্তদ্বন্দ্বের রুপ নেয়। তবে এবার মনোনয়ন ইস্যুতে জেলার ৪টি আসনের ওসমান মেরুর অনুগামীরা প্রার্থী হয়ে সেই জয় ছিটিয়ে নিয়েছে। এতে অনেকটা দৃশ্যমান হার জিতের সমীকরণ তৈরি হয়েছে। যেকারণে ওসমান মেরু উজ্জীবিত হয়ে উঠলেও আইভী মেরুতে বিষাদের ছায়া দেখা যাচ্ছে।’

ইতোমধ্যে আওয়ামীলীগের দলীয় কার্যালয় থেকে মনোনয়নের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ হয়। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের তিনটি আসনে আওয়ামীলীগের প্রার্থী ঘোষাণা করা হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে গোলাম দস্তগীর গাজী, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে নজরুল ইসলাম বাবু ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে শামীম ওসমান। এছাড়া বাকি দুটো আসনে দলটির শরীক দল জাতীয় পার্টির সাথে আসন ভাগাভাগিতে যেতে পারে দলটি।

পরের দিন ২৬ নভেম্বর জাতীয় পার্টি দলটির আওয়ামীলীগের শরীক দল হিসেবে দলটির প্রার্থী ঘোষণা করে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের দুটি আসনে প্রার্থী দেয় দলটি। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে মনোনয়ন পেয়েছে বর্তমান সাংসদ সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনে পেয়েছেন ওই আসনের বর্তমান সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকা।

এই তিনটি আসনের আওয়ামীলীগের প্রার্থীদের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে প্রার্থী বর্তমান সাংসদ গোলাম দস্তগীর গাজী প্রথম থেকেই আইভী বলয়ের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছে। এই সাংসদকে প্রায় সময় মেয়র আইভীর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলোতেও দেখা গেছে। আর মেয়র আইভীও গাজীর সভা-সমাবেশে উপস্থিত হয়ে তার পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছেন। যেকারণে এই নেতাকে সবাই আইভী বলয়ের নেতা হিসেবে চিনে।

অন্যদিক নারায়ণগঞ্জ-২ আসনে প্রাথী হয়েছে ওই আসনের বর্তমান সাংসদ নজরুল ইসলাম বাবু। এই নেতাকে প্রায় সময় সাংসদ শামীম ওসমানের পাশে দেখা গেছে। আর শামীম ওসমানও বাবুর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগদান করেছেন। যেকারণে এই নেতার সাথে ওসমান বলয়ের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে তা অনেকটা স্পষ্ট হয়েছে। এ আসনের ইকবাল পারভেজকে কখনো কখনো দেখা যায় আইভীর সঙ্গে।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে প্রার্থী হয়েছেন ওই আসনের বর্তমান সাংসদ এ কে এম শামীম ওসমান। এই নেতা নিজেই ওসমান মেরুর কর্ণধার। যেকারণে এই আসনটিতে শামীম ওসমানের প্রার্থী হওয়ার মধ্য দিয়ে ওসমান বলয়ের পাল্লা ভারী হয়েছে। এর মধ্যে মোট তিনটি আসনের মদ্যে দুটি আসনেই ওসমান মেরুর প্রার্থী রয়েছে। আর বাকি একটি আসনে আইভী মেরুর প্রার্থী রয়েছে।

এদিকে আওয়ামীলীগের তিনটি আসন ছাড়া বাকি আসনগুলোতে দলটির শরীক দল জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়া হয়। তবে সেসব আসনেও ওসমান বলয়ের নেতা ও অনুগামীরা প্রার্থী হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের বর্তমান সাংসদ সেলিম ওসমান ওসমান পরিবারের আরেক সদস্য। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ লিয়াকত হোসেন খোকা ওসমান বলয়ের অনুগামী হিসেবে সবার কাছে বেশ পরিচিত। এই নেতার সরাসরি ওসমান বলয়ের সাথে যোগাযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে এই দুটো আসনেও ওসমান বলয়ের অনুগামীরা প্রার্থী হয়েছে। সর্বমোট ৫টি আসনের মধ্যে মহাজোট থেকে ৪ টি আসনে রয়েছে ওসমান বলয়ের নেতারা। বাকি মাত্র ১ আসনে আইভী বলয়ের নেতা প্রার্থী হয়েছেন।

এর মধ্যে জেলার ৫টি আসনেই আইভী মেরুর অনুগামীরা মনোনয়ন প্রত্যাশী তালিকায় থাকলেও এর মধ্যে জেলা আওয়ামীলীগে সাংগঠনিক সম্পাদক আবু সুফিয়ান সরাসরি আইভী বলয়ের সাথে যুক্ত ছিল। তিনি এই আসনে সাংসদ সেলিম ওসমানের বিপরীতে ছিটকে পড়েন। এছাড়া জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি আব্দুল কাদির ছিটকে পড়েন।

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে ওসমান পরিবারের কর্ণধার শামীম ওসমান নৌকা প্রতীকের মনোনয়ন পান। এই আসনে আইভী বলয়ের শ্রমিক নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে ছিটকে পড়েন। এভাবে জেলার বাকি আসনগুলোতেও দৃশ্যমান ও অদৃশ্যমান দুভাবেই আইভী বলয়ের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিল।

জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে নারায়ণগঞ্জ জেলার আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে ওসমান পরিবার ও চুনকা পরিবারের মধ্য দ্বন্দ্ব কোন্দলের ফলে এ জেলার রাজনীতি দুভাবে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। ওসমান পরিবারের কর্ণধার শামীম ওসমান ও চুনকা পরিবারের কর্ণধার মেয়র আইভীর মধ্যে প্রায় সময় দ্বন্দ্ব কোন্দল দেখা দেয়। এই দুই মেরু একপক্ষ অন্য পক্ষকে ছাড় দিতে নারাজ। এর মধ্যে বিগত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচন সহ আরো কয়েকটি নির্বাচনে এক মেরু অন্য মেরুর মনোনয়ন ঠেকাতে নানা প্রচেষ্টার চিত্র দেখা গেছে। আর তাতে করে দুই মেরুর দ্বন্দ্ব বারবার প্রকাশ্যে উঠে এসেছে।

জেলার ৫ টি আসনে মধ্যে প্রত্যেকটি আসনেই দুই মেরুর প্রার্থী রয়েছে। তবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে থেকেই ওসমান মেরুর প্রার্থীদের জোরশোর বেশি দেখা গেছে। এছাড়া কেন্দ্রের গ্রীন সিগন্যালও পেয়েছে এই বলয়ের। এতে করে আইভী বলয় প্রথম থেকেই অনেকটা বেকায়দায় ছিল। তবে শেষতক কোন চমক দেখা যাবে এমনটাই ধারণা ছিল আইভী বলয়ের। কিন্তু উল্টো ওসমান মেরু আইভী মেরুকে চমক দেখিয়ে ৪টি আসনে তাদের বলয়ের নেতারা মনোনয়ন ছিনিয়ে নেয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘নারায়ণগঞ্জ জেলার রাজনীতিক প্রেক্ষাপটে আওয়ামীলীগে এই দুই মেরুর মধ্যে হার জিতের খেলা দীর্ঘদিনের। বিভিন্ন সময় দুই মেরুর হার জিতের খেলায় প্রকাশ্য ও অন্তর্দ্বন্দ্ব দেখা গেছে। তবে এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন লড়াইয়ে শামীম ওসমান বলয়ের কাছে আইভী বলয় মূলত হেরে গেছে। যেকারণে ওসমান বলয় বেশ উজ্জীবিত হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে আইভী বলয় এক্ষেত্রে অনেকটা নিরব অবস্থানে রয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও