২২ মামলা ও ১ জিডি : প্রতারণায় দুর্ধর্ষ পলাশের মনোনয়ন বাতিল

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:১৬ পিএম, ২ ডিসেম্বর ২০১৮ রবিবার



২২ মামলা ও ১ জিডি : প্রতারণায় দুর্ধর্ষ পলাশের মনোনয়ন বাতিল

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দুর্ধর্ষ ও বিতর্কিত শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করলেও সেটা বাতিল হয়ে গেছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ পার্সেন্ট ভোটার তালিকা সংযুক্ত না করা ও মামলার বিবরণ না দেওয়ায় ওই মনোনয়ন পত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়। পলাশের বিরুদ্ধে ২২ টি মামলা ও ১টি জিডি থাকলেও সেগুলো হলফনামায় উল্লেখ করতে পারেনি।

২ ডিসেম্বর রোববার মনোনয়ন পত্র বাছাইয়ের সময়ে পলাশ রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয়ে হাজির হয়ে প্রত্যাহারের আবেদন করেন। তবে জেলা প্রশাসক তখন জানান প্রত্যাহার হবে ৮ ডিসেম্বর। সে কারণে সেটা গৃহীত হয়নি। পরে বিকেলে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বাছাইয়ের সময়ে মনোনয়ন পত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়।

এর আগে আওয়ামীলীগের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনাকে ড্যামকেয়ার করে মনোনয়নপত্র দাখিল করেন পলাশ। আওয়ামীলীগ দলটির নির্দেশনা ও কঠোর হুঁশিয়ারিকে ড্যামকেয়ার করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলেন।

লিখিত আবেদনে পলাশ বলেন, আমি কাউসার আহমেদ পলাশ, পিতা-মৃত ইদ্রিস আলী, মাতা, হাজেরা ইদ্রিস, গ্রাম আলীগঞ্জ, পো: কুতুবপুর, থানা- ফতুল্লা, জেলা, নারায়ণগঞ্জ। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সাংসদীয় আসন ২০৭ (নারায়ণগঞ্জ-৪) আসনে গত ২৮ নভেম্বর তারিখে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছিলাম। বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সভাপতি দেশরত্ন শেখ হাসিনার প্রতি পূর্ণ আস্থা রেখে এবং দলীয় সিদ্ধান্তের প্রতি অনুগত হয়ে আমার মনোনয়ন পত্রটি প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গ্রহন করিয়াছি।

অতএব বিষয়টি যথাযথ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।

জানা গেছে, আওয়ামীলীগ দলটির মধ্যে মনোনয়ন ইসুকে কেন্দ্র করে কোন্দল নিরসনের লক্ষ্যে নীতিনির্ধারকরা দলের নির্দেশনার বাইরে যাওয়ার ব্যাপারে কঠোর নির্দেশনা সহ হুঁশিয়ারি করে দেন। এতে করে দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই বলে দলটির শীর্ষ পদীয় নেতারা জানান।

ইতোমধ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মনোনয়ন ইস্যুতে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের উদ্দেশ্যে বলেছেন, ‘জনপ্রিয় ও যোগ্য নেতাদের মনোনয়ন দেয়া হবে। তবে দল যাকেই মনোনয়ন দিবে সবাইকে তার পক্ষে কাজ করতে হবে। দলের মধ্যে ঐক্য বর্জায় রাখতে হবে। আর দলের সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই।’

নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে আওয়ামীলীগ দল থেকে বর্তমান সাংসদ শামীম ওসমানকে মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। তবে সেই মনোনয়ন দৌড়ে ছিটকে পড়া বাকি তিনজনের মধ্যে বিতর্কিত ও দুর্ধর্ষ শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন।

জানা গেছে, এই আসনে আওয়ামীলীগের মোট ৪ জন মনোনয়ন প্রত্যাশীদের মধ্যে থেকে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাংসদ শামীম ওসমানকে দল থেকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এর ফলে এই আসন থেকে আওয়ামীলীগ দলীয় অন্য কোন নেতা মনোনয়ন পত্র জমা দেন যা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে এই  শ্রমিক নেতা পলাশের বিতর্কিত কর্মকান্ড নিয়ে এই দলটির একদিকে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। অন্যদিকে এই নেতা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে মনোনয়নপত্র দাখিলের কারণে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বেশ স্পষ্ট হচ্ছে। কারণ আওয়ামীলীগ দলটির নীতিনির্ধারকরা ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছেন, দলের সিদ্ধাতের বাইরে গিয়ে কোন নেতা যদি নির্বাচন করে তবে তাতে দল থেকে বহিষ্কার করা হবে। আর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এই বিতর্কিত নেতা পলাশ সেই কাজটিই করছে।

সদর উপজেলার ফতুল্লায় কুতুবপুর ইউনিয়নে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) থেকে জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে বছরে ৫৭ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশার মালিক ও শ্রমিকরা। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে কিংবা চাঁদা দিতে দেরী হলে শ্রমিকদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

জানা গেছে, গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন।

ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।

পরে ১১ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মীদের কিছুটা হুশিয়ার করেছিলেন। শ্রমিকদের উপস্থিতিতে ওই সমাবেশে তিনি বলেছেন, ‘আগামীতে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে কোন সংবাদ প্রকাশ হলে আরো মামলা দেওয়া হবে। কোন ছাড় দেওয়া হবে না। আমি ছাড় দেওয়ার মানুষ না।’

গত ৫  মে ‘এক পলাশেই সর্বনাশ’ শিরোনামে ও  নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকলীগের নাম তান্ডব, চাঁদার জন্য ৩৬ শিল্প-কারখানা বন্ধ, এলাকা ছাড়ছেন ব্যবসায়ীরা’ বিশেষণে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয় যা নিয়ে রীতিমত তোলপাড় হয়। ওই সংবাদটিতে বলা হয়েছে, অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছেন ফতুল্লার শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ। সরকার, প্রশাসন, দল- কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করেন না তিনি। দেশের বৃহত্তম রপ্তানি খাত নিটশিল্পের প্রধান কেন্দ্র ফতুল্লার বিসিক পল্লীর শত শত গার্মেন্ট মালিক শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে পলাশের চাঁদাবাজির কাছে জিম্মি। শুধু ফতুল্লাতেই পলাশের ৭৪টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে; যার সব কটির শীর্ষপদই তার দখলে। আর ফতুল্লা আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতির পদটি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে নিজের কব্জায় ধরে রেখেছেন। তার এসব শ্রমিক সংগঠনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে কানাডিয়ান নাগরিকের মালিকানাধীন র‌্যাডিকেল গার্মেন্ট, হামিদ ফ্যাশন, পাইওনিয়ার সোয়েটার, আর এস সোয়েটার, মিশওয়ার হোসিয়ারি, এন আর নিটিং, মাইক্রো ফাইবার, মেট্রো নিটের মতো প্রায় ৩৬টি গার্মেন্ট বন্ধ হয়েছিল। অনেক প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে গেছে। যারা টিকে আছে তার অনেককেই কৃত্রিম শ্রমিক অসন্তোষের ভয়ে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের চাঁদা। দিনের পর দিন অপকর্ম করে গেলেও তার বিরুদ্ধে কথা বলার কেউ নেই। জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক পলাশ যেন এখন সন্ত্রাসের মহিরুহে পরিণত হয়েছেন। এক পলাশেই ঘটছে নারায়ণগঞ্জের সর্বনাশ। সরেজমিন জানা গেছে, ফতুল্লার কয়েক হাজার অবৈধ অটোরিকশার চাঁদাবাজিও পলাশের নিয়ন্ত্রণে। এতে ফতুল্লার তিনটি ইউনিয়ন থেকে উঠে গেছে প্যাডেলচালিত রিকশা। ফতুল্লার কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বহমান বুড়িগঙ্গা নদী দখল করে অবৈধ বালু আর পাথরের ব্যবসার একচ্ছত্র আধিপত্যও পলাশের কব্জায়। ইতোমধ্যেই বুড়িগঙ্গা নদী দখলমুক্ত রাখতে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওয়াকওয়ে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছেন। পাগলা থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত কয়েক কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নির্মিত ওই ওয়াকওয়ে ভেঙে ফেলায় তার বিরুদ্ধে ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্মপরিচালক (বন্দর) এ কে এম আরিফ উদ্দিন বাদী হয়ে ফতুল্লা থানায় জিডি করেন। তবে এ জিডি পলাশের দখলদারিত্বে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। ভুক্তভোগীরা বলছেন, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতা তার (পলাশ) বাড়িতে আসার পর থেকে যেন বাদশাহ হয়ে উঠেছেন তিনি।

এতে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আওয়ামীলীগ দলীয় প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামীলীগ দলটির নির্দেশনাকে ড্যামকেয়ার করে বিতর্কিত শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ একের পর এক বিতর্কিত কাজ করে যাচ্ছে। অপ্রতিরোধ্য এই নেতার বিতর্কিত কর্মকান্ড এবার জেলার গন্ডি পেরিয়ে কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। তবে এসব ঘটনায় দলটির শীর্ষ পর্যায় থেকে দলের নির্দেশনার অবাধ্য হওয়ায় শাস্তিও পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে অপ্রতিরোধ্য ও দুর্ধর্ষ এই নেতার লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছেনা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও