লাঙ্গলের ‘সাইলেন্ট কিলিংয়ে’ জয়ী ধানের শীষ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০০ পিএম, ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ বুধবার



লাঙ্গলের ‘সাইলেন্ট কিলিংয়ে’ জয়ী ধানের শীষ

নারায়ণগঞ্জ জেলার ৫টি আসনের মধ্যে দুটি আসনে আওয়ামীলীগ দলটির শরীক দল জাতীয় পার্টিকে অনেক আগেই ছাড় দিয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফের জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়া হয়। তবে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা এই বিষয়টি একেবারেই মানতে নারাজ। যেকারণে এখানকার আওয়ামীলীগের অনেক নেতারা লাঙ্গলের পক্ষে কাজ করতে অনীহা প্রকাশ করছেন। আবার কেউ কেউ প্রবল বিরোধীতা করছে। তবে দলের নীতিনির্ধারকদের রোষানলে পড়ে এই দুটি আসনে লাঙ্গলের কথা বললে তারা মূলত লাঙ্গলের সাইলেন্ট কিলিং মিশনে কাজ করবে। তার ইঙ্গিত ইতোমধ্যে মিলতে শুরু করেছে। এর ফলে এ দুটি আসনে ধানের শীষের বিজয় অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে।

নির্বাচনী বছরের শুরুতে আওয়ামীলীগের নৌকার মাঝিরা বেশ সরব হয়ে নৌকা প্রতীকের দাবিতে বর তোলে। যেকারণে দেশের অন্য কোন জেলাতে লাঙলকে ছাড় দিলেও এ জেলাতে লাঙল না দেয়ার জোরালো দাবি করে আসছেন নৌকার মাঝিরা। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে জেলার দুটি আসনে নৌকা প্রতীকে ভোট দিতে পারছেনা বলে বেশ আক্ষেপ করে বলে আসছেন, আওয়ামী লীগে সাংসদ না থাকায় এখানে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা নির্যাতিত, বঞ্চিত, লাঞ্ছিত, নিষ্পেষিত হচ্ছে। এরপর ধীরে ধীরে তাদের দাবি আরো জোরালো হতে থাকে। তবে তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি দলদুটো জোটবদ্ধ ভাবে নির্বাচন করার বিষয়টি অনেকটা নিশ্চিত হতে থাকে। শেষ সময়ে এসে বিগত নির্বাচনগুলোর মত এই দলদুটো জোটবদ্ধভাবে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিলে আসন ভাগাভাগিতে নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৫ আসন জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়া হয়।

ইতোমধ্যে মনোনয়ন বাছাই প্রক্রিয়ায় চূড়ান্ত পর্যায়ে মনোনয়ন পাওয়া আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির প্রার্থীরা মনোনয়নের বৈধতা পায়। আর জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার ফলে প্রত্যেকটি আসনে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা এক হয়ে কাজ করবে। তবে এর মধ্যে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী সবকটি আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী না পেয়ে তারা লাঙ্গল বিদ্ধেষী হয়ে উঠছে। এমনকি অনেকে প্রকাশ্যে জাতীয় পার্টিকে নিয়ে তীব্র সমালোচনাা করছেন। আর জাতীয় পার্টিকে আওয়ামীলীগের কোন নেতা সমর্থন করলে তারও সমালোচনা করছেন।

৩ ডিসেম্বর জেলা আওয়ামীলীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের মহাজোটের জাতীয় পার্টির প্রার্থী বর্তমান এমপি সেলিম ওসমান ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের মহাজোটের জাতীয় পার্টির প্রার্থী এবং বর্তমান এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা নিয়ে কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতা।

ওই সময় উচ্চ স্বরে অনেক নেতা মাইকে কথা হলে সঞ্চালক সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোঃ বাদল দাড়িয়ে থামিয়ে দেন।

কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় মুক্ত আলোচনা উপস্থিত একজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনের আওয়ামীলীগের প্রার্থী নিয়ে যে কোন সময়ে প্রচারণায় নামতে প্রস্তুত। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৩ ও ৫ আসনের এখনো আওয়ামীলীগের প্রার্থী দেয়া হয়নি বা কারো পক্ষে কাজ করতে সেন্ট্রাল থেকে নিদের্শনা দেয়া হয়নি। ফলে কার পক্ষে নির্বাচনের নামতে সে জন্য সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর দাবি করেন তারা। নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের এমপি সেলিম ওসমান মহাজোটের প্রার্থী হওয়া ও নির্বাচিত পরে কোন সময় জেলা আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করে নাই। এর পাশাপাশি বর্তমানেও তার মহাজোটের জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন পাওয়া পরও কোন যোগাযোগ করেনি। এমনকি তাদের মনোনয়ন দেয়া ও নেয়াকালে জেলা আওয়ামীলীগের অনেকে ছিলেন না। ফলে তাদের নিয়ে আগামী দিনে কোন দিক যাবে জেলা আওয়ামীলীগ তার দিক নিদের্শনা দাবি করেন।

বক্তারা আরো বলেন, ৩ ও ৫ আসনের নৌকা প্রার্থী দাবিতে জেলার অনেকে মনোয়ন প্রত্যাশী ছিলেন কিন্তু তাদের না দিয়ে মহাজোট থেকে প্রার্থী দেয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টির মিলিত মহাজোট থেকে প্রার্থী ঘোষণা করেনি। এর প্রেক্ষিতে সোনারগাঁ, সদর ও বন্দরে আওয়ামীলীগের তৃণমূল কার পক্ষে প্রচারণা করবে, তা সুনিদিষ্ট দাবি করেন অনেকে।

এ সময় সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবু হাসনাত শহীদ মোঃ বাদল বলেন, আওয়ামীলীগের জন্ম নারায়ণগঞ্জে। তাই একাদশ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জের ৫টি আসনে আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থীদের জয়ী করার দায়িত্ব আমাদের। কে কাকে ডেকেছে, কে ডাকি নেই সে দিকে নজর দেয়া সময় এখন নয়। অনেকের অভিমান ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দলের স্বার্থে কাজ করুন। মহাজোট থেকে এখনো যে হেতুক প্রার্থী ঘোষণা করেনি ফলে আগামী ৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত অপেক্ষা করুণ, তার পর সিদ্ধান্ত দেয়া হবে নারায়ণগঞ্জ ৫টি আসনের প্রার্থী কারা।

নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের এমপি লিয়াকত হোসেন খোকাকে নিয়ে সোনারগাঁও থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট সামসুল ইসলাম ভূইয়া ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান কালামের বক্তব্যে বিদ্বেষ প্রকাশ করেন।

তাঁরা দুইজনই বলেন, মহাজোটের এমপি হওয়ার পর থেকে এখনো তিনি আওয়ামীলীগের সাথে যোগাযোগ করেনি। তার কাছ থেকে আগামীতে আওয়ামীলীগের কি পাবেন তা জানা নেই।

এতে একাধিক সূত্র বলছে, ‘আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টির লাঙল প্রতীকের প্রার্থীদের কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। যেকারণে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের রোষানলে পড়ে তেমন কিছু বলতে না পারলেও মনে মনে এর ঘোর বিরোধীতা করছে। আবার অনেকে ক্ষোভ ঝারতে প্রকাশ্যে নানা সমালোচনা করছেন। আর যারা প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারছেনা তারা ঠিকই সাইলেন্ট কিলিং মিশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এই কিলিং মিশনটি কাউকে হত্যা করার মিশন নয়। এই কিলিং মিশন মূলত জাতীয় পার্টির প্রার্থীতের নির্বাচনে পরাজীত করার মিশন। আর এই পরাজয়ের ফলে জাতীয় পার্টি প্রার্থীর কার্যত অর্থে মৃত্যু হবে। সেই কারণে এটাকে মূলত সাইলেন্ট কিলিং মিশন বলা হচ্ছে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ জেলাতে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি দল দুটোর মধ্যে এক ধরণের নিরব বিরোধীতা রয়েছে। যেকারণে আওয়ামীলীগ ও জাতীয় পার্টি বিভিন্ন ইস্যুতে, বিশেষ করে নির্বাচন ইস্যুতে বিরোধপূর্ণ অবস্থানে দেখা যায়। এর মধ্যে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করায় আওয়ামীলীগের আসনগুলোতে জাতীয় পাটিও ভাগ বসাচ্ছে। যেকারণে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা বার বার অভিযোগের তীর ছুড়ছে। তবে দলের নীতিনির্ধারকরা এই জাতীয় পর্টিকে সমর্থন দেয়ার কথা বললেও অনেক নেতাকর্মীরা জাতীয় পার্টিকে কোনভাবেই ছাড় দিতে নারাজ। তাতে করে আসন্ন নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে লাঙ্গলের প্রার্থীদের ভোটের মাধ্যমে পরাজিত করতে আওয়ামীলীগের এসব নেতাকর্মীরা সাইলেন্ট কিলিং মিশনে যোগদান করবেন। আর সেই ইঙ্গিত ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে ধানের শীষ কমন প্রতীকের বিএনপি দলটি সহজ জয়ের সমীকরণ তৈরি করবে। কারণ জাতীয় পার্টি ও আওয়ামীলীগে এই রেশারেশিতে ধানের শীষ বেশ সহজে গৌন্তব্যে পৌছে যাবে। আর জাতীয় পার্টির প্রার্থীতের অনেকটা কঠিন সমীকরণের সম্মুখিন হতে যাচ্ছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

এই বিভাগের আরও