নারায়ণগঞ্জে বিদায় বিএনপি

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৭ পিএম, ৯ ডিসেম্বর ২০১৮ রবিবার

নারায়ণগঞ্জে বিদায় বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপি দলটির হেভিওয়েট মনোনয়ন প্রত্যাশীরা একে একে মনোনয়ন দৌড়ে বাদ পড়েছেন। অথচ মনোনয়ন দৌড়ে ছিটকে পড়া এসব নেতারা রয়েছেন ত্যাগী ও সক্রিয় নেতাদের তালিকায়। তাদেরকে মনোনয়ন দৌড়ে ছিটকে পড়ার কারণে দলের এসব নেতা ও কর্মীরা দলকে বিদায় জানাচ্ছে। আবার অনেক নেতা সহ বাদ পড়ে যাওয়া এসব নেতারা দলকে বিদায় জানাচ্ছে। ইতোমধ্যে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যকার এরুপ নানা ক্ষোভ দেখা যাচ্ছে। এতে করে আসন্ন নির্বাচন ইস্যুতে নারায়ণগঞ্জ বিএনপি দলটি কার্যত অর্থে বিদায় দেয়া হচ্ছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়ন ইস্যুতে বিএনপি দলটি প্রত্যেকটি আসনে একাদিক মনোনয়ন প্রত্যাশীকে চিঠি দিয়েছে। এতে করে চূড়ান্ত মনোনয়ন প্রক্রিয়ার নাটকীয়তা অবশিষ্ট থেকে যায়। আর সেই চূড়ান্ত নাটকীয়তা যে এতটাই রোমাঞ্চকর হবে তা হয়তো কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। কারণে দলটির ত্যাগী ও হেভিওয়েট পদধারী নেতাদের বাদ দিয়ে সুবিধাবাদীদের প্রার্থী করা হয়েছে। আবার রাজনীতিতে যাকে কেউ কখনো চিনেনি এমন নব্য রাজনীতিবিদদেরও প্রার্থী করা হয়েছে। এতে করে সবাই রীতিমক চমকে উঠেছে।

এ জেলার ৫টি আসনে  বিএনপি দলটির ১২ জন এবং তাদের শরীক দল নাগরিক ঐক্যের একজন সহ মোট ১৩ জনকে দলটির কেন্দ্র থেকে মনোনয়নের চিঠি দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিএনপি দলটির আরো কযেকটি শরীক দলে মনোনয়ন প্রত্যাশী রয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-৫ (শহর ও বন্দর) আসনে বিএনপি দলটির শরীক দল নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরাম চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে প্রার্থী হয়েছে। এছাড়াও এই আসনে প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি আরো পেয়েছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি আবুল কালাম ও মহানগর যুবদলের সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ১৩নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ। এছাড়াও এই আসনে মহানগর বিএনপি সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানকে প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকাতেও তাকে রাখা হয়নি। অথচ তিনি ২০১৬ সালের নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তিনি ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করেছেন। এই আসনে বিএনপি দলটির ৩ জন পদধারীদের বাদ দিয়ে বিএনপি দলটির শরীক দল নাগরিক ঐক্যের উপদেষ্টা এস এম আকরামের হাতে ধানের শীষ তুলে দেয়া হয় যিনি এক সময়ে আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠিত নেতা ও সাংসদ ছিলেন। এতে করে এই আসনের বিএনপি দলটির দুজন পদধারীকে মাইনাস করে শরীক দলের এক নেতাকে প্রার্থী করা হয়েছে। আর সে কারণে রাজনীতিতে কিছুটা মাইনাস পয়েন্টে আছেন কালাম।

নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনে অনেক নাটকীয়তার পর বিএনপির ২০ দলীয় জোটের শরীক দল জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের জেলার সভাপতি মুফতি মনির হোসাইনকে প্রার্থী করা হয়েছে। যদিও এই আসনে বিএনপি দলটি থেকে প্রাথমিক মনোনয়ন তালিকায় এই নেতার নাম ছিলনা। প্রথামিক মনোনয়নের চিঠি পেয়েছিল জেলা বিএনপির সহ  সভাপতি ও ফতুল্লা থানা বিএনপির সভাপতি মো. শাহআলম ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ। অন্যদিকে বিএনপি দলটির প্রাথমিক তালিকায় নাম না থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপি দলীয় সাবেক সাংসদ গিয়াসউদ্দিনও মাঠে ছিলেন। কিন্তেু শেষ পর্যায়ে চূড়ান্ত মনোনয়নে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপি দলটির পদধারী ও হেভিওয়েটদের বাদ দিয়ে জমিয়তের নেতা মুফতি মনিরকে প্রার্থী করা হয়।

অথচ এই আসনের জমিয়ত নেতা মুফতি মনিরকে রাজনীতিক অঙ্গনের কেউ চিনেনা। এমনকি রাজনীতিকে সক্রিয়তার কোন বালাই নেই এই নেতার। এই আসনে বিএনপি দলীয় হেভিওয়েট নেতা গিয়াসউদ্দিন ও শাহআলমকে বাদ দিয়ে অচেনা কোন এক প্রার্থীকে নামে মাত্র মনোনয়ন দেয়া হয়েছে। এতে করে দলের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কারণ দীর্ঘ প্রায় ১০ বছরেরও বেশি সময় দলটির ক্ষমতার বাইরে থাকার ফলে হামলা, মামলা সহ সকল প্রকার নির্যাতন সহ্য করে বিএনপি দলের নেতাকর্মীরা দলকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। কিন্তু শেষ সময়ে এসে এসব নেতাদের বাদ দিয়ে অচেনা নেতাদের প্রার্থী করা হয়েছে। এতে করে দলের ভেতরে ক্ষোভ দেখা দিচ্ছে। অনেকে এই আসনে নির্বাচন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কারণ এই আসনে বিএনপি ডুবানো এই নেতাকে মনোনয়ন দেয়ার ফলে এখানে ভোটের নির্বাচন কার্যত অর্থে বিফলে যাবে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির সহ সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান। এর আগে প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি  পেয়েছেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা বিএনপির সহ সভাপতি আজহারুল ইসলাম মান্নান ও জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও সোনারগাঁ থানা বিএনপির সভাপতি আবু জাফর। এই আসনে মান্নান মনোনযন পত্র দাখিল করলেও জাফর দাখিল করেনি। অথচ ত্যাগী নেতাদের তালিকায় থাকা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামলাকে আগেই মাইনাস করা হয়েছে। এই নেতা বিগত দিনের পুলিশি হামলা, মামলাকে উপেক্ষা করে দলের জন্য সব সময় আন্দোলন সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু এই নেতাকেই সবার আগে মাইনাস করা হয়েছে। যেকারণে এই নেতা সহ তার অনুগামী ও সমর্থকরা একেবারে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে।

নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনির প্রার্থী হয়েছেন। এর আগে প্রাথমিক মনোনয়নের চিঠি পেয়েছিল বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা তৈমূর আলম খন্দকার, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও জেলা বিএনপির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপু। অথচ এই আসনে ত্যাগী নেতাদের প্রথম সারির তালিকায় থাকা তৈমূর ও দিপু ভূইয়াকে বাদ দেয়া হয়েছে। তাছাড় এ নিয়ে ৪ বার প্রার্থী হওয়ার স্বপ্ন ভঙ্গ হয়েছে তৈমূরের। যেকারণে বিএনপি দলটির ত্যাগী নেতাকর্মীরা মূলত এই নির্বাচনকে বয়কট করছে। আবার অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করছে। এতে করে ভোটের নির্বাচনের বেশ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘এ জেলার বিএনপি দলটির রাজনীতিতে যারা ত্যাগী নেতা হিসেবে দলের রাজনীতিকে ধরে রেখেছে তাদেরকেই বাদ দেয়া হয়েছে। এ জেলার রাজনীতিতে দলের পদধারী ও সক্রিয় নেতা হিসেবে এসব মাইনাস হওয়া নেতাদের দেখে আসছি। কিন্তু তারাই যখন প্রার্থী হতে পারলো না তাহলে আমরা কার জন্য নির্বাচন করবো। আর নির্বাচন করেই বা কি হবে। কারণ দলের এসব ত্যাগী ও হেভিওয়েট নেতাদের বাদ দিয়ে অচেনা ও পদহীনদের প্রার্থী করা হয়েছে। তাদের জন্য কিভাবে নির্বাচন করবো। আর এসব নেতাদের প্রার্থী করা হয়েছে মূলত দলকে ডুবানোর জন্য। এমনিতে বেকায়দায় থাকা বিএনপি দলটি অনেকটা দুর্বল ছিল। তার উপরে দলের প্রার্থীতা নিয়ে এরুপ নাটকীয়তার কারণে দলটির অবস্থা আরো নাজুক হয়ে পড়বে।’

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ জেলায় এরুপ প্রার্থী হওয়ার ফলে নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বিদায় ঘন্টা বাজতে শুরু করেছে। কারণ এতোমধ্যে জেলা ও মহানগর কমিটির পদধারীরা মাইনাস হয়েছে। আর তাতে করে এসব নেতাদের দল থেকে একেবারে মাইনাস হওয়ার সম্ভাবনা প্রকট। আর যদি কোন কারণে দলে থেকেও যায় তাতে করে সক্রিয়তার নিয়েও নানা সংকট দেখা দিবে। যেকারণে মূলত বলা হচ্ছে, নারায়ণগঞ্জে বিএনপির বিদায়।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও