নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সেক্টর দখল পাল্টা দখল

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:২৩ পিএম, ৬ জানুয়ারি ২০১৯ রবিবার

নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন সেক্টর দখল পাল্টা দখল

টানা ১০ বছর ধরে ক্ষমতায় আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট। এবার টানা তৃতীয়বারে পদার্পন শুরু হলো। নতুন উদ্যমে শুরু হয়েছে পথচলা। ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে ক্ষমতাসীন দলের এমপিরা। শক্ত হচ্ছে বিভিন্ন সেক্টর দখলকারীরাও। তবে দেখা দিয়েছে এক নতুন ঝামেলা। বিভিন্ন সেক্টর যাদের দখলে ছিল তাদের উপর এখন ক্রমশ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠতে শুরু করেছে। তারা এখন এসব সেক্টরের পালাবদল চান। আর এসব নিয়েই দেখা দিচ্ছে উত্তেজনা। সম্প্রতি কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে যেখানে ছড়াচ্ছে উত্তাপ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামীলীগ ফের ক্ষমতায় আসার পর ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী সহ বিভিন্ন এলাকার গার্মেন্টসের ঝুট সেক্টর নতুনদের দখলে আসতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে। বিগত সময়ে যারা ঝুট সেক্টর দখল নিয়েছিল এবার তাদের হটিয়ে অনেক আওয়ামীলীগের তৃনমূলের নেতাকর্মীরা হানা দিতে পারে গুঞ্জন আছে। যারা আগে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রনে রেখেছিল প্রয়োজনে এবার তাদেরকে দমন করে সেক্টর দখলে নিয়ে নিবে। এখন থেকে বিগত সময়ে বঞ্চিতরা জোট বাধতে শুরু করছেন। যেকোন উপায়ে বঞ্চিতরা ঝুট সেক্টর দখলে নিবে বলে অনেক আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা এমনটাই জানিয়েছেন।

এদিকে অভিযোগ উঠেছে একাদশ নির্বাচনে ফতুল্লায় আওয়ামীলীগ ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা শামীম ওসমানের পক্ষে নিঃস্বার্থে নির্বাচনী প্রচারনা সহ অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন। তারা এবার শামীম ওসমানের কাছে কিছু সুবিধা পেতে মুখিয়ে আছেন। বিগত সময়ে দলের শীর্ষ কয়েকজন নেতা সুবিধা গ্রহণ করে হাইব্রীডরা ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করতো। কিন্তু এবার তৃনমূলের নেতাকর্মীরা বঞ্চিত হতে চাচ্ছে না। তারা প্রয়োজনে দলের শীর্ষ নেতাদের সাথে প্রতিবাদ করবে। তার পরও হাইব্রীডদের হটিয়ে আওয়ামীলীগের পরীক্ষিত ও তৃনমূলের নেতাকর্মীরা ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রনে নিবে। তা নিয়ে এখন থেকে চলছে দফায় দফায় আলোচনা। এমনকি অনেকে ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে ঝুট সেক্টর দখলে নিতে পিছু হটবে না।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরী, মাসদাইর, টাগারপাড়, কুতুবআইলসহ যেসব এলাকায় গার্মেন্টস ঝুট সেক্টর যারা নিয়ন্ত্রন করে আসছিল তাদেরকে সরিয়ে কিছু নতুনদের সাইড দেয়ার জন্য জোর দাবি করেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। অনেক গার্মেন্টসের ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করে শহরের কিছু প্রভাবশালী নেতা। তাদের মাধ্যমে সেকেন্ড পার্টি হিসাবে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করে ঝুট সন্ত্রাসীরা। যারা বিভিন্ন এলাকার গার্মেন্টের ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করে তারা আওয়ামীলীগের কোন গুরুত্বপূর্ন পদে নাই। তার পরও তারা কাদের ইশরায় কিসের বলে ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করছে তা জানতে চাই আওয়ামীলীগের তৃনমুলের নেতাকর্মীরা। এছাড়াও অনেক এলাকার ঝুট সেক্টর নিয়ন্ত্রন করছেন যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগের পদ ওয়ালা নেতারা। তারা প্রকাশ্যে না আসলেও তাদের নামে ঝুট নামছে বলে অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু এবার যারা বিগত সময়ে সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল তারা এবার মাঠে নামতে চাইছেন। তারা যেকোন উপায়ে ঝুট সেক্টরে হাত দিবে। এ নিয়ে চলছে পরিকল্পনা ও আলোচনা। কে কোন এলাকার এবং কোন গার্মেন্টের ঝুট নিয়ন্ত্রন করবে তা নিয়ে ভাবতে শুরু করছে।

জানা গেছে, ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শামীম ওসমান এমপি হিসাবে নির্বাচিত হওয়ার পর পঞ্চবটি-পাগলা সড়কে চলাচলরত ইজিবাইক স্ট্যান্ডটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় ফতুল্ল¬া থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন। সে তার লোকজন নিয়ে পলাশের লোকদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইজিবাইক স্ট্যান্ডের অফিসটি তাদের দখলে নিয়ে নেয়। আর অফিসে থাকা পলাশের ছবি নামিয়ে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের এমপি শামীম ওসমান ও বঙ্গবন্ধু ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছবি সাটিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু দুইদিন পরই আনোয়ার হোসেনের কাছ থেকে অটো স্ট্যান্ডটি ছিনিয়ে নিতে ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেলের বাহিনী হানা দেয়। এসময় মীর সোহেলের নির্দেশে ফাজিলপুরের শাহিন, হিরো, দুলু, বাবুল, স্বপন সরদার, ফারুক সহ আরো কয়েকজন আনোয়ারের নিয়ন্ত্রণে থাকা ইজিবাইক স্ট্যান্ডের অফিস জোর করে দখলে নিয়ে নেয়। শাহিন গংরা আনোয়ারকে হুঙ্কার দিয়ে বলে ইজিবাইক স্ট্যান্ড মীর সোহেলের লোকদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে। এখনো আনোয়ারকে কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। তবে পঞ্চবটিতে এলাকার ইজিবাইক স্ট্যান্ড দখল নেয়াকে কেন্দ্র করে স্বেচ্ছাসেবকলীগ ও যুবলীগের মধ্যে দেখা দিয়েছে উত্তেজনা। এতে ফের দখলবাজির রাজনীতি শুরু হয়ে গেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন পাগলার শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ। কিন্তু সেখানে ছিল তার বড় ধরনের জালিয়াতি। মামলার তথ্য গোপন আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে শতকরা ১ভাগ ভোটারের সাক্ষর জমা দিতে পারেনি তিনি। বাদ হয়ে যায় মনোনয়নপত্র। এরই মধ্যে ফতুল্লার কয়েকটি শ্রমিক অসন্তোষের ঘটনায় এসে যায় পলাশের নাম। বেকায়দায় পড়ে ওমরার নামে দেশ ছাড়েন পলাশ, ফিরেন ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের ভোট গ্রহণের পর। তিনি মূলত বিভিন্ন সময়ে মামলার এজাহারে লিখেছেন ফতুল্লার সর্বশ্রেষ্ঠ অদ্বিতীয় শ্রমিক নেতা। সে কারণে ফতুল্লার গার্মেন্ট সেক্টরে কোন শ্রমিক নেতার নাম উচ্চারণ হলেই পলাশের নাম চলে আসে। সেই পলাশের কব্জায় ছিল অনেকগুলো সেক্টর যেখানে থেকে মাসে উপার্যন হতে লাখ লাখ টাকা। উঠেছিল চাঁদাবাজীর অভিযোগও।

সেই পলাশের কব্জায় থাকা সা¤্রাজ্য ক্রমশ তার হাত থেকে সরে যাচ্ছে। সেখানে নতুন করে হানা দিতে যাচ্ছে স্থানীয় লোকজন। জড়াচ্ছেন সেখানকার আওয়ামী লীগের নেতারাও।

পাগলা ও আলীগঞ্জ এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পাগলা, আলীগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকাতে বুড়িগঙ্গার তীরে অন্তত ১৫টি ঘাট হতে দৈনিক নৌ যান হতে মালামাল লোড আনলোড হয়। সেখানে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে মজুরি হতে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা কেটে নেওয়া হতো। বিভিন্ন সংগঠনের নামে এসব টাকা কেটে নেওয়া হলেও সংগঠনগুলো ছিল পলাশের নেতৃত্বে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় কুতুবপুর ইউনিয়নে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) থেকে জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে বছরে ৫৭ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশার মালিক ও শ্রমিকরা। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে কিংবা চাঁদা দিতে দেরী হলে শ্রমিকদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

কুতুবপুর ছাড়াও পঞ্চবটি, ফতুল্লা ও আশেপাশের কয়েকটি স্ট্যান্ড থেকেও প্রতিদিন করা হতো চাঁদাবাজী। পাগলার ট্রাক স্ট্যান্ড থেকেও তোলা হতো মোটা অংকের টাকা।

তবে দেরিতে হলেও কিছুটা কৌশলীভাবে পলাশের এসব অপ জগতে হানা দিতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। অচিরেই এসব বিষয় ক্রমশ দৃশ্যমান হবে মনে করা হচ্ছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি একই সঙ্গে প্যানেল মেয়র। আছেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের কমিটিতেও। এ ওয়ার্ডের আগের কাউন্সিলর ছিলেন সিরাজুল ইসলাম মন্ডল। দুই বছর আগে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। এলাকার প্রভাব বিস্তার নিয়ে তাদের মধ্যে আগে থেকেই আছে বিরোধপূর্ণ অবস্থান। কেউ কাউকে দেখতে পারে না। এলাকাতে সর্বদা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি বিরাজ করে। আর তারই অংশ হিসেবে গত ৩ জানুয়ারী তাদের মধ্যে ঘটেছে সংঘর্ষের ঘটনা। মারধর হতে সিরাজ মন্ডল দূরে থাকলেও মাথা ফাটানো হয়েছে মতির।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও