প্রাচ্যের ডান্ডির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা চ্যালেঞ্জ মন্ত্রী গাজীর

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৬ পিএম, ৮ জানুয়ারি ২০১৯ মঙ্গলবার

প্রাচ্যের ডান্ডির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা চ্যালেঞ্জ মন্ত্রী গাজীর

নারায়ণগঞ্জ জেলা একসময় পরিচিত ছিল প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে। তবে ধীরে ধীরে নারায়ণগঞ্জ শিল্প ও বাণিজ্যনগরী হিসেবে পরিচিতি পেলেও হারিয়ে গেছে প্রাচ্যের ডান্ডির সেই ঐতিহ্য। বিশেষ করে আদমজী জুট মিল বন্ধের পরে বন্ধ হয়ে যায় আরো একডজন পাটকল। তবে বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ পরিচিত নীট শিল্পের নগরী হিসেবে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরে নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে আওয়ামীলীগের শাসনামলে মন্ত্রীত্ব পেয়েছেন রূপগঞ্জ থেকে নির্বাচিত গোলাম দস্তগীর গাজী। আর তাকে দেয়া হয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব। তাই প্রাচ্যের ডান্ডির ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনার চ্যালেঞ্জ নতুন মন্ত্রীত্ব পাওয়া গোলাম দস্তগীর গাজীর।

তথ্যমতে, ব্রিটিশ শাসনামলে পূর্ব বাংলার একমাত্র নদীবন্দর হিসেবে নারায়ণগঞ্জে পাট ব্যবসা কেন্দ্র ও পাটকল স্থাপন হয়। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার দুই পাড়ে গড়ে ওঠে বেশ কিছু জুট মিল। পাকিস্তানের অন্যতম ধনাঢ্য আদমজী পরিবারের তিন ভাই এ. ওয়াহেদ আদমজী, জাকারিয়া আদমজী ও গুল মোহাম্মদ আদমজী যৌথভাবে আদমজী জুটমিল প্রতিষ্ঠা করেন। নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার তীরে সিদ্ধিরগঞ্জের সুমিলপাড়ায় আদমজী জুটমিল গড়ে ওঠে ২৯৭ একর জমির ওপর। ১৭০০ হেসিয়ান ও ১০০০ সেকিং লুম দিয়ে এই মিলের উৎপাদন শুরু হয় ১৯৫১ সালের ১২ ডিসেম্বর। ওই সময় এই মিলের উৎপাদন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬০ কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় হতো। তখন মিলে তাঁতকল বসানো হয় ৩ হাজার ৩০০টি। আদমজী জুট মিলে উৎপাদিত চট, কার্পেটসহ বিভিন্ন প্রকার পাটজাত দব্য দেশের চাহিদা পুরন করে রপ্তানী হতো চীন, ভারত, কানাডা, আমেরিকা, থাইল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। এ সময় আদমজী জুটমিল হয় পৃথিবীর অন্যতম জুটমিল এবং এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ কারখানা। আদমজীকে ঘিরে শীতলক্ষ্যার দুইপাড়ে সিদ্ধিরগঞ্জ, কাঁচপুর, বন্দর, রূপগঞ্জ ও সোনারগাঁয়ে গড়ে ওঠে বিশাল জনগোষ্ঠীর আবাস। মিল ছাড়াও এসব এলাকায় কয়েক লাখ লোকের কর্মসংস্থান হয়। এর পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন স্থানেই ছিল পাটের প্রেস হাউস। যেকারণে নারায়ণগঞ্জ খ্যাতি লাভ করে প্রাচ্যের ডান্ডি হিসেবে। আদমজী জুটমিল বন্ধ করা হয় ২০০২ সালের ৩০ জুন। তবে এর অনেক আগেই ১৯৯৪ সালের দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের মনোয়ারা জুট মিলটি বন্ধ করে দেয়া হয়। ১৫ বছর আগের রিটের কারণে বেসরকারিকরণের তালিকা থেকে বাদ দেয়া হয়েছে মনোয়ারা জুট মিলকে। সরকারের বন্ধ কলকারখানা চালুকরণ নীতিমালার আওতায় বন্ধ আদমজী জুটমিলের ২নং ইউনিটের স্থানে ৫০ তাত বিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক ডাইভারসিফাইড প্রোডাক্ট তৈরির মিল স্থাপন এবং মনোয়ারা জুট মিলকে টিস্যু পেপার মিলে রুপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে গত এক যুগে বন্ধ হয়ে গেছে অন্তত আরো ১০টি জুট মিল। বন্ধ হয়ে পড়া জুট মিলগুলোর মধ্যে রয়েছে সিদ্ধিরগঞ্জে অবস্থিত তাজ জুট প্যাকিং কোম্পানী, প্রাইম জুটেক্স, শীতলক্ষ্যার পূর্বতীরে সোনাকান্দার সারোয়ার জুট মিল, নবীগঞ্জে জামাল জুট মিল, উত্তর নদ্যার আমিন ব্রাদার্স জুট এন্ড কোঃ, কাঁচপুর এলাকায় আনোয়ার জুট মিল, এলাইড জুট মিল, রূপগঞ্জে তারাব এলাকায় নিশান জুট মিল, গাউছিয়া জুট মিল, মাসরিকী জুট মিল। চালু থাকা মিলগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঁচপুর বাজার এলাকায় নওয়াব আব্দুল মালেক জুট মিল, রূপগঞ্জের তারাবোর টাটকী এলাকায় অবস্থিত নিউ ঢাকা জুট মিল, উত্তরা জুট মিল, কাঞ্চনে নবারুন জুট মিল। ধীরে ধীরে নারায়ণগঞ্জ হারায় প্রাচ্যের ডান্ডি খ্যাতির গৌরব।

এদিকে পাটের পাশাপাশি ১৯১৬ সালে নারায়ণগঞ্জে গোড়াপত্তন ঘটে বস্ত্র যুগেরও। ওই বছরে শহরের টানবাজার হংস হোসিয়ারী নামে নারায়ণগঞ্জে প্রথম হোসিয়ারী কারখানা স্থাপিত হয়। তারপর পিরামিড, প্যারামাউন্ট নামে আরও কয়েকটি হোসিয়ারী কারখানা গড়ে ওঠে। পূর্ব বাংলায় হোসিয়ারী পন্যের চরম ঘাটতির কারণে পঞ্চাস দশকে নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারী শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। তৎকালীন সময়ে ভূ-গর্ভস্থ পানিতে আয়রন ও খনিজ পদার্থের ভাগ কম থাকা, স্থানীয় ঢাকেশ্বরী, লক্ষীনারায়ণ, চিত্তরঞ্জন কটন মিলসহ ইত্যাদি সুতার মিল নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত হওয়ায় এবং নারায়ণগঞ্জে প্রধান নদীবন্দর ও রেলযোগাযোগ ব্যবস্থা থাকায় নারায়ণগঞ্জে হোসিয়ারী শিল্প গড়ে ওঠার অন্যতম কারন। সময়ের ব্যবধানে হোসিয়ারি শিল্পটি নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটি থেকে উকিলপাড়া, দেওভোগ, সোহরাওয়ার্দী মার্কেট ও থানার পুকুরপাড়ে বিস্তৃত হয়। এরপর জেলার ফতুল্লা এলাকার পঞ্চবটীতে বিসিক শিল্পনগরীতে এর বিস্তার ঘটে। বর্তমানে হোসিয়ারী কারখানা জেলার বিভিন্ন এলাকাতে গড়ে উঠেছে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে প্রায় দুই হাজার প্রতিষ্ঠানসহ সারা দেশে অ্যাসোসিয়েশনের প্রায় তিন হাজার নিবন্ধিত হোসিয়ারি পণ্য উৎপাদনকারী ব্যবসা প্রতিষ্ঠান আছে। অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান আছে অগনিত। শিল্পটির বিভিন্ন পর্যায়ে লক্ষাধিক মানুষ জড়িত।

এদিকে হোসিয়ারী শিল্পের পাশাপাশি নীট গার্মেন্টসও নারায়ণগঞ্জে বিস্তৃতি লাভ করে। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জে নীট, ওভেন ও সুয়েটার গার্মেন্ট কারখানা রয়েছে কয়েকহাজার। এর পাশাপাশি রয়েছে অসংখ্য স্পিনিং মিল ও টেক্সটাইল মিলস। এছাড়া সুতা ও রং ব্যবসায়ীদেরও একটি বৃহৎ বাজার রয়েছে নারায়ণগঞ্জ শহরের টানবাজারে। নিতাইগঞ্জে রয়েছে অন্যতম বৃহৎ পাইকারী মোকাম। বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ নীট গার্মেন্ট শিল্পের নগরী হিসেবেও পরিচিত।

এদিকে বিগত সময়ে আওয়ামী লীগের এমপিরা দোর্দান্ড দাপটে জয় আনলেও মন্ত্রীত্ব জুটেনি কারো ভাগ্যে। এ নিয়ে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মী তথা নারায়ণগঞ্জবাসীর মনেও ছিল দীর্ঘদিনের আক্ষেপ। তবে ৭ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ-১ তথা রূপগঞ্জ আসনের এমপি গোলাম দস্তগীর গাজী বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাই প্রাচ্যের ডান্ডির সেই হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনাই বর্তমানে চ্যালেঞ্জ বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী হিসেবে নতুন দায়িত্ব পাওয়া গোলাম দস্তগীর গাজীর।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও