একসঙ্গে রাজনীতি করেও আ.লীগের নেতাকর্মীরা রেহাই পায়নি মতির কাছে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৭ পিএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার

একসঙ্গে রাজনীতি করেও আ.লীগের নেতাকর্মীরা রেহাই পায়নি মতির কাছে

বিগত দিনে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র, ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতির সঙ্গে রাজনীতি করতেন আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইল। তবে একসঙ্গে রাজনীতি করেও মতির ভূমিদস্যুতার কবল থেকে রেহাই মেলেনি আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইল। তবে শুধু ইসমাইলই নয় ব্যক্তিস্বার্থের কারণে সিদ্ধিরগঞ্জের অনেক আওয়ামীলীগ কর্মীকেই দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মতির রোষানলের শিকার হতে হয়েছে। ইতিমধ্যে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী ইয়াসিনের উদ্দেশ্যে এবং আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইলকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মতির গালাগালের দু’টি অডিও টেপ সামাজিক যোগাযোগের জনপ্রিয় মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা ইসমাইল বিগত দিনে প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির অনুগামী হিসেবে রাজনীতি করতেন। মতির সঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠানেও তাকে দেখা গেছে। কিন্তু সেই ইসমাইলও রেহাই পায়নি মতির রোষানল থেকে। মতি ছিলেন সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহবায়ক। কিন্তু যারা আওয়ামীলীগের রাজনীতি করতেন তারা সাধারণত সিদ্ধিরগঞ্জের বিভিন্ন স্থানে আওয়ামীলীগের অনুষ্ঠানে যেতেন।  তবে সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী এলাকার যারাই সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবুর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী ইয়াসিনসহ থানা আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যেতেন তাদেরকেই মতির রোষানলের শিকার হতে হয়েছে। শুধু ইসমাইলই নয় নিজের ব্যাক্তি স্বার্থে আঘাত লাগলে আওয়ামীলীগের কাউকেই রেহাই দিতেন না প্যানেল মেয়র মতি। সেই ব্যক্তি আওয়ামীলীগের পদধারীই হোক আর কর্মীই হোক কিংবা তার অনুগামীই হোক তাদেরকে অকথ্য ভাষায় গালাগালসহ প্রাণনাশেরও হুমকী দিতে কার্পণ্য করতো না একসময়ের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মতি। বিগত দিনে তার রোষানলে পড়ে অনেক আওয়ামীলীগ কর্মীকেই তাদের জমি হারাতে হয়েছিল। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী ইয়াসিনের উদ্দেশ্যে এবং আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইলকে দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী মতির গালাগালের দু’টি অডিও টেপ থেকেই মতির দস্যুতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।

জানা গেছে, আবদুল হান্নান ও ইসমাইলদের সঙ্গে প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির অনুগামী আবদুর রাজ্জাকের ৯ শতাংশ জমি নিয়ে বিরোধ ছিল। ওই বিরোধ নিয়ে কয়েকদিন ধরেই শালিসী বৈঠকও হয়। গত ৩ জানুয়ারী সকাল ১১টায় উভয় পক্ষের লোকজন আবারো জড়ো হলে প্রথমে বাকবিতন্ডার ঘটনা ঘটে। ওই সময়ে প্যানেল মেয়র মতি অকথ্য ভাষায় হান্নান ও ইসমাইলকে গালাগাল করে। তখন তাদের মধ্যে সংঘর্ষ চলাকালে একপর্যায়ে মতি জখম হয়। সংঘর্ষে হান্নান, ইসমাইল, মজিবর, সানু, আলমগীর, রোকেয়া, সুরভী, রাজ্জাক মিয়া, মনির হোসেন, সোহেল, ফারুক হোসেনসহ কমপক্ষে ১৫ জন আহত হয়। তাদের স্থানীয় ক্লিনিকে চিকিৎসা দেয়া হয়। মতিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয়। এদিকে সংঘর্ষের ঘটনাটিকে মতি বনাম সিরাজ মন্ডল গ্রুপের সংঘর্ষে রূপান্তরিত করার উদ্দেশ্যে তৎকালে সিরাজ মন্ডলের করা শামীম ওসমানের প্রচারণার নৌকার ক্যাম্প পুড়িয়ে দেয় মতির অনুগামীরা।

সংঘর্ষের ঘটনায় ৪ জানুয়ারী পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছেন মতির ভাই ও রোকেয়া বেগম। মতির ভাই মাহবুবুর রহমান মামলায় উল্লেখ করেন, তার ভাই প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি ৩ জানুয়ারি সকালে এলাকার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ পরিদর্শনে বের হয়। এসময় পথিমধ্যে ইসমাইল, হান্নান, ফারুক, মজিবর, নাঈম, আলমগীর, হাসান, মোস্তফাসহ অজ্ঞাত ১৫ জন মতিকে মারধর ও কুপিয়ে জখম করে। এতে সে মারাত্মক আহত হয়। তাকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এ হামলা বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। এ মামলায় ফারুককে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। অপরদিকে মতি গংদের আসামি করে পাল্টা মামলা করেছেন রোকেয়া বেগম। তিনি মামলায় উল্লেখ করেন সুমিলপাড়া নতুন বাজার আবেদ আলীর হাজী বাড়িতে তার পৈত্রিক সাড়ে ৩ শতাংশ জমি রয়েছে যা দখল করতে সেখানে যায় মামলায় বিবাদীরা এবং দেশিয় অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে তাদের উপর হামলা করে তাদের বাড়িঘরের ১০ লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এতে তাদের কয়েকজন আহত হয় বলেও মামলা উল্লেখ করা হয়। মামলায় বিবাদীরা হলেন- রাজ্জাক, মনির, রফিকসহ অজ্ঞাত ১০ জন। এরা সকলেই প্যানেল মেয়র মতির লোক।

এদিকে সংঘর্ষের আগে জমির মালিক ইসমাইলের মুঠোফোনে কল করেন প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতির সহযোগী মানিক। প্রথমে ইসমাইলকে কাউন্সিলর অফিসে আসতে বলেন মতির সহযোগী মানিক। তখন ইসমাইল মানিককে বলে সে এখন নামাজে যাবে মাগরিবের নামাজের পরে সন্ধ্যায় কাউন্সিলর অফিসে আসবেন। তখন মানিক প্যানেল মেয়র মতিকে ফোন দিলে ইসমাইল প্যানেল মেয়র মতিকে সালাম দেয়। কিন্তু মতি সালামের জবাব না দিয়েই তাকে বলে, এক্ষুনই আসবি নাকি লোক দিয়া ধরাইয়া আনমু। ইসমাইল তাকে নামাজের পরে কাউন্সিলর অফিসে আসবে বলে জানালে মতি ক্ষুব্দ হয়ে তাকে বলে এখনই না আসলে তাকে পেটাতে পেটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনা হবে। মতি তখনই তার অনুগামীদের নির্দেশ দেন ইসমাইলকে পিটাতে পিটাতে বাড়ি থেকে ধরে আনার জন্য। তখন মতি ইসমাইলকে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করে তাকে জিজ্ঞেস করে তোর জন্মদাতা কয়টা। তুই আমারে চিনস? তখন ইসমাইল মতিকে বলে ভাই আপনি এভাবে গালাগালি করছেন কেন। আপনি কথা ভাল মতো বলেন। তখন মতি আরো ক্ষুব্দ হয়ে ইসমাইলকে বলে তোকে কেন এর জবাব দিতে হবে। তুই পার পেয়ে গেছিস বলে মনে করছস। আমি তোরে দেইখ্যা দিমু। তোর জায়গা...তোর...। তুই এখন আমার অফিসে হাজির হবি। তোর বাপে তোরে অর্ডার দিসে আমি তোর বাপ তোরে পিটামু তুই এখন অফিসে আয়। তোরে আমি কি করি তুই দেখবি। এই বলে প্যানেল মেয়র মতি ফোন রেখে দেন।

এদিকে সম্প্রতি সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত অনন্ত গ্রুপের গার্মেন্টে ঠিকাদারী কাজ নিয়ে ওই গার্মেন্টে যাওয়া সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী মোঃ ইয়াসিন মিয়াকে উদ্দেশ্য করে মতির গালাগালের একটি অডিও টেপ ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে পড়েছে। ওই অডিও টেপে দীর্ঘদিনের এক সহযোগীকেও দেখে নেয়ার হুমকী দিয়েছিল মতি। সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেডের প্রায় সকল কারখানার ঠিকাদারী ব্যবসার নিয়ন্ত্রন করে থাকেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র, ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগের আহবায়ক মতিউর রহমান মতি। এদিকে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী মোঃ ইয়াসিন মিয়া আদমজী ইপিজেডে অবস্থিত অনন্ত গ্রুপের গার্মেন্টে ঠিকাদারী কাজের বিষয়ে কথা বলার সময়ে মতির সহযোগী মানিক উপস্থিত থাকায় প্রচন্ড ক্ষুব্দ হন মতি। তিনি মুঠোফোনে মানিককে বলেন, তুমি সেক্রেটারীরে চিন আমারে চিননা। ওই বেটা আমি তোরে চিনাইয়া দিমু কইলাম। তোর বাপেগো গিয়া কইস তোর মজিবর ও ইয়াসিন বাপেগো গিয়া কইস....হান্দাইয়া দিব কইসে যা। তখন মানিক তাকে বলতে থাকে ভাই আমাকে যাওয়ার জন্য কল দিসিল কিন্তু আমরাতো যাই নাই। তখর প্যানেল মেয়র মতি তাকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে বলেন, তোরে আমি কি করি দেখ। আমার ব্যবসা নিয়া যাইবো। তুই আবার গিরিঙ্গী করস। তখন মানিক বলতে থাকে সভাপতি সেক্রেটারী ডাকে আবার আপনিও গালাগাল করছেন আমি কই যাইতাম। তাইলে এই দেশ থেকে যাইগা। আমারে ডাকসিল কিন্তু আমি নিচে বসা ছিলাম। আমি উপরে যাইনাই। হেরা উপরে গেসে। আপনি শুধু আমারে গালাগাল করতাসেন। তখন প্যানেল মেয়র মতি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সেক্রেটারী হাজী মোঃ ইয়াসিন মিয়ার উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেন যদি পারে আরেকবার ফ্যাক্টরীতে যাইবো তাইলে বেইজ্জতি হইয়া বাইরবো। পারলে আমার ব্যবসা নিয়া যাইতে বল। আমি চ্যালেঞ্জ করলাম।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও