কাউন্সিলরদের বেপরোয়াত্বপনায় শংকিত নগরবাসী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:১৩ পিএম, ৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ বুধবার

কাউন্সিলরদের বেপরোয়াত্বপনায় শংকিত নগরবাসী

নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে পড়ছেন। নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ডে নিজেদেরকে জড়িয়ে নানা আলোচনা সমালোচনার জন্ম দিচ্ছেন। ক্ষমতার অপব্যবহার করে শংকিত করে তুলছেন নাগরিকবাসীদেরকে। দিন দিন যেন তাদের বেপয়োয়াত্বপনা বেড়েই চলছে। তাদের এসকল কর্মকান্ড একদিকে যেমন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনকে বিতর্কিত করে তুলছে অন্যদিকে জনসেবাতেও ব্যাঘাত ঘটছে। ফলে এসকল বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়ানো কাউন্সিলর প্রতি আস্থা হারাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

সর্বশেষ গত ৪ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের দুই কাউন্সিলরের মধ্যে হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটেছে। এসময় এক পর্যায়ে ব্যক্তিগত অস্ত্র প্রদর্শন করে এক কাউন্সিলর অন্য কাউন্সিলরকে হুমকি দিয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এদিন সিটি করপোরেশনের নগর ভবনের তৃতীয় তলার বারান্দায় ১নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ওমর ফারুকের সঙ্গে ২৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর কামরুজ্জামান বাবুলের ওই ঘটনা ঘটে। ওমর ফারুক তার ব্যক্তিগত অস্ত্র বের করে কাউন্সিলর কামরুজ্জামান বাবুলের বুকে ঠেকিয়ে হুমকি দেয়। এসময় উপস্থিত অন্য কাউন্সিলররা এসে শান্ত করতে চেষ্টা করে।

এর আগে গত ১৯ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের উন্নয়ন প্রকল্পের দুই প্রকৌশলীকে অকথ্য ভাষায় গালাগাল করার অভিযোগ উঠেছে কাউন্সিলর আব্দুল করিম বাবুর বিরুদ্ধে। ১৭নং ওয়ার্ডে রাস্তা, কবরস্থান সহ কয়েকটি প্রকল্পের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে ওই ঘটনা ঘটে বলে জানান স্থানীয়রা। ওই ঘটনার পর পাইকপাড়া এলাকায় সালাউদ্দিন দেওয়ান (৫০) নামের সাবেক ফুটবলারকে ইয়াবা সহ ফাঁসিয়ে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তখন তুলকালাম তখন ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া সদর মডেল থানার এস আই নাজমুলকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে গত ৩ ডিসেম্বর বকেলে শহরের চাষাঢ়ায় হীরা মহলে শহর এলাকার নির্বাচিত কাউন্সিলরদের নিয়ে সভা করেন এমপি সেলিম ওসমান। ওই সময়ে ১৭নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আবদুল করিম বাবু বলেন যে তিনিও মাঝেমধ্যে ১৮নং ওয়ার্ডের উন্নয়ন কাজ দেখভাল করবেন। কামরুল হাসান মুন্না তখন বাবুকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘আপনি কেন যাবেন। সেখানে তো লোকজন আছে।’ জবাবে বাবু বলেন, ‘না আমি যাবো সেখানে তো আমার বাড়ি আছে। প্রতিত্তরে মুন্না বলেন, ‘১৭নং ওয়ার্ডেও তো আমার আত্মীয় স্বজন আছে।’ পাল্টাপাল্টি বক্তব্য নিয়ে তাদের মধ্যে শুরু হয় তুমুল বাকবিতন্ডা। এক পর্যায়ে তারা হাতাহাতিতে লিপ্ত হন।

গত বছরের শুরুতে ৯ জানুয়ারি সন্ধ্যায় নারায়ণগঞ্জের দেওভোগে নির্মাণাধীন লেকের উন্মুক্ত মঞ্চে নাসিকের এক বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে মেয়র আইভী বলেছিলেন, আজকে আমাদের অনুষ্ঠান সরাসরি স¤প্রচার করার জন্য বাবুকে বলা হয়েছিল। কিন্তু অনুষ্ঠানের ৫ মিনিট আগে তিনি জানিয়েছেন- তার স্যাটেলাইট সমস্যা, স¤প্রচার করা যাবে না। তিনি আজকে এখানে আসেননি।

চলতি বছরের শুরুতে ৩ জানুয়ারী মহানগরের সিদ্ধিরগঞ্জের ৬নং ওয়ার্ডে আদমজী নতুন বাজার এলাকায় জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে দুপুরে আওয়ামীলীগের দুই গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসময় নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র, ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানা যুবলীগ সভাপতি মতিউর রহমান মতিকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষের লোকজন।

আওয়ামীলীগ কর্মী ইসমাইল বলেন, সিটি করপোরেশনের ৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মতিউর রহমান মতি আমাদের পৈত্রিক জমিও মতি ওয়ারিশানের নাম দিয়ে দখলের চেষ্টা করছেন। ৩ জানুয়ারী বৃহস্পতিবার সে দলবল নিয়ে আমাদের জমি দখল করতে আসলে আমরা তাদেরকে বাধা দেই। পরবর্তীতে মতির ক্যাডাররা আমাদের বসতবাড়ি ও দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যপক ভাংচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। এসময় তারা আমাদের বসতবাড়িতে থাকা গৃহবধূদেরও শ্লীলতাহানি করেছে।

১৪নং ওয়ার্ডে বৈদ্যুতিক বাতি লাগানো নিয়ে বাকবিতন্ডার জের ধরে ওই ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা শফিউদ্দিন প্রধানের সঙ্গে বিদ্যুতের সহকারী প্রকৌশলী রেজাউল করিম রাজুর মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডার ঘটনা ঘটেছে। ওই সময়ে তাদের মধ্যে ব্যাপক ধস্তাধস্তির ঘটনা ঘটে। প্রকৌশলীর দাবী উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের এক পর্যায়ে তার উপর চড়াও হয়ে পিটিয়েছেন কাউন্সিলর। আর কাউন্সিলরের দাবী তিনি কোন মারধর করেনি।

এ ঘটনা সম্পর্কে জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের ১৪নং ওয়ার্ডে বৈদ্যুতিক বাতি লাগানো হয়। কিন্তু হঠাৎ করে এসব বাতি নষ্ট হয়ে যায়। এর মধ্যে ৩ অক্টোবর দুপুর ৩টা ১০ মিনিটে সহকারি প্রকৌশলী রেজাউল করিম রাজুর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। তখন দুইজনই ফোনে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় করেন। ফোনেই দুইজন একে অপরের উপর চটে যান।

পরে বিকেল সাড়ে ৩টায় শফিউদ্দিন প্রধান নগর ভবনে রেজাউল করিম রাজুর কক্ষে প্রবেশ করে মুঠোফোনে বাকবিতন্ডার বিষয়টি জানতে চান। তখন রেজাও সাফ বলেন, এসব নিয়ে কৈফিয়ত দিতে পারবো না। এসব নিয়ে সেখানেও তাদের মধ্যে তুমুল বাকবিতন্ডা ঘটলে দুইজনই চেয়ার ছেড়ে দেন। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে বাকবিতন্ডা শুনে ছুটে আসেন আশেপাশের লোকজন। তারা দুইজনকেই নিবৃত্ত করেন।

আর সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের এসকল ঘটনায় সাধারণ নাগরিকবাসী শংকিত হয়ে পড়ছেন। তাদের মাঝে ভিন্ন ধারণার জন্ম দিচ্ছে। তাদের মতে, জনপ্রতিনিধিদের দ্বারা এসকল ঘটনা কখনই কাম্য নয়। সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলররা এলাকার বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসবেন। কিন্তু বিপরীতে যদি তারা নিজেরাই সমস্যা তৈরি করেন তাহলে তাদের দ্বারা নাগরিক সেবা হবে না। বরং বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নাগরিকরা তাদের কাছে যেতে শঙ্কাবোধ করবে।

 


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও