আইভী ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে তিন ইস্যু

সিটি করেসপন্ডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৫১ পিএম, ২০ মার্চ ২০১৯ বুধবার

আইভী ইস্যুতে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে তিন ইস্যু

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াত আইভীর বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীকে দেওয়া স্মারকলিপিতে তিনটি ইস্যুকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। পুরো চার পাতার স্মারকলিপিতে মুখ্য হয়ে উঠেছে ওই চারটি ইস্যু।

ইস্যু ১
স্মারকলিপিতে নারায়ণগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, ‘পলিটিক্যাল হান্টিং গ্রাউন্ড অব বেঙ্গল” খ্যাত নারায়ণগঞ্জের সুদীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি পরিবারের নাম ও অবদান অনস্বিকার্য, সেটি হল ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবার। কালের সাক্ষী বায়তুল আমান ভবন আজও সেই স্মারক বহন করছে। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্ম জীবনীতে ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এই পরিবারের অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনি মহান জাতীয় সংসদে আপনার বক্তব্যে বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচর ও স্বাধীনতা পদকে ভূষিত (মরণোত্তর) প্রয়াত একেএম সামসুজ্জোহা ও ঐতিহ্যবাহী ওসমান পরিবারের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ গ্রহন এবং ৭৫’পরবর্তী সময়ের ভূমিকা নিয়ে যেভাবে বর্ণনা দিয়েছিলেন, তাতে নারায়ণগঞ্জবাসী গর্বিত ও সম্মানিত হয়েছে। কিন্তু আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি, নারায়ণগঞ্জে কোন অনাকাঙ্খিত ঘটনা ঘটলেই একটি জনবিচ্ছিন্ন শ্রেনি এই পরিবারটিকে টার্গেট করে মাঠে নামে এবং বিভিন্ন আপত্তিকর বক্তব্য প্রদান করা শুরু করে। সংবিধানের বাহক সেজে যুদ্ধাপরাধী জামায়াত-শিবিরের সাথে আঁতাত করা ক্ষমতার জন্য লালায়িত কিছু বড় বড় ডক্টর সাহেবদের প্রেসক্রিপশনে ঘন ঘন রাজধানী থেকে তথাকিথত কিছু সুশীলরা নারায়ণগঞ্জে আসছেন। তারা একই সাথে আপনার ও বর্তমান সরকারের কুৎসা রটনার পাশাপাশি নারায়ণগঞ্জকে অশান্ত করার ও নারায়ণগঞ্জের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করার অপচেষ্টায় লিপ্ত থাকেন। পরিতাপ হয়, ক্ষোভ হয় যখন দেখি যার আহবান ও সমর্থনে এসব সুশীলরা আসেন, তিনি হলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াত আইভী।

ইস্যু-২
স্মারকলিপিতে আলোচিত সাগর-রুনি ও তনু হত্যাকান্ড নিয়ে আইভীর বক্তব্যকেও সামনে আনা হয়। এতে বলা হয়, গত ৬ মার্চ মেয়র আইভী জনসম্মুখে বললেন, নারায়ণগঞ্জে আজ পর্যন্ত যত খুন হয়েছে সেসবই ওসমান পরিবারের দ্বারা হয়েছে। আমরা স্তম্ভিত হলাম। আমরা আরো অবাক হলাম যখন শুনলাম মেয়র আইভী বলছেন,“সাগর-রুনীর ব্যাপারে আমরা অনেক কিছুই জানি, অনেক কিছু জড়িত, তনু হত্যার বিচার কেন হচ্ছে না, সেটাও জানি কারা জড়িত” (ভিডিও লিংক আইভী তুমি কার?) শুধু তাই নয়, মেয়র আইভীর উপস্থিতিতে ভাড়া করে আনা সুশীল ও তার সাথে থাকা জনবিচ্ছিন্ন গুটি কয়েক লোক মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনাকে নিয়ে যেসকল মিথ্যাচার ও ঔদ্ধত্বপূর্ণ বক্তব্য দিচ্ছে তাতে আমরা নারায়ণগঞ্জবাসী বিস্মিত ও ক্ষুব্ধ।

ইস্যু-৩
স্মারকলিপিতে আইভীর সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর সখ্যতা আছে সেটাও তুলে ধরা হয়। বলা হয়, যুদ্ধাপরাধী আলবদর প্রধান আলী আহসান মুজাহিদের ঘনিষ্ঠ সহচর, কেন্দ্রীয় মজলিসে সুরার সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মঈনুদ্দিন গত ২০অক্টোবর ২০১৮ আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হওয়ার পর একটি জবানবন্দি দিয়েছিলেন। পেশাদার ও নির্ভিক সাংবাদিকদের তথ্যানুসন্ধানে সেই জবানবন্দির অডিও টেপ বিভিন্ন জাতীয় স্থানীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ পায়। সেখানে জামায়াত আমীর অবলিলায় স্বীকার করেছেন বিলুপ্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা থেকে বর্তমান সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন পর্যন্ত মেয়র আইভীকে কিভাবে কি কৌশলে জামায়াত পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে। এর মূল কারণ, পারিবারিকভাবে জামায়াতে ইসলামের সাথে মেয়র আইভীর সৌহার্দ্য পূর্ণ সম্পর্ক। ঐ জবানবন্দিতে পরিস্কারভাবে জামাতের আমীর বলেছেন, প্রথম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে আগে থেকেই আইভীর সঙ্গে বেগম জিয়ার সরাসরি যোগাযোগ ছিল। মির্জা আব্বাসের স্ত্রী আফরোজা আব্বাসের মাধ্যমেই এই সম্পর্কটা হয়। খালেদা জিয়ার সাথে সমঝোতা ছিল নির্বাচনের পর বিএনপিতে যোগ দিবেন আইভী। এই শর্তেই বিএনপির প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারকে নির্বাচনের শেষ মূহুর্তে গভীর রাতে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু জামায়াতে ইসলাম চেয়েছিল আইভী যেন আওয়ামীলীগেই থাকুক। নিজের জবানবন্দিতে জামাত আমীর বলেছেন, “বিএনপি-জামাতের পক্ষে শামীম ওসমানকে ঠেকানো সম্ভব নয় তাই আইভীকে আওয়ামীলীগই করতে হবে। ওকে আওয়ামী লীগে রাখতে পারলেই ভালো। এতে বিএনপি-জামায়াত সবার জন্য সুবিধা আছে”। জামায়াতের সঙ্গে আইভীর যোগাযোগ প্রসঙ্গে জামায়াত নেতা মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘রিলেশনটা ওপেন হলে সমস্যা। আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে। আমরাও চাই না তাকে (আইভী) বিব্রত করতে। আমাদের যে কোনো কাজে অনুরোধ করলে ডাইরেক্ট, ইনডাইরেক্ট সে বসে সহজে করে দিছে। অনেক কাজ করে দিছে”। ঐ জবানবন্দিতে আরো যে ভয়ঙ্কর তথ্য দেয়া হয়েছে তা হলো, যে সময় পুরো দেশ যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে উত্তাল, সেসময় মেয়র আইভী যুদ্ধাপরাধী মুজাহিদের পরিবারকে অতি গোপনে জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছেন । জামাতের আমীরের দেয়া জবানবন্দিতে বলেছেন, “মুজাহিদ সাহেবের ওয়াইফ আর আইভী ক্লাসমেট ছিল। মুজাহিদ সাহেব যখন জেলে, তখন ওনার ছেলেদের জন্মনিবন্ধনও এখানেই হয়েছে। অনেক ঘুরাঘুরি করে যখন পাচ্ছিল না, তখন মুজাহিদের ওয়াইফ আইভীকে বলার পরই আধঘণ্টার মধ্যে এই জন্মনিবন্ধন হয়ে গেল”। ইউটিউব অডিও লিংক- আইভী ও তার বাবার জামায়াত প্রীতি?

উপরে উল্লেখিত এসব ঘটনা ও আইভীর বক্তব্য প্রমাণ করে দলে জামায়াতের এজেন্ট কে বা কারা। জামায়াতের আমীরের দেয়া সেই জবানবন্দির প্রতিটি  কথাই মিলে যাচ্ছে তার কর্মকান্ডে। ফলে আমরা চরম ভাবে শঙ্কিত ও আশঙ্কা করছি যে, নারায়ণগঞ্জে আবারো অশান্ত পরিবেশ সৃষ্টির পাঁয়তারা করা হচ্ছে। ২০০১এর ১৬ই জুনের বোমা হামলার মত আবারো কোন পৈশাচিক ঘটনার পরিকল্পনা হচ্ছে কি?

প্রসঙ্গত

নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াত আইভীর কিছু কর্মকান্ডের সমালোচনা করে এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে দেশের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীরে দৃষ্টগোচর করেছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।

চাঞ্চল্যকর সাগর-রুনী ও তনু হত্যাকান্ড নিয়ে বেফাঁস মন্তব্য করে সরকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এবং জামাত-বিএনপি ও তথাকথিত সুশীলদের প্রেসক্রিপশনে নারায়ণগঞ্জকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ এনে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছেন তাঁরা। খোদ সিটি কর্পোরেশেনের ২৪জন কাউন্সিলর, জেলা ও মহানগর আওয়ামীলীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, আইনজীবী সমিতি, স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ), শিক্ষক সমিতি, ইমাম সমিতি, জেলা ও ৫টি উপজেলা পূজা উদযাপন কমিটি, জাতীয় ও স্থানীয় ব্যবসায়ী সংগঠন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের ২২জন চেয়ারম্যান, বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনসহ ২১ শ্রেণির কয়েক হাজার মানুষ ওই স্মারকলিপিতে স্বাক্ষর দিয়েছেন।

তাঁরা বলেছেন, সিটি করপোরেশনের একজন মেয়র ও আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল পদে থেকে খোদ সরকারকেই বিতর্কিত করার প্রয়াসে মেতে উঠেছেন আইভী।

১৯ মার্চ মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে এই নারায়ণগঞ্জের সচেতন নাগরিক সমাজের ব্যানারে ঐ স্মারকলিপি জমা দেয়া হয়।স্মারকলিপি জমা দেবার পর জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের চত্বরে নাগরিক সমাজের পক্ষে প্রেস ব্রিফিং ও স্মারকলিপি পাঠ করেন জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি হাসান ফেরদৌস জুয়েল।

স্মারকলিপি প্রদানের সময়ে জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদল, মহানগরের সেক্রেটারী খোকন সাহা, সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র মতিউর রহমান মতি, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল, জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী শিরিন বেগম, মহানগরের সভাপতি ইসরাত জাহান খান স্মৃতি, মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু, মহানগর কৃষকলীগের সেক্রেটারী জিল্লুর রহমান লিটন, জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি আজিজুর রহমান, মহানগরের সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ, সাবেক ছাত্রলীগ সভাপতি সাফায়েত আলম সানি, সাবেক সেক্রেটারী মিজানুর রহমান সুজন প্রমুখ।

স্মারকলিপিতে জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ডেপুটি কমান্ডার ও নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবি সমিতির কার্যকরি কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর, জাতীয় ভিত্তিক ব্যবসায়ী সংগঠনের কর্মকর্তাদের সাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলরদের স্বাক্ষর, শিক্ষক নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, জেলার বিভিন্ন প্রেস ক্লাবের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, পেশাজীবি স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ জেলা পূজা উদযাপন কমিটি এবং ৫টি উপজেলার পূজা উদযাপন কমিটির স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইন কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর, জেলা ক্রীড়া সংস্থার নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, সোনারাগাঁও পৌরসভার মেয়র-কাউসিলর এবং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানদের স্বাক্ষর, নারায়ণগঞ্জ ক্লাব লিঃ এর কার্যকরি পরিষদ সদস্যদের স্বাক্ষর, ব্যাংক এমপ্লিয়িজ এসোসিয়েশন নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, জেলা পরিষদ সদস্যদের স্বাক্ষর, বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর, বিভিন্ন মসজিদ ইমামদের স্বাক্ষর, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির স্বাক্ষর ও নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের কার্যকরি কমিটির নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষর রয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও