লাশে কাতর নারায়ণগঞ্জ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০২:২৯ পিএম, ১৪ এপ্রিল ২০১৯ রবিবার

প্রথম ছবিতে ফতুল্লা দগ্ধ হয়ে নিহত চারজনের ফাইল ফটো পরিবারের সঙ্গে (ছবিটি নারায়ণগঞ্জ টুডের সৌজন্যে)। পরের ছবিগুলোতে টানবাজারে স্বামী ও সন্তান নিয়ে বৃষ্টি চৌধুরী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা ফরিদ ও সবশেষ ব্যবসায়ী সেলিম চৌধুরী।
প্রথম ছবিতে ফতুল্লা দগ্ধ হয়ে নিহত চারজনের ফাইল ফটো পরিবারের সঙ্গে (ছবিটি নারায়ণগঞ্জ টুডের সৌজন্যে)। পরের ছবিগুলোতে টানবাজারে স্বামী ও সন্তান নিয়ে বৃষ্টি চৌধুরী, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত পুলিশ কর্মকর্তা ফরিদ ও সবশেষ ব্যবসায়ী সেলিম চৌধুরী।

নারায়ণগঞ্জে গত কয়েকদিন বেশ কয়েকটি মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। লাশে কাতর হয়ে উঠতে শুরু করেছে পুরো জনপদ। এর মধ্যে একটি হত্যাকান্ড থেকে শুরু করে অগ্নিদগ্ধ, সড়ক দুর্ঘটনার খবরে মর্মাহত মানুষ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বার বার নেতিবাচক খবরেই আলোচনায় উঠে আসছে নারায়ণগঞ্জ।

ফতুল্লায় অগ্নিদগ্ধ মা ও তিন সন্তানের কাউকেই বাঁচানো গেল না

ফতুল্লায় গ্যাস সিলিন্ডারের লিকেজ পাইপে অগ্নিকান্ডে দগ্ধ মা ও তিন সন্তানের কাউকেই বাঁচানো গেল না। একে একে সবাই পাড়ি জমিয়েছেন না ফেরার দেশে। সর্বশেষ শুক্রবার (১২ এপ্রিল) রাত পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মারা যায় ফারিয়া (৯)। তার শরীরের ৯০ ভাগ পুড়ে গিয়েছিল। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একই পরিবারের মা ও তিন শিশু সন্তানের মৃত্যু হলো।
এর আগে ৭ এপ্রিল রাতে প্রথম মারা যায় সাফওয়ান (৫)। ৮ এপ্রিল ভোরে চলে যান ফাতেমা বেগম (৩৫)। ১১ এপ্রিল দুপুরে মারা যায় রাফি (১১)।

৬ এপ্রিল রাত সাড়ে ৮টার দিকে ফতুল্লার কুতুবপুরের গিরিধারা আবাসিক এলাকার বাসায় ফাতেমা বেগম ও তার তিন শিশু সন্তান দগ্ধ হয়। পরে তাদের সবাইকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, দগ্ধ ফাতেমার শরীরের ৯৪ শতাংশ, ছেলে সাফওয়ানের ৯৭ শতাংশ এবং রাফির ৯৮ শতাংশ পুড়ে গিয়েছিল। তারা সবাই আশঙ্কাজনক অবস্থার মধ্যেই ছিলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পুলিশ ফাঁড়ির সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) আব্দুল খান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ৬ এপ্রিল ফতুল্লা থেকে একই পরিবারের দগ্ধ চারজনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়। তিনজন ইতোপূর্বে মারা গেলেও বেঁচে ছিলো শিশু ফারিয়া। সর্বশেষ শুক্রবার রাতে সে মারা গেছে।

কাভার্ডভ্যানের চাপায় পুলিশের এসআই নিহত
লাঙ্গলবন্দের স্নান উৎসবের যানজট নিরসন করার সময়ে মহাসড়কে কাভার্ডভ্যানের চাপায় ফরিদ আহমেদ (৩৮) নামে পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) নিহত হয়েছে।

১২ এপ্রিল শুক্রবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের উপজেলার মালিবাগ এলাকায় ওই ঘটনা ঘটে। নিহত ফরিদ আহমেদ হবিগঞ্জের চুনারুঘাট এলাকার মৃত মানিক জমাদারের ছেলে। সে কাঁচপুর হাইওয়ে থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) পদে কর্মরত ছিল।

কাচঁপুর হাইওয়ে থানার ওসি কাইয়ুম আলী সরদার জানান, লাঙ্গলবন্দ স্নান উৎসব উপলক্ষে যানজট নিয়ন্ত্রনে ঢাকা চট্টগ্রাম মহাসড়কের বন্দরের মালিবাগ ক্যাসল ফুড রেস্টুরেন্টের সামনে ডিউটি করছিলেন এসআই ফরিদ আহম্মেদ। শুক্রবার সকাল ৬টায় ঢাকাগামী একটি কাভার্ডভ্যানকে থামতে সিগনাল দেন তিনি। এ সময় কাভার্ডভ্যানের চালক  না থামিয়ে এসআই ফরিদের উপরে তুলে দেয়। এতে চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। কাভার্ডভ্যানটি আটক করলেও চালক ও হেলপার পালিয়ে যায়।

টানবাজারে গৃহবধূর মৃত্যু
শহরের টানবাজারে সাহাপাড়া এলাকায় যৌতুকের দাবীতে বৃষ্টি চৌধুরী (২১) নামের গৃহবধূকে নির্যাতনের পর তাকে আত্মহত্যার প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ব্যাংক কর্মকর্তা স্বামী ও শ্বশুরের বিরুদ্ধে। শুক্রবার সন্ধ্যায় এ ঘটনায় পুলিশ দুইজনকে গ্রেপ্তার করলেও তাদের দাবী, এটা আত্মহত্যা।

বৃষ্টি চৌধুরীর ভাই মিঠুন চৌধুরী জানান, দুই বছর আগে কুমিল্লা জেলার মুরাদনগর এলাকার শ্যামল চৌধুরীর মেয়ে বৃষ্টির সঙ্গে শহরের টানবাজার সাহাপাড়া এলাকার সুভাষ চন্দ্র রায়ের ছেলে ডাচ বাংলা ব্যাংকের কর্মকর্তা সুদীপ রায়ের সঙ্গে বিয়ে হয়। বিয়ের সময়েই ১৫ লাখ টাকা ও ২০ ভরি স্বর্ণলংকার দেয় বৃষ্টির পরিবার। কিন্তু বিয়ের পরে আরো যৌতুকের জন্য বৃষ্টিকে মারধর করতো শ্বশুর বাড়ির লোকজন। এসব নিয়ে আগেও কয়েকবার বিচার শালিসহ হয়েছিল। শুক্রবার স্বামী, শ্বশুর, শাশুড়ি ও ননদ মিলে নির্যাতন করে বৃষ্টিকে হত্যা করে।

তবে বৃষ্টির স্বামী সুদীপ রায় জানান, পারিবারিক ঝগড়ার জের ধরে শুক্রবার দুপুরে ঘরের দরজা বন্ধ করে রাখে বৃষ্টি। বিকেলে ডাকাডাকির পরেও দরজা না খোলায় তালা ভেঙ্গে ভেতরে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় বৃষ্টিকে পাওয়া যায়। পরে তকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হয়।

সেলিম চৌধুরীকে নির্মম হত্যা
সদর উপজেলার ফতুল্লায় ঝুট ব্যবসায়ী কামরুজ্জামান সেলিম চৌধুরী হত্যা মামলায় গ্রেফতারকৃত তিনজনের মধ্যে একজন ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী প্রদান করেছে। এতে ফয়সাল নামের একজন স্বীকার করেছে, তিনি যে ঝুটের গোডাউনে চাকরি করে সেই গোডাউন মালিক ২ লাখ টাকা আত্মসাৎ করতেই সেলিম চৌধুরীকে হত্যা করে।

১২ এপ্রিল শুক্রবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট কাউছার আলমের আদালতে ফয়সাল নামের ওই ব্যক্তির জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়। একই দিন এ মামলায় গ্রেফতার ঝুটের গোডাউন মালিক মোহাম্মদ আলী ও পার্টনার সোলায়মানের ১০ দিন করে রিমান্ড আবেদন করা হলেও সোমবার আদালত শুনানীর দিন ধার্য করেছেন। আদালত পরে তিনজনকেই কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

মামলার তদন্তকারী অফিসার ফতুল্লা মডেল থানার এস আই মামুন আল আবেদ জানান, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে ফয়সাল ঝুট ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলীর কর্মচারী ও ঘনিষ্ঠ বন্ধু। মোহাম্মদ আলীর কাছে ব্যবসায়ীক দুই লাখ টাকা পাওনা ছিল  সেলিম চৌধুরী। এ টাকা আত্মসাতের জন্যই সেলিমকে হত্যার পরিকল্পনা করে মোহাম্মদ আলী। পরিকল্পনা মতে ৩১ মার্চ বিকেলে সেলিম ভোলাইলের ঝুটের গোডাউনে গেলে আলোচনার এক পর্যায়ে মাথায় লোহার রড দিয়ে আঘাত করে ফয়সাল। এতে সেলিম চৌধুরী মাটিতে পড়ে গেলে আরো কয়েকটি আঘাত করা হয়। এরপর ফয়সাল একাই সেলিমের হাত পা বেধে প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে মাটি খুড়ে চাপা দেয়। তখন মোহাম্মদ আলী ও তার আরো লোকজন ঘটনাস্থলে দাড়িয়ে দেখেছে।

তিনি আরো জানান, সেলিমকে যেখানে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে সেখানে চৌকি রেখে ৯দিন ফয়সাল ঘুমিয়েছে।

প্রসঙ্গত নিখোঁজের ১০দিন পর ১০ এপ্রিল বুধবার বিকেলে ভোলাইলে মোহাম্মদ আলীর ঝুটের গোডাউনে মাটি খুড়ে লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় ওই ঝুটের গোডাউন মালিক মোহাম্মদ আলী, দুইজন কর্মচারী ফয়সাল ও ইউনুসকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কামরুজ্জামান সেলিমের বাড়ি ফতুল্লার বক্তাবলী কানাইনগর এলাকার মৃত সামছুল হুদা চৌধুরীর ছেলে। সে পরিবার নিয়ে শিবু মার্কেট এলাকায় বসবাস করতেন।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও