প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা প্রকল্প আটকে দিচ্ছেন পলাশ!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:১০ পিএম, ১৫ এপ্রিল ২০১৯ সোমবার

প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা প্রকল্প আটকে দিচ্ছেন পলাশ!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক সদিচ্ছায় সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্মানাধীন প্রায় ৪০৩ কোটি টাকার আবাসন প্রকল্পে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন ফতুল্লার শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ। আদালতে মামলা করে ওই প্রকল্পকে থামিয়ে দেয়ার বারবার চেষ্টা করছেন তিনি। আদালত এসব অভিযোগ খারিজ করে দিলেও পেশী শক্তি দিয়ে প্রকল্প কাজে বাধা সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে পলাশের বিরুদ্ধে।

উপরন্তু সরকারী দপ্তরের পাশাপাশি প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একাধিক জিডি ও মামলা দায়ের করা হলেও অদৃশ্য শক্তির বলে কিছুতেই থামছেন না এই শ্রমিক নেতা।

জানা গেছে, সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন সংকট লাঘব করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত স্বদিচ্ছায় একটি প্রকল্প হাতে নেয় গণপূর্ত অধিদপ্তর। ফতুল্লার আলীগঞ্জ এলাকায় ‘সরকারী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের জন্য ৮টি ১৫তলা ভবনে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ২২ মার্চ জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এ অনুমোদন করা হয়।

পরের বছর ২৯ মার্চ এই প্রকল্পের অবকাঠামোগত কাজ শুরু করে সরকার। প্রায় ৪০৩কোটি টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পে ৬৭২টি আবাসিক ফ্ল্যাটের পাশাপাশি রয়েছে মসজিদ, ৪টি খেলার মাঠ, স্কুল, কমিউনিটি সেন্টারসহ অনেক কিছুই। কিন্তু এই কাজটিতে বাধা হয়ে দাঁড়ান ফতুল্লার শ্রমিক লীগের নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, বিশাল এই প্রকল্পটি বাস্তবে রুপ নিলে পাশেই নদীর তীর দখল করে গড়ে উঠা পলাশের বিশাল এলাকা হাত ছাড়া হয়ে যাবে বলেই তিনি আলীগঞ্জ খেলার মাঠ রক্ষার নামে তথাকথিত আন্দোলন শুরু করেন। তাছাড়া প্রকল্পের বালু, পাথর, ইট,সিমেন্টসহ নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহের কাজটি জোর করেই নিতে চাইছিলেন পলাশ।

জানা গেছে, গত বছরের ৫ মে ফতুল্লা পোষ্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে পলাশের বিরুদ্ধে জিডি করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লি¬উটিএ) ঢাকা বন্দর।

এছাড়াও সরকারী কর্মকর্তাদের আবাসন প্রকল্পে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনেও গত বছরই পলাশের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় সাধারন ডায়েরী (জিডি) করেন। এছাড়াও ২০১৭সালের ১২নভেম্বর প্রকল্প কাজে বাধা দেয়ার অভিযোগে ফতুল্লা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী (নং৬৩৫) করেন ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি)।

কিন্তু পুলিশ ওইসময় কোন ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে নতুন করে প্রকল্পের কাজে বাধা, প্রাণ নাশের হুমকি ও মালামাল লুটের অভিযোগ এনে অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে গণপূর্ত বিভাগের নারায়ণগঞ্জ জেলার নির্বাহী প্রকৌশলীর পক্ষে উপ সরকারী প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান ২০১৮ সালের ৩ মে ফতুল্লা থানায় অপর একটি সাধারণ ডায়েরী (নং ১১৯) করেন। এরপর ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান পিবিএল-ডিসিএল (জেভি) এর পক্ষ থেকে পুনরায় ২০১৮সালের ৭আগষ্ট প্রকল্পে বাধা দেয়ার অভিযোগ এনে জিডি করেন। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সরকারী দপ্তর ও প্রকল্পের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের এতগুলো জিডির বিপরীতে পলাশ বা তার লোকজনের বিরুেদ্ধ কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি বলে জানা গেছে।

গণপূর্তবিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির হোসেন জানান, প্রকল্পের বিরুদ্ধে আলীগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের পক্ষে নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারী জজ, ২য় আদালতে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে একটি রিট করা হয়েছিল। ঐ নিষেধাজ্ঞার দরখাস্তটি আদালত খারিজ করে দেয়। কাউসার আহমেদ পলাশ নিজেই বাদী হয়ে মহামান্য হাইকোর্ট ডিভিশনে একটি রীট করেছিলেন ২০১৬সালে। কিন্তু ২০১৭সালের ১৯অক্টোবর ঐরীটটি খারজি করে দেয় হাইকোর্ট। কিন্তু এক অদৃশ্য শক্তির কারণে এই প্রকল্পের কাজ আটকে আছে যা অত্যন্ত দুখ:জনক।

বিআইডব্লিউটিএ সূত্র মতে, বুড়িগঙ্গা নদীর পোস্তগোলা থেকে পঞ্চবটি পর্যন্ত ১২ কোটি টাকা ব্যায়ে দৃষ্টিনন্দন ওয়াকওয়ে নির্মাণ করা হলেও সেগুলোর বেশীর ভাগই দখলে রেখে অবৈধ ইট বালু পাথরের ব্যবসা নিয়ন্ত্রন করছেন কাউসার আহমেদ পলাশ। ২০১৮ সালের ৩ মে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ঢাকা বন্দর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লার পোস্ট অফিস থেকে আলীগঞ্জ পর্যন্ত বুড়িগঙ্গার তীর ও ওয়াকওয়ে দখল করে অবৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা ও ভাঙচুরের অভিযোগে জিডি করেছিল। ওই জিডিতে শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক এবং ফতুল্লা আঞ্চলিক কমিটির সভাপতি কাউসার আহমেদ পলাশের বিরুদ্ধে অভিযোগ করলেও ফল হয়নি।

খোঁজ খবর নিতে সরজমিনে গিয়ে জানা গেছে, নিজেকে ফতুল্লা অঞ্চলের এক এবং অদ্বিতীয় শ্রমিক নেতা হিসেবে নিজেকে দাবী করেন কাউসার আহমেদ পলাশ।

পাগলা, আলীগঞ্জ নাগরিক সমাজের কয়েকজন প্রতিনিধির সাথে কথা বললে তারা জানান, ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০১ পর্যন্ত এই কাউসার আহমেদ পলাশের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিতে তৎকালীন সরকার কয়েক দফা তাকে গ্রেফতার করেছিল।

শুধু ফতুল্লাতেই কাগজ-কলম স্বর্বস্ব পলাশের ৭৪টি শ্রমিক সংগঠন রয়েছে যার সব কটির শীর্ষপদই তার দখলে। আর ফতুল্লা আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতির পদটি দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে নিজের কব্জায় ধরে রেখেছেন। তার এসব শ্রমিক সংগঠনের অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে গত দেড় যুগে কানাডিয়ান নাগরিকের মালিকানাধীন র‌্যাডিকেল গার্মেন্ট, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপুর মালিকানাধীন গার্মেন্ট হামিদ ফ্যাশন, পাইওনিয়ার সোয়েটার, আর এস সোয়েটার, মিশওয়ার হোসিয়ারি, এন আর নিটিং, মাইক্রো ফাইবার, মেট্রো নিটের মতো প্রায় অর্ধশত গার্মেন্ট বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকায় চলে গেছে। ফতুল্লার বিসিক পল্লীর টিকে থকা প্রায় ৩শতাধিক ছোট বড় গার্মেন্ট মালিকরা শ্রমিক অসন্তোষের আড়ালে পলাশের চাঁদাবাজির কাছে জিম্মি।

স্থানীয়রা জানান, পুরো পাগলা, আলীগঞ্জ এলাকায় বিশাল মাদক সিন্ডিকেট সৃষ্টি হয়েছে তার শেল্টারে থাকা লোকজনের মাধ্যমেই। শুধু তাই নয়, ফতুল্লায় কুতুবপুর ইউনিয়নে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) থেকে কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে বছরে ৫৭ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। শত শত অটোরিকশা ড্রাইভার সংবাদ সম্মেলন করে এই চাদাবাজির ফিরিস্থি তুলে ধরেন। ব্যক্তি পলাশ আমাদের কাছে নগন্য একজন চাদাবাজ হলেও তার নামের আগে শ্রমিকলীগের পদধারী নেতা থাকায় আমরা অনেকটাই নিরুপায়। বিগত সংসদ নির্বাচনের আগে পলাশের এহেন কর্মকান্ডের কারণে তাকে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিছুটা স্থবির করতে স্বক্ষম হলেও আবারও স্বরুপে ফিরেছেন তিনি।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন। ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও