মেয়রপদে একাধিক খুনের মামলার আসামী প্রার্থী

সূত্র : প্রথম আলো || ০২:৫৪ পিএম, ১৭ জুলাই ২০১৯ বুধবার

মেয়রপদে একাধিক খুনের মামলার আসামী প্রার্থী

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার কাঞ্চন পৌরসভার নির্বাচনে একাধিক খুনের মামলার আসামীকে মেয়র পদে আওয়ামী লীগ দলীয় মনোনয়ন দেয়া নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে। মেয়রপদে নির্বাচিত হতে অভিযুক্ত কাঞ্চন পৌর যুবলীগ সভাপতি রফিকুল ইসলাম রফিক ও তার লোকজন এলাকায় ব্যাপক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তার তৎপরতায় প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ও প্রার্থীর সমর্থকদের নির্বাচনী প্রচার প্রচারণায় বাধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রার্থী ও সাধারণ জনসাধারণের মনে আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পাচ্ছে না। সূত্র : প্রথম আলো।

এ পৌরসভায় বিএনপি দলীয় প্রার্থী না থাকলেও বর্তমান মেয়রসহ অপর তিন প্রার্থী প্রচারণা চালাচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। আগামী ২৫ জুলাই কাঞ্চন পৌরসভার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ভোট গ্রহণের তারিখ। এদিকে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থীরা ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছেন।

এ নির্বাচনে কাঞ্চন পৌর যুবলীগের সভাপতি আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী রফিকুল ইসলাম রফিক, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বর্তমান মেয়র কাঞ্চন পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আবুল বাশার বাদশা, কাঞ্চন পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত সাবেক মেয়র কাঞ্চন পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ও জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি আইনজীবী আমিরুল ইসলাম ইমন প্রতিদ্বন্দ্বীতা করছেন।

নির্বাচন কমিশনে মেয়রপদে প্রার্থীদের হলফনামায় দাখিল তথ্য ঘেঁটে ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

রফিকুল ইসলাম রফিক: মেয়র পদে আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী কাঞ্চন পৌর যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলাম। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ ৪টি মামলা রয়েছে। এর হত্যাসহ দুটি মামলা বর্তমানে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষীগ্রহণের পর্যায়ে বিচারাধীন রয়েছে। অপর দুটি মামলা নিস্পত্তি ও খালাস দেখানো হয়েছে। হলফনামায় আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী শিক্ষাগত যোগ্যতা উল্লেখ করেছেন ‘স্বশিক্ষিত’। পেশার বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন, ‘ইন্সপায়ার প্রোপার্টিজ ডেভেলপমেন্ট লিমিটেড’ পরিচালক। ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।

রূপগঞ্জ থানার নথি অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে কাঞ্চন পৌরসভার কেন্দুয়ার টেক এলাকায় রফিকুল ইসলাম ও তার লোকজন দা দিয়ে মোক্তার হোসেনকে (৩৮) কুপিয়ে হত্যা করে। মোক্তার হোসেন হত্যা মামলায় রফিকুল অভিযোগ ভুক্ত আসামী রফিকুল ইসলাম।

এছাড়া রফিকের বিরুদ্ধে ২০১২ সালের ৬ আগষ্ট রাতে রূপগঞ্জ থানার কাঞ্চন পূর্বপাড়ার বাড়ীতে তাঁর মায়ের সামনে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় রাসেলকে। ছেলেকে বাঁচাতে এগিয়ে এলে তার মা শামসুন্নাহার নীলাকে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করা হয়। ওই মামলায়ও রফিক অভিযোগ ভুক্ত আসামী। আজো নীলা বেগম ছেলে হত্যার বিচার পাননি।

রফিকুলের বাবা মৃত হারুন মিয়া শ্রমিক ছিলেন। রফিক নিজেও শুরুতে তাঁতের কারখানায় শ্রমিক হিসাবে কাজ করতেন। পরে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, মানুষের জমি বালুসহ নানাভাবে সে অবৈধ কোটি কোটি টাকার মালিক হন। রফিকের অপর ৪ ভাইয়ের বিরুদ্ধে মাদক, জমি দখল,অস্ত্র কেনাবেচা চাঁদাবাজিসহ নানা অভিযোগ রয়েছে। রফিকুলের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ছাড়াও নানা অপকর্মের বিরুদ্ধে অর্ধ শতাধিক সাধারণ ডায়েরী আছে। ‘ফাইভ স্টার‘ সিন্ডিকেট চক্র নামে পরিচিত এই সন্ত্রাসী গ্রুপের প্রধান রফিক।

২০১৪ সালের ২৮ জুন বিগত কাঞ্চন পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র প্রার্থী ছিলেন রফিক। নির্বাচনের দিন সকালে রফিক ও তার লোকজন ভোট কেন্দ্রে সহিংসতা চালালে এতে সুকমল নামে এক ভোটার নিহত হন। এবারের নির্বাচনেও রফিক ও তার লোকজন প্রভাব বিস্তার ও সহিংস ঘটনা ঘটাতে পারে বলে আশঙ্কা ভোটারদের।

এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রচার-প্রচারণায় কোন বাধা পাচ্ছি না। ভোটারদের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। হত্যা মামলা ও তার পরিবারের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলের গ্রুপিংয়ের কারণে রাজনৈতিকভাবে তাকে হত্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ কারণে নির্বাচনে কোন প্রভাব পড়বে না। গত নির্বাচনে পরাজয় প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রস্তুতি না থাকায় ওই নির্বাচনে হেরেছিলাম। এবারের নির্বাচনে মোট ভোট প্রাপ্তির ৭৫ শতাংশ ভোট তিনি পাবেন বলে দাবি করেন।

দেওয়ান আবুল বাশার বাদশা: বিএনপির বিএনপি দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী বর্তমান কাঞ্চন পৌরসভা মেয়র ও কাঞ্চন পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান আবুল বাশার বাদশা হলফনামায় ৪টি মামলা থাকার তথ্য উল্লেখ করেছেন। বিস্ফোরণদ্রব্য আইনে দুটি মামলা আদালতে বিচারাধীন ও জামিনে রয়েছে। অপর দুটি মামলা খালাস ও নিষ্পত্তি দেখানো হয়েছে। শিক্ষাগত যোগ্যতা সাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন। পেশা সানি ট্রেডার্স ইট, বালু, সিমেন্ট, রড ব্যবসায়ী। তার নগদ কোন টাকা নেই। ব্যবসা থেকে বার্ষিক আয় ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছে।

এ বিষয়ে দেওয়ান আবুল বাশার বাদশা বলেন, মাইকিং করতে পারছে না আমার লোকজন। আমার পক্ষের লোকজনকে নানাভাবে হুমকি ধামকি দেয়া হচ্ছে। নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ৪টি খুন, জোর করে মানুষের জমি বালু ভরাটসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকান্ডের অভিযোগ রয়েছে।

তিনি বলেন, সুষ্ঠু ভোট হলে এবারও জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী। গত ৫ বছরে রাস্তাঘাট, পার্ক, কিচেন মার্কেট, জলাবদ্ধতা নিরসনে, পয়: নিস্কাশন, তিন তলা পৌর ভবন নির্মাণসহ ৫০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ করেছি।

মজিবুর রহমান ভুঁইয়া: কাঞ্চন পৌরসভার প্রথম নির্বাচিত সাবেক মেয়র কাঞ্চন পৌর বিএনপির সহ-সভাপতি মজিবুর রহমান ভুঁইয়া শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি। তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দুটি মামলা জেলা ও দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন। হত্যাসহ অপর তিনটি মামলা নিষ্পত্তি দেখানো হয়েছে। পেশা মেসার্স আলিফ পোল্ট্রি ফার্ম বর্তমানে বন্ধ, মার্ল টেক্সটাইল এন্ড ফেব্রিক্স নরসিংদীতে পরীক্ষামূলক চালু অবস্থায় দেখানো হয়েছে। কৃষিখাত থেকে তার বার্ষিক আয় ১৫ হাজার টাকা, ব্যবসা থেকে ৪ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।

তবে মজিবুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, নির্বাচনে সরকারী দলের লোকজন প্রভাব বিস্তার ও হুমকি ধামকি দিচ্ছে। প্রচার প্রচারণায় বাধা পাচ্ছি। যেখানেই যাচ্ছি ভোটারদের সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা ভোট দিতে পারলে আমার জয় সুনিশ্চিত হবে। দলে অপর প্রার্থী নির্বাচনে কোন ফ্যাক্টর হবে না বলে তিনি জানান।

একেএম আমিরুল ইসলাম: অ্যাডভোকেট আমিরুল ইসলাম ইমন জেলা যুবদলের সহ-সভাপতি। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মেয়র পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। একেএম আমিরুল ইসলাম শিক্ষাগত যোগ্যতা এম.এ এল.এল.বি। বিস্ফোরকদ্রব্য ও বিশেষ ক্ষমতা আইনে তার বিরুদ্ধে মোট ৬টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে তিনটি মামলা অভিযোগপত্র শুনানী এবং হাজিরা পর্যায়ে রয়েছে। অপর দুটি মামলা অব্যাহতি ও খালাস দেখানো হয়েছে। তার পেশা আইন পেশা, ঢাকা জর্জ কোর্ট। আইন পেশা থেকে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা।

এ ব্যাপারে আমিরুল ইসলাম সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ ও ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

প্রসঙ্গত, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভা নির্বাচনে আওয়ামীলীগ দলীয় মেয়র পদ প্রার্থীসহ ৪ মেয়র প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া ৯টি ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে ৩৩ জন ও সংরক্ষিত কাউন্সিল পদে ৬ প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ১০ জুলাই প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ এবং আগামী ২৫ জুলাই ভোট গ্রহণ। এ পৌরসভায় মোট ভোটার ৩৫ হাজার ৬শ ৭৫ জন। তার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৮ হাজার ১শ ৮৫ জন ও মহিলা ভোটার ১৭ হাজার ৫শ জন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও