হাফিজুলের বিরুদ্ধে মামলায় প্রতিক্রিয়াহীন বামজোট

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪১ পিএম, ২৩ জুলাই ২০১৯ মঙ্গলবার

হাফিজুলের বিরুদ্ধে মামলায় প্রতিক্রিয়াহীন বামজোট

গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধির প্রতিবাদে ৭ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা হরতালে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পুলিশের দায়ের করা মামলার একমাত্র আসামী ছিলেন সিপিবির জেলা সভাপতি হাফিজুল ইসলাম। এ মামলায় ইতোমধ্যে জামিন পেলেও মামলার বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়নি জোটের অন্যান্য নেতৃবৃন্দরা।

গত ৭ জুলাই বাম গণতান্ত্রিক জোটের ডাকা আধাবেলা হরতালে পিকেটিং করেন বাম জোটের নেতাকর্মীরা। এসময় কয়েকটি গাড়ি, অটোরিক্সা ভাংচুর ও কয়েকটি গাড়িকে বাধা দেয়ার চেষ্টা করেন তারা। হরতালের সময় পুলিশ বাধা দিলেও তাতে পিছপা না হয়ে ধস্তাধস্তি করে মিছিল চালিয়ে যান। পরবর্তীতে বেলা বাড়ার সাথে সাথে পুলিশের বাধায় বাম জোটের নেতারা রাজপথ থেকে সড়ে গিয়ে ২নং রেলগেইট এলাকায় হরতালের সমর্থনে সমাবেশ অব্যাহত রাখেন।

হরতালের প্রায় ৬ দিন পড়ে ১৩ জুলাই সদর মডেল থানার পিএসআই আশাদুর রহমান বাদী হয়ে হাফিজুলের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেন। দেরিতে মামলা করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, জড়িত আসামিদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহ ও গ্রেফতারের চেষ্টা করে ঘটনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় এজাহার দায়ের করতে দেরি হয়।

মামলায় মামলায় ২১ জুলাই দুপুরে উচ্চ আদালতের বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম এর হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানী শেষে হাফিজুল ইসলামকে জামিন প্রদান করেন। পরে তিনি আদালতের জামিনের কপি জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে উপস্থাপন করেন।

তবে হরতালে বামজোটের নেতা হিসেবে হাফিজুল ইসলাম মামলা আসামী হলেও কোন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে দেখা যায়নি অন্যান্য দলের পক্ষ থেকে। জোটের অপর দুই বৃহৎ দল গনসংহতি আন্দোলন ও বাসদের কোন নেতা জোটের পক্ষে পাঠাননি কোন প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি কিংবা কোন দলীয় প্রতিবাদ লিপি। হকার ইস্যুর মত জোটের ইস্যুতেও তাদের এমন অবস্থান দেখে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে তবে কি হাফিজুলকে বোঝা ভাবছে বাম নেতারা ?

জোটের এক নেতা বলেন, এটি জোটের নেতাদের ব্যাপার। তারা হয়তো পড়ে কোন প্রতিবাদ বিজ্ঞপ্তি বা কর্মসূচী দিবেন। তবে কেন দেয়া হয়নি এতদিনে তা জানাতে পারছেন না তিনি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হরতালে সিপিবির সাথে গণসংহতি আন্দোলন ও বাসদের ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। কিন্তু হরতালে হাফিজুল একা মামলায় জড়ালেন এবং তার পরবর্তীতে অন্যান্য দলের প্রতিক্রিয়াহীন থাকাটা আরও বিস্ময়কর দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে।

তবে ধারণা করা হচ্ছে, হকার ইস্যুকে কেন্দ্র করে মেয়রের সাথে বাম নেতাদের সম্পর্কের অবনতির গুরু হাফিজুল। তার কারণে পুরো বাম জোট ও রাজনীতিবিদরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তারই জের ধরে যেমন হকার ইস্যুতে কাউকে কাছে পাননি হাফিজুল তেমনি মামলার শিকার হয়েও পাশে পাচ্ছেন না জোটের সহযোগীদের।

হাফিজুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জে সাম্প্রতিক হকার ইস্যুতে যে আন্দোলন হচ্ছে তাতে তিনি হকারদের পক্ষেই অবস্থান নিয়েছেন। হকার নেতাদের কাছে তিনি ‘লিডার’ হিসেবে পরিচিত। তাঁর আরেকটি বড় পরিচয় তিনি সরকার দলীয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর আত্মীয়। গত ১৪ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের বাজেট অনুষ্ঠানে হাফিজুলকে কটাক্ষ ও অভিযোগের তর্জনী রেখে বক্তব্য রাখেন মেয়র আইভী। ওই মঞ্চে তখন আইভীর পাশে এমপি বাবু বসে ছিলেন।

২১ জুলাই রোববার দুপুরে উচ্চ আদালতের বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম এর হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানী শেষে হাফিজুল ইসলামকে জামিন প্রদান করেন। পরে তিনি আদালতের জামিনের কপি জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে উপস্থাপন করেন।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ৭ জুলাই ছিল বাম গণতান্ত্রিক জোটের হরতাল। সেদিন সকাল ৮টায় অজ্ঞাত ৪০ থেকে ৫০জন শহরের ডিআইটি এফ রহমান সুপার মার্কেটের সামনে পাকা রাস্তায় সঙ্গবদ্ধ হয়ে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা লাঠিসোটা লোহার রড দিয়ে গতিরোধ করে একটি অটোরিকশার ভাঙচুর ও অগ্নি সংযোগ করে। এসময় পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রনে চেষ্টা করলে পুলিশের কাজে বাধা প্রদান করে এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে এলোপাথারী ইট পাটকেল নিক্ষেপ করে। পরে অতিরিক্ত পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলে দ্রুত পালিয়ে যায়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে ৩টি ইটের টুকরা, কয়েকটি ভাঙা কাচের টুকরা জব্ধ করা হয়। আর এসব কিছু সিপিবি জেলার সভাপতি হাফিজুল ইসলামের নেতৃত্বে করা হয়।

ঘটনায় ১৩ জুলাই সদর মডেল থানার পিএসআই আশাদুর রহমান বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। দেরিতে মামলা করার বিষয়ে উল্লেখ করা হয়, জড়িত আসামিদের নাম, ঠিকানা সংগ্রহ ও গ্রেফতারের চেষ্টা করে ঘটনার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে থানায় এজাহার দায়ের করতে দেরি হয়।

৭ জুলাইয়ের ঘটনার পরদিন ৮ জুলাই সন্ধ্যায় শহরের চাষাঢ়ায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যার বিচার দাবিতে বক্তব্য রাখেন হাফিজুল ইসলাম।

পরে ১১ জুলাই সকাল সাড়ে ১১টায় চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে হকার পুনর্বাসনের দাবিতে শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ ও বিক্ষোভ মিছিল বের করে যার নেতৃত্বে ছিলেন হাফিজুল। পরে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয় সেখানেও তিনি চিলেন।

১৪ জুলাই বিকেলে চাষাঢ়া কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশে অংশগ্রহণ করেন হাফিজুল।

১৩ জুলাই সকালে চাষাঢ়ায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে ‘নদীর জায়গা অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করে খাল হত্যা ও নদী দূষণ করা চলবে না’ লেখা ব্যানারে নারায়ণগঞ্জ পরিবেশ আন্দোলনের মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন হাফিজুল। ২০ জুলাই সকালে শহরের মাসদাইর শ্মশানে কমরেড হেনা দাসের মৃত্যুবার্ষিকী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় যার নেতৃত্বে ছিলেন তিনি।

২১ জুলাই সকালে প্যারাডাইস গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিষদের দাবিতে সমাবেশ ও মিছিল করে হাফিজুলের নেতৃত্বে। ২১ জুলাই দুপুরে হোসিয়ারী শ্রমিক ইউনিয়নের নির্বাচেন আব্দুল হাই শরীফ ও শাজাহান প্যানেলের নির্বাচনী মিছিল করেন। সেখানেও ছিলেন হাফিজুল।

এসব কর্মসূচির মধ্যে শহীদ মিনারের অনুষ্ঠিত অনুষ্ঠানগুলো হয়েছে পুলিশের সদস্যদের সামনেই। কারণ চাষাঢ়া সার্বক্ষনিক নিরাপত্তায় পুলিশের একটি টিম টহল দেন। এছাড়াও বঙ্গবন্ধু সড়কে মিছিল করলে ২নং রেল গেইট এলাকায় পুলিশের একটি বক্সই রয়েছে। এছাড়াও নিরাপত্তা সহ বিভিন্ন কর্মকা-ে নিরাপত্তা অতিরিক্ত পুলিশের টহল রয়েছেই।

এতো কিছুর পরও পুলিশ হাফিজুল ইসলামকে গ্রেফতার করতে পারেনি কেন জানতে চাইলে সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, মামলায় হাফিজুল ইসলামের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তার নাম সম্পর্কে স্থানীয় জনগন জানিয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখনও সন্দেহ রয়েছে। সেহেতু বিষয়টি এখন তদন্ত চলছে তাই তাকে গ্রেফতার করা হয়নি।

তিনি বলেন, অপরাধী যেই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে। অভিযোগ ও তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে আমরা অবশ্যই হাফিজুল ইসলামকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসবো।

এদিকে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন জানান, নারায়ণগঞ্জে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ বিগত দিনে যখনই হরতার আহবান করেছিলেন তখন পুলিশের মামলার আগেও অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কিন্তু ঘটনার ৭দিন পর মামলাও বেশ রহস্যাবৃত।

সিপিবি কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মন্টু ঘোষের বরাত দিয়ে হাফিজুল ইসলাম জানান, বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম এর হাইকোর্ট বেঞ্চে শুনানী শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেয়া পর্যন্ত জামিন দেয়া হয়। পরে ওই জামিনের কপি পুলিশ সুপার কার্যালয়ে উপস্থান করা হয়।

হাফিজুল ইসলাম বলেন,  গরীব ও শ্রমজীবী মানুষের জন্য সব সময় আন্দোলন করি। মানুষের দাবি জন্য সংগ্রাম করি এসব কারণেই এ মিথ্যা মামল দেয়া হয়েছে। যে মামলা দেয়া হয়েছে সেদিন এমন কোন ঘটনাই ঘটেনি। কোন প্রকার বিশৃঙ্খলা ছাড়া শান্তিপূর্ণ ভাবে হরতাল পালন করা হয়। কারণ আমরা গাড়ি ভাঙচুর কিংবা রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মানুষকে হরতাল পালনে বাধা করার পক্ষে আমরা নই। মানুষের জান মালের ক্ষতি করে আমরা ওই কর্মসূচি পালন করি না। তারপরও আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল সেজন্য উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিয়েছি।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও