দুই ক্যাডারে লাশ আর রক্ত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৪:৫৫ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৯ বুধবার

দুই ক্যাডারে লাশ আর রক্ত

নারায়ণগঞ্জ শহরের দক্ষিণাঞ্চলের আলোচিত দুইজন ত্রাসের একই নাম। একজনের হাসান। অপরজনের নাম হাসান আহমেদ। তাদের মধ্যে হাসান আহমেদ বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। অপর হাসান ইতোমধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে মারা গেছে। তবে দুই হাসান ও তাদের অনুগামীদের হাতেই রয়েছে রক্তের দাগ। দুইজনই এলাকাতে বেশ দুর্ধর্ষ হিসেবে পরিচিত।

সবশেষ ইতোমধ্যে ক্রসফায়ারে নিহত হাসান বাহিনীর হাতে নির্মম খুন হয়েছেন শাকিল নামের এক যুবক। স্থানীয়রা জানান, গত ২৭ জুলাই স্থানীয় সন্ত্রাসী চান্দু, নিক্সন, তুহিন ও তার বন্ধুরা মুখোশ পড়ে সড়কে দাঁড়িয়ে ছিলো। তখন এক ব্যাক্তি মোটর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিল। ওইসময় মোটর সাইকেলের লাইটের আলো দাড়িয়ে থাকা মুখোষধারী সন্ত্রাসীদের চোখে পড়ে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মোটর সাইকেল আরোহীর উপর প্রথমে তারা হামলা চালায় পরে আশপাশের লোকজনদেরও কোপায়।

জানা গেছে, হামলাকারিরা ক্রসফায়ারে নিহত সন্ত্রাসী হাসান বাহিনীর ক্যাডার। এই বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কামান্ড হচ্ছেন মাদকের ডিলার হিসেবে পরিচিত তুহিন। এছাড়াও রয়েছে নিক্সন, চান্দু, পাবেল, মাইকেল, ডেবিট, হিটলার, অমিসহ আরও কয়েকজন হাসান গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে আমবাগান, বাংলাবাজার, পশ্চিম দেওভোগ মাদরাসা রোডের হাসেম বাগসহ আরও কয়েকটি এলাকা। মূলত এরাই সংঘবদ্ধভাবে শনিবার রাতে হাসেম বাগের নৃশংস ঘটনাটি সংঘটিত করে। তারা রাতের বেলা ধারালো অস্ত্র নিয়ে রাস্তায় অবস্থান করে অপরাধ কর্মকান্ড করে বেড়ায়। শনিবার রাতে মটরসাইকেল নিয়ে সজিব ও সুভাষ শহর হতে নিজ এলাকায় আসার পথে সন্ত্রাসীদের চোখে মটরসাকেলের হেডলাইট পড়ে। এতে করে সন্ত্রাসী তুহিন, নিক্সন ও চান্দু গংরা তাদের হাতে থাকা ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাথারী কুপাতে থাকে। এসময় সজিব ও সুভাষকে বাঁচাতে শাকিলসহ অন্যরা এগিয়ে আসলে তাদেরকেও এলোপাথারী কুপাতে থাকে। একপর্যায়ে তুহিনের হাতে থাকা ধারালো বগি দিয়ে শাকিলকে কুপিয়ে রক্তাক্ত জখম করে। পরে শাকিলসহ অন্যদের হাসপাতালে নেয়ার পর শাকিলের মৃত্যু হয়। আর শাওনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। ইতোমধ্যে গ্রফতার চান্দু মিয়ার ২ দিনের রিমা- মঞ্জুর করেছে আদালত। একই মামলায় অপর আসামি সাব্বির আহমেদ বুলেটকে (১৮) গ্রেফতার করা হয়েছে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ৩০ জুলাই মঙ্গলবার ভোরে অভিযান চালিয়ে মুন্সিগঞ্জ থেকে তাকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা থানা পুলিশ।

এ শাকিল খুনের মধ্য দিয়ে আলোচনায় চলে এসেছে ইতোমধ্যে র‌্যাবের সঙ্গে ক্রসফায়ারে নিহত হাসান ও বাহিনী। এ বাহিনী শহরের দেওভোগ, বাবুরাইল সহ আশেপাশের এলাকা নিয়ন্ত্রন করতো। গত বছর বাহিনী প্রধান হাসান র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ক্রসফায়ারে পড়ে মারা গেলেও দাপটেই আছে ক্যাডার বাহিনী।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালের ৩ ডিসেম্বর ভোরের দিকে সদর উপজেলার শহীদ নগরের র‌্যাব-১১ এর সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী হাসান। ঘটনাস্থল থেকে চার রাউন্ড গুলিসহ একটি বিদেশী পিস্তল করে র‌্যাব। তিনটি হত্যা, তিনটি অস্ত্র, ডাকাতি ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে বিশটি মামলা ছিলো এবং সব কটি মামলায় সে পলাতক ছিলো। নিহত হাসান শহরের দেওভোগ পানির ট্যাঙ্কি এলাকার মৃত ইয়াছিন মিয়ার ছেলে। হাসানের মৃত্যুর পর এলাকাতে স্বস্তি ফিরে এসেছিল। সন্ত্রাসী হাসানের প্রতি এলাকাবাসী এতোটাই ঘৃণার অবস্থানে দাঁড়িয়েছে, তার লাশটি পর্যন্ত নিজের ঘরে ঢুকতে পারেনিা। থানা পুলিশ এ ব্যাপারে সহযোগিতার জন্য এগিয়ে এলেও এলাকাবাসীর তোপের মুখে সেখান থেকে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছে। ওই সময়ে এলাকাবাসী স্পষ্টভাবে হুশিয়ারি দেন, সন্ত্রাসী হাসানের লাশ কোনভাবেই এলাকায় প্রবেশ করতে দেয়া হবে না। বিকেলে এলাকাবাসী শান্ত হয়ে যার যার বাড়ি ফিরে গেলে হাসানের স্বজনরা আবারো লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তবে মুহূর্তের মধ্যে এ খবর ছড়িয়ে পড়তে এলাকাবাসী আবারো একত্রিত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। হাসানের লাশ দেওভোগ এলাকার গলির মুখে নিয়েও রাস্তায় ফেলে যেতে বাধ্য হয় তার স্বজনরা। পরে পুলিশ এসে লোকজনদের বুঝিয়ে শুনিয়ে শান্ত করেন।

এর আগে বাবুরাইলে খুন হন পারভেজ ও মিল্টন নামের দুই যুবক। ওই ঘটনার পর মামলায় নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির উপদেষ্টা ও বিলুপ্ত শহর কমিটির সহ সভাপতি এম এ মজিদ ও তার ভাই বিলুপ্ত শহর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আহমেদের নাম উল্লেখ করে বলা হয়, হত্যাকান্ডের ঘটনায় তাদের ইন্ধন থাকতে পারে।

ওই ঘটনায় গ্রেপ্তার মাহবুব জবানবন্দীতে স্বীকার করেছে, এলাকার প্রভাব বিস্তার নিয়ে দুটি গ্রুপ হয়েছিল। নিহত মিল্টনের গ্রুপটি আর আগের মত মজিদের কথা শুনতো না। এসব কারণে তিনি মিমাংসা করতে ব্যর্থ হয়েই মিল্টনকে হত্যার নির্দেশনা দেন। ২০১৭ সালের ১২ অক্টোবর রাতে শালিসী বৈঠকে উভয় পক্ষকে শান্ত করতে ব্যর্থ হন মজিদ। পরে তিনিই হত্যার নির্দেশ দেন। হত্যা শেষে যেন লাশ পুড়ে ফেলা হয় সেজন্য আগুন দেওয়ার কথাও বলেন। কথামত হামলাকারীরা ওই কাজটিও সারেন। মিল্টন ও পারভেজ সেখানে রাসেলের গ্যারেজে বসা ছিল। দুইজনকে কুপিয়ে হত্যার পর সেখানে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু আগুন মিল্টন ও তার সহযোগি পারভেজ পর্যন্ত পৌছানোর আগেই এলাকাবাসী সে আগুন নিভিয়ে ফেলে।

১২ অক্টোবর মিল্টনকে কুপিয়ে হত্যার চারদিন আগে বাপ্পীকে মারধর করে জখম করে মিল্টনের লোকজন। এ নিয়ে শালিসী বৈঠকও হয়। সেখানে মজিদ ওই গ্রুপের লোকজনকে বলে, ‘মারতে হলে বরিশাইল্লাদের মাইরা ফালা।’ মূলত মজিদের ওই ঘোষণার পরেই বাপ্পী সিকদার ও জাহাঙ্গীর বেপারীর লোকজন উত্তেজিত হয়ে উঠে।

মামলায় যে ২২জনের নাম উল্লেখ আছে তাদের মধ্যে দুইজন হলেন মজিদ ও হাসানের ভাগেবন শিপলু ও চাচাতো ভাই রাসেল। তাছাড়া যাদের আসামী করা হয়েছে তাদের সবার সঙ্গেই হাসান ও মজিদের সম্পৃক্ততা আছে। ২২ জনের সবাই হাসান ও মজিদ বাহিনীর ক্যাডার হিসেবেই পরিচিত। আসামীদের বেশীরভাগের বাড়ি বাবুরাইল ও ভূইয়াপাড়া এলাকাতে যে এলাকাগুলো মূলত হাসান ও মজিদ নিয়ন্ত্রন করে থাকে।

আসামীরা হলো এক নং বাবুরাইলের শুক্কুর মিয়ার বাড়ির ভাড়াটিয়া জয়নাল আবেদীনের ছেলে জাহাঙ্গীর বেপারী (৪০), ১নং বাবুরাইল তারা মসজিদ এলাকার কাজল মিয়ার ছেলে বাপ্পী (২৮), রবিন (৩০), রকি (২৮), ভূইয়াপাড়া এলাকার মজনু মিয়ার ছেলে আমান (৩২), বাবুরাইল শেষমাথা এলাকার খোকা মিয়ার ছেলে শহিদ (৩০), বাবুরাইল তারা মসজিদ এলাকার আসলাম (৫০), বাবুরাইল ঋষিপাড়া এলাকার মৃত জাকিরের ছেলে মাহাবুব (৩০), বিএনপি নেতা হাসান আহমেদের ভাতিজা শিপলু (৩০) ও রাসেল (৩৩), বাবুরাইল এলাকার মুক্তা (২৮), পাইকপাড়া জিমখানা ডিমের দোকান এলাকার শরীফ (৩৩), বাবুরাইলের রানা (২৮), বাবুরাইলের কিরণ (৩০), মানিক (৩০), বাবুরাইলের আবদুল মান্নানের ছেলে ফয়সাল (২৬), বন্দর এলাকার রাব্বি (৩০), ১নং বাবুরাইলের নিলু সরদারের ছেলে সোহাগ (৩২), বাবুরাইল শেষমাথা এলাকার রাকিব (২৭), বাবুরাইল ঋষিপাড়া এলাকার সিরাজ মিয়ার ছেলে রাজন (৩০), বাবুরাইল এলাকার রিক্সা আবুল (৩৫), একই এলাকার ফরহাদ (৫২) সহ অজ্ঞাত আরো ১শ থেকে ১২৫ জন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও