উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে হেলিকপ্টার হুজুরের অনুসারীরা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৩ পিএম, ১৮ আগস্ট ২০১৯ রবিবার

উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপাতে হেলিকপ্টার হুজুরের অনুসারীরা

অবৈধভাবে জমি দখলের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছে রেলওয়ে। অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগের দায়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। গার্মেন্টে হামলা চালানোর অভিযোগে মামলা দায়ের করেন গার্মেন্টটির ম্যানেজার। অথচ নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টায় এবার নারায়ণগঞ্জ রাইফেলস ক্লাবের শ্যুটিং সম্পাদককে সন্ত্রাসী ও জামায়াতের দোসর আখ্যায়িত করে মানববন্ধন করেছেন হেলিকপ্টার হুজুর হিসাবে খ্যাত জৈনপুরী পীরের অনুসারীরা। এছাড়া ওই মানববন্ধন থেকে সরকারের প্রতিও কঠোর হুশিয়ারী উচ্চারণ করে জৈনপুরী অনুগামীরা। অথচ জৈনপুরী পীরের এক ভাই জামায়াতের নাশকতা মামলায় গ্রেফতার হয়েছিল অপর ভাই সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের দায়ে অভিযুক্ত।

রোববার ১৮ আগষ্ট সকালে নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাব প্রাঙ্গনে জৈনপুরী পীর অনুগামীদের মানববন্ধনে ব্যাপক সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে।

জানা গেছে, ২২ ফেব্রুয়ারী দুপুরে নারায়ণগঞ্জ শহরের নবীগঞ্জ ফেরিঘাট এলাকায় দু’টি লঞ্চে নাশকতার উদ্দেশ্যে গোপন বৈঠক চলাকালে জৈনপুরী পীর এনায়েতউল্লাহ আব্বাসীর বড় ভাই সৈয়দ ইমদাদ উল্লাহ আব্বাসীসহ জামায়াত ও শিবিরের ১০ নেতা-কর্মীকে আটক করে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

২৫ এপ্রিল রাতে জৈনপুরী পীর এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর ছোট ভাই নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসীসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত দেড়শ জনের বিরুদ্ধে এইচ এন এপারেলস লিমিটেড নামের গার্মেন্টের কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিন বাদি হয়ে ভাংচুর ও লুটপাটের অভিযোগে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার বিবরনীতে উল্লেখ করা হয়, বৃহস্পতিবার ২৫ এপ্রিল রাত ১২টার দিকে সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকায় জৈনপুরী পীর এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর ছোট ভাই নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসীর নেতৃত্বে আমির উদ্দিন, মঞ্জুর রহমান, হাসানুর রহমান, ইমরান হোসেন, ফয়সাল, কাউসার, চঞ্চল, রাব্বি, শিবলু, রোমানসহ অজ্ঞাত ১৫০ জন দলবদ্ধভাবে লাঠি, লোহার রড, বল্লম, শাবল, হ্যামার নিয়ে এইচ এন এপারেলস লিমিটেডের টিনশেড বিল্ডিংয়ের প্রিন্ট ফ্যাক্টরীর দেয়াল ভেঙ্গে ভেতরে প্রবেশ করে কারখানার ১০ লাখ টাকা ক্ষতিসাধন ছাড়াও কারখানার অভ্যন্তরে থাকা প্রিন্টিং কেমিক্যাল, প্রিন্টিং মেশিন, কিউরিং মেশিন, কার্টুন রোলসহ ১০ লাখ টাকা মূল্যের সামগ্রী লুটে নিয়ে যায়। এসময় হামলাকারীরা ফ্যাক্টরী ছেড়ে না গেলে কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রাণনাশের হুমকী দেয়।

এদিকে ওই ঘটনার পরে জৈনপুরী পীর এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর ছোট ভাই নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসীর অস্ত্র হাতে একটি ছবি ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে পড়ে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে অস্ত্র দু’টি উদ্ধার করলেও সেটি ছিল খেলনা পিস্তল। তবে ওই ছবিটি নিজ বাড়িতে বাধাই করে রেখে জনমনে ভীতির সঞ্চার করতো নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসী।

২৯ এপ্রিল রাতে মারকাজুল তাহরিকে খতমে নবুওয়্যাত কারামাতিয়া মাতলাউল উলুম মাদরাসার খতমে বুখারীর অনুষ্ঠানে এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী সাংবাদিকদের নিয়ে বিভিন্ন কটুক্তিমূলক ও আপত্তিকর বক্তব্য রাখেন।

২২ মে জৈনপুরী পীরের বাড়ীতে নারায়ণগঞ্জ তিতাস গ্যাস অফিসের সেলস্ ম্যানেজারের নেতৃত্বে একটি দল অভিযান চালিয়ে অবৈধ গ্যাস লাইন উদঘাটন করে। এসময় তাদের অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করাসহ ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ।

২৬ মে নারায়ণগঞ্জ তিতাসের উপ-মহাব্যবস্থাপক বরাবর দুই শতাধিক এলাকাবাসীর স্বাক্ষরিত স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, পাঠানটুলীতে অবস্থিত জৈনপুরী পীর হিসেবে পরিচিত এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর বাড়িতে গত ১০ বছর ধরে গ্যাস চুরি চলছিল। ধর্মে কোন বিধান নাই রাষ্ট্রীয় সম্পদ প্রাকৃতিক গ্যাস চুরি করা। একজন চিহ্নিত গ্যাস চোর কখনো মসজিদে বয়ান করতে পারে না। ধর্মের লেবাস লাগিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ গ্যাস চুরিসহ জৈনপুরীর সকল অপকর্মের বিচার চায় এলাকাবাসী।

২৬ জুলাই জৈনপুরী পীরের বাহিনীর ক্যাডাররা পূর্বশত্রুতার জের ধরে এলাকাবাসীর উপর হামলা চালায়। এঘটনায় পাঠানটুলী এলাকার গোলজার হোসেন ভূঁইয়া বাদি হয়ে জৈনপুরী পীরের ক্যাডারদের বিরুদ্ধে ২৭ জুলাই সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা (নং- ৭২(০৭)১৯) দায়ের করেন।

গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা বিভাগীয় এস্টেট অফিসের কানুনগো ইকবাল মাহমুদ বাদী হয়ে দায়েরকৃত মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, সিদ্ধিরগঞ্জের পাঠানটুলী এলাকার মৃত নাছির উল্লাহ আব্বাসীর ছেলে অভিযুক্ত এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী (জৈনপুরী পীর), ওবায়েদ উল্লাহ আব্বাসী ও নেয়ামত উল্লাহ আব্বাসী অবৈধ ও বেআইনী ভাবে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন হাজীগঞ্জ লেভেল ক্রসিং সংলগ্ন রেললাইনের পূর্ব পাশের্^ গোদনাইল মৌজায় রেলওয়ের ভূমিতে অবৈধভাবে মাটি ভরাট করে সেমিপাকা কাঠামো নির্মাণ করছেন। তাদের এই অবৈধভাবে কাঠামো নির্মাণ কাজে স্থানীয়ভাবে বাধা প্রদান করা হলেও তারা বাধা উপেক্ষা করে অবৈধভাবে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। এছাড়াও এক বছর পূর্বে তারা রেলওয়ের ভূমিতে অবৈধভাবে টিনশেড মার্কেট নির্মাণ করেছেন। সরকারী রেলওয়ে সম্পত্তি দখল ও আতœসাৎ এর অপরাধে দন্ডবিধি অনুযায়ী ফৌজদারি মামলা দায়ের করার অনুরোধে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলাটি (নং-৭১) রুজু হয়। উল্লেখ্য রেলওয়ের জমিটি জৈনপুরী পীর এনায়েতউল্লাহ আব্বাসী অবৈধ ভাবে মাটি ভরাট করার ফলে পানিরকল ও হাজীগঞ্জ এলাকার প্রায় ১০ হাজার মানুষ দীর্ঘ ১০ বছর যাবত বর্ষাকালে জলাবদ্ধতার মধ্যে বসবাস করেন।

এলাকাবাসী অভিযোগ করেন, ভন্ড পীর এনায়েত উল্লাহ আব্বাসী ওরফে জৈনপুরী পীর ও তার ভাইদের অত্যাচারে পাঠানটুলীসহ আশেপাশের এলাকার লোকজন অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে। তারা অবৈধভাবে রেলওয়ের জমি মাটি ভরাট করার ফলে পানিরকল ও হাজীগঞ্জ এলাকায় অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। সামান্য বৃষ্টিপাত হলে এলাকার অনেকের বসতঘর পর্যন্ত পানিতে তলিয়ে যায়। এছাড়াও জৈনপুরী পীর রেলওয়ের জমিতে অবৈধভাবে মার্কেট নির্মাণ করে প্রতিমাসে মোটা অংকের ভাড়া আদায় করছে। তাদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে কথা বলাতে এনায়েত উল্লাহর তৈরী করা লাঠিয়াল বাহিনীর হাতে এলাকার অনেকেই নাজেহাল হয়েছে।

এদিকে জৈনপুরী পীর ও তার সহোদরদের বিরুদ্ধে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ মামলা দায়ের করলেও উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টায় এবার সরকারকে হুশিয়ারী দিতেও কার্পন্য করেনি হেলিকপ্টার হুজুর হিসাবে খ্যাত জৈনপুরী পীরের অনুগামীরা। মুন্সিগঞ্জ, গজারিয়া ও দাউদকান্দি এলাকার কতিপয় আলেমকে দায়েরকৃত মামলা সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে ও জৈনপুরীর মাদরাসার ছাত্রদের নিয়ে রোববার সকাল ১১ টায় নারায়ণগঞ্জ প্রেসক্লাবের সামনে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। যাতে নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের শ্যুটিং সম্পাদককে চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও জামায়াতের দোসর হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। অথচ ইমরুল কায়েসের বিরুদ্ধে কোন মামলা পর্যন্ত নেই। তিনি কোন রাজনীতির সঙ্গেও সম্পৃক্ত নন। তাকে এলাকাবাসী একজন সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই চেনে। নারায়ণগঞ্জ রাইফেল ক্লাবের সভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক, সহসভাপতি হিসেবে পদাধিকার বলে পুলিশ সুপার এবং নির্বাচিত সেক্রেটারী হিসেবে নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাষ্ট্রিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল রয়েছেন।

এ বিষয়ে ইমরুল কায়েস বলেন, আমি নিশ্চিত যারা এখানে উপস্থিত হয়ে আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন উসকানিমূলক কথা বলেছেন তারা আমাকে কখনোই দেখেননি, চিনেন না। তারা কেন আমাকে টার্গেট করে বক্তব্য দিলো তা আমার বোধগম্য হচ্ছেনা। এনায়েত উল্লাহ আব্বাসীর বিরুদ্ধে আমি কোনো মামলা দায়ের করি নাই। তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জের পানিরকল এলাকার একটি গার্মেন্টে হামলার অভিযোগে ওই গার্মেন্টের কর্মকর্তা বাদি হয়ে মামলা করেছেন এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের জমি দখলের অভিযোগে রেলওয়ের কানুনগো বাদি হয়ে ওই পীরের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন বলে শুনেছি। সরকারী সম্পত্তি দখলের অভিযোগে সরকারী কর্মকর্তা মামলা করেছেন, সেখানে আমাকে জড়ানোর উদ্দেশ্য প্রনোদিত বলে মনে করছি। আমি এ বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।


বিভাগ : মহানগর


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও