প্রশ্নবিদ্ধ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৩৭ পিএম, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার

প্রশ্নবিদ্ধ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ

কমিটি ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই একের পর এক বিতর্কিত কর্মকান্ডে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ। দলীয় কর্মসূচি থেকে শুরু করে তাদের অধীনে থাকা বিভিন্ন কমিটি গঠন প্রক্রিয়ায় কোন কিছুতেই বিতর্ক এড়িয়ে চলতে পারছে না নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ। তাদের কর্মকান্ডে কোনভাবেই যেন সন্তুষ্ট হতে পারছে না জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। প্রত্যেকবারই কোন না কোনভাবে তারা বিতর্কে জড়িয়েই যাচ্ছেন। আর এসকল ঘটনায় বার বার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ। সবশেষ জেলা আওয়ামী লীগের অধীনে থাকা সোনরগাঁ আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি নিয়েও প্রশ্নবিদ্ধের মুখে পড়েছে জেলা আওয়ামী লীগ।

সূত্র বলছে, দীর্ঘ এক যুগেরও বেশি সময় পরে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর ৩ সদস্য বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের কমিটির ঘোষণা দেয়া হয়। এতে আবদুল হাইকে সভাপতি, নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীকে সহ-সভাপতি এবং আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। এই ঘোষণার এক বছর পর সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর ৭৪ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির অনুমোদন দেয়া হয়। কেন্দ্র থেকে অনুমোদন দেয়া এই কমিটিতে খালি থেকে যায় ৫টি পদ। এছাড়া আনুষ্ঠানিকভাবে কমিটি ঘোষণার আগেই একজনের মৃত্যু ঘটে।

এর মধ্যে সহ সভাপতি, কৃষি ও সমবায় বিষয়ক সম্পাদক, সম্পাদক পদে ১ জন করে ও ২ জন সদস্য পদ খালি রয়েছে। তবে কমিটি ঘোষণার করার আগে সহ সভাপতি পদে আসীন হওয়া হকি তারকা খাজা রহমতউল্লাহর মৃত্যুতে আরো একটি পদ শূন্য হয়। এছাড়া শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক কাওসার আহমেদ পলাশ জেলা আওয়ামীলীগের শ্রম বিষয়ক সম্পাদক পদ থেকে ও কোষাধ্যক্ষ পদে মনিরুজ্জামান মনির পদত্যাগ করেছেন। ফলে বর্তমানে খালি রয়ে গেছে মোট ৮ টি পদ।

জানা যায়, এই ৮ টি পদ খালি নিয়ে মাসের পর মাস অতিবাহিত হতে থাকলেও নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ তা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। দফায় দফায় মিটিং করেও জেলা আওয়ামী লীগের খালি পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়নি। সর্বশেষ এ নিয়ে সভাপতি আব্দুল হাই, সিনিয়র সহ সভাপতি ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলকে ৩ সদস্য বিশিষ্ট একটি কমিটি হলেও তা আর আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে জেলা আওয়ামী লীগের খালি পদের বিষয়টি ডীপ ফ্রিজে চলে গেছে। যা জেলা আওয়ামী লীগের জন্য ব্যর্থতা হিসেবেই বিবেচিত হয়।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের কমিটি হওয়ার দীর্ঘদিন পেরিয়ে গেলেও তাদের অধীনে থাকা কমিটিগুলো গঠন করতে পারেনি। দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ আগের করা কমিটি দিয়ে চলে আসছিল থানা কমিটিগুলোর কার্যক্রম। আর এসকল কমিটিগুলো সভাপতি আর সাধারণ সম্পাদকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। আবার কোনটির ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে বছরের পর বছর। ফলে ক্ষমতায় থেকেও তৃণমূল পর্যায়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগ গতি ফিরে পাচ্ছিল না।

যার সূত্র ধরে সাম্প্রতিক সময়ে নেতাকর্মীদের বহুল আলোচনা সমালোচনার মুখে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের অধিনে থাকা থানা আওয়ামী লীগের কমিটিগুলো ঘোষণা করার উদ্যোগ নেয়া হয়। সেই লক্ষ্যে গত ১৩ জুলাই ২ নং রেলগেইট আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই সভায় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ১৬ তারিখ এবং আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন ১৯ তারিখ ঘোষণা করা হয়।

সম্মেলনের এই তারিখ নির্ধারণেও বর্ধিত সভায় নেতাদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদের মতামত ছিল, প্রথমে ওয়ার্ড কমিটি গঠন করতে হবে। আর এই ওয়ার্ড কমিটি গঠন করবে ইউনিয়ন কমিটি। এরপর ইউনিয়ন কমিটি করতে হবে, ইউনিয়ন কমিটি করবে থানা কমিটি। এই দুই স্তরের কমিটি সম্পন্ন হলে জেলা আওয়ামী লীগ থানা কমিটি গঠন করে দিবে। কিন্তু এই মতামতকে প্রাধান্য দেননি সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। তারা স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতাদের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়ে সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা দিয়ে দেন। ফলে এই সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট হতে পারেনি জেলা আওয়ামী লীগের অনেক নেতাই।

বর্ধিত সভায় সম্মেলনের তারিখ ঘোষণা অনুসারে রূপগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। গত ১৬ জুলাই সম্মেলনের মাধ্যমে রুপগঞ্জ থানা কমিটিতে সভাপতি পদে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর ও সাধারণ সম্পাদক পদে শাহজাহান ভূঁইয়া রয়েছেন। যিনি এর আগেও থানা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদে ছিলেন। আর গোলাম দস্তগীর গাজী টানা তিনবারের এমপি এবং সর্বশেষ মন্ত্রীও হয়েছেন। তারপরেও তিনি রূপগঞ্জ থানা আওয়ামীলীগের সভাপতির পর আকড়ে রেখেছেন। আর এতে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলও দ্বিমত পোষণ করেনি। কিন্তু এ বিষয়টিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বাঁকা চেখে দেখেন। তারা এ বিষয়টি নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি বাধা হিসেবেই বিবেচনা করছেন। ফলে গোলাম দস্তগীর গাজীর প্রভাব বিস্তারের ফলে রূপগঞ্জ আওয়ামী লীগে মতবিরোধ দেখা দেয়।

এরপর গত ২২ জুলাই আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে সভাপতি হিসেবে নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু নির্বাচিত হয়েছেন। রূপগঞ্জে সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা হলেও আড়াইহাজার সাধারণ সম্পাদকের নাম ঘোষণা করা হয়নি। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও তিনবারের এমপি হয়েছেন থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি। ফলে আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়েও তৃণমূলে অনেক আলোচনা সমালোচনা রয়েছে। আড়াইহাজারেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এ বিষয়টিকেও নেতৃত্ব সৃষ্টির বাধা হিসেবে বিবেচনা করছেন। সেই সাথে চিরদিন নেতৃত্ব ধরে রাখায় বিষয়টি তাদের মাঝে ফুটে উঠেছে।

যারা ধারাবাহিকতায় সাম্প্রতিক সময়ে রূপগঞ্জ ও আড়াইহাজার থানা আওয়ামী লীগের একটি অংশ গোলাম দস্তগীর গাজী ও নজরুল ইসলাম বাবুর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে অভিযোগ করে আসছেন। তারা গোলাম দস্তগীর গাজী ও নজরুল ইসলাম বাবুর আজীবন নেতৃত্ব ধরে রাখার বিষয়টিকে মেনে নিতে পারছেন না।

এদিকে জেলা আওয়ামী লীগের ওই বর্ধিত সভায় আওয়ামীলীগের অন্যান্য থানা কমিটিগুলো আগষ্টের পরে ঘোষণা দেয়ার কথা থাকলেও হঠাৎ করে কাউকে না জানিয়েই সোনারগাঁ থানা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়। গত ১৫ জুলাই এ কমিটির অনুমোদন দেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই এবং সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। যে কমিটিতে সামসুল ইসলাম ভূইয়া আহবায়ক এবং সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমানকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে। অথচ এই কমিটি গঠন উপলক্ষে কমিটি গঠন উপলক্ষ্যে কোনো বর্ধিত সভা কিংবা সম্মেলনও হয়নি। সেই সাথে জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাদেরকেও এ বিষয়ে কোনো অবগত করা হয়নি। ফলে এ বিষয়টিকে জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দরা মেনে নিতে পারেন নি।

যার সূত্র ধরে এই কমিটির প্রতি অনাস্থা জানিয়ে ৭৪ সদস্য বিশিষ্ট জেলা আওয়ামী লীগের কমিটির মধ্যে ৩৮ জন স্বাক্ষরিত একটি অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাথে সাক্ষাৎ ও জমা দিয়েছেন। যেখানে স্বাক্ষর রয়েছে জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, সহ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী, সদস্য ও নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী ও নারায়ণগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল্লাহ আল কায়সার হাসনাতের মতো প্রভাবশালী নেতাদের। সেই সাথে তারা কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে অভিযোগও করে আসছেন।

অন্যদিকে সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে বিদ্রোহের পর এবার মল্লযুদ্ধের ঘটনাও ঘটেছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর জামপুর ইউনিয়নের সম্মেলনকে ঘিরে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা কর্মীদের বাধার মুখে পড়তে হয়েছে। আর এই জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই। আর এসকল কর্মকান্ড নিয়ে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ।

যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতার এই বক্তব্যে ফের অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীগকে। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগ বলছে জি কে শামীম নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কেউ না। সে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের কোন পদে নেই। তবে ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় কমিটিতে রাখার জন্য এই জি কে শামীমের নামই প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর এই নামের প্রস্তাবক ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় জি কে শামীমের নাম প্রস্তাবের প্রেক্ষিতেই হয়তো কেন্দ্রীয়ভাবে ছড়ানো হয়েছে জি কে শামীম জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি পদে পদায়িত হয়েছেন। অন্যথায় যুবলীগের নেতা কিভাবে জি কে শামীমকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি উল্লেখ করে বক্তব্য দিলেন। আর এ বিষয়টিই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।

জেলা আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের সূত্রে জানা যায়, জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় জি কে শামীমের প্রস্তাব করায় এ নিয়ে সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলের সাথে অন্যান্য নেতাদের অনেক তর্ক বিতর্কের ঘটনা ঘটেছিল। যদিও জি কে শামীমের গ্রেফতারের পর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুল হাই বলছেন, জি কে শামীমকে তিনি চিনেনই না। তিনি কখনও এ নাম শুনেননি। ফলে একদিকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতার বক্তব্য অন্যদিকে সভাপতি আব্দুল হাইয়ের অস্বীকার বিষয়টি নিয়ে বেশ জটিলতা দেখা দিয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও