আওয়ামী লীগে প্রবেশের চেষ্টায় হাইব্রিড নেতারা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৬:৪২ পিএম, ৭ অক্টোবর ২০১৯ সোমবার

আওয়ামী লীগে প্রবেশের চেষ্টায় হাইব্রিড নেতারা

গত কয়েকদিন ধরেই দেশজুড়ে বইছে ক্যাসিনো ঝড়। সেই ঝড়ে ল-ভ- হয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। যার ধারাবাহিকতায় রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী জেলা হিসেবে নারায়ণগঞ্জেও এই ক্যাসিনো ঝড়ের প্রভাব পড়েছে। ফেঁসে যাচ্ছেন নারায়ণগঞ্জের অনেক বড় বড় জুয়ারীরা। সেই সাথে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অপকর্মের মাধ্যমে ফুলে ফেপে উঠা নেতারাও ধরা পড়ছেন। আর এদের বেশির ভাগই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। ফলে এসকল ঘটনায় নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগে কলঙ্কের তিলক লেগেছে। তবে এই কলঙ্কের তিলকের মূলে রয়েছেন অনুপ্রবেশকারীরা। যারা আওয়ামী লীগের কোন কোন নেতার ছত্রছায়ায় দলে প্রবেশ করছেন এবং সবশেষ দলে কলঙ্কের তিলক লাগাচ্ছেন।

জানা যায়, ক্যাসিনো ঝড়ের প্রথমদিকেই গত ২০ সেপ্টেম্বর র‌্যাব সদস্যরা জি কে শামীমের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে হানা দিয়ে তাঁকে ও তাঁর সাত দেহরক্ষীকে গ্রেপ্তার করেন। এরপর সেখান থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ১৬৫ কোটি টাকার স্থায়ী আমানতের (এফডিআর) কাগজপত্র (তাঁর মায়ের নামে ১৪০ কোটি), ৯ হাজার ইউএস ডলার, ৭৫২ সিঙ্গাপুরি ডলার, একটি আগ্নেয়াস্ত্র এবং মদের বোতল জব্দ করে র‌্যাব। অস্ত্র ও মাদক মামলায় জি কে শামীমকে গ্রেফতারের পরে রিমান্ডে নেয়ার পর থেকে তোলপাড় শুরু হয়। বেরিয়ে আসতে থাকে নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য। এস এম গোলাম কিবরিয়া ওরফে শামীম নিজের নাম সংক্ষেপ করে বলতেন জি কে শামীম। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জি কে বিল্ডার্সের মালিক তিনি।

জি কে শামীম নিজেকে যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সমবায় বিষয়ক সম্পাদক বলে পরিচয় দিতেন। এছাড়া নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের প্রস্তাবিত সহ সভাপতি ছিলেন। জিকে শামীমের বাড়ি হচ্ছে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায়। এর মধ্যে জিকে শামীমের সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামীলীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত মো: শহীদ বাদলকে হাসপাতালে দেখতে যাওয়া জিকে শামীমের পাশে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হাইয়ের উপস্থিতির ওই দুটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। আব্দুল হাই ও আবু হাসনাত শহীদ বাদল জি কে শামীমকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করতে চেয়েছিলেন। যা পরবর্তীতে জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতাকর্মীদের বাধায় ব্যর্থ হন।

অথচ এই জি কে শামীম একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সাথে জড়িত ছিলেন। বিএনপি কেন্দ্রীয় নেতা মির্জা আব্বাসের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিত বলে জানিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। তারা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জি কে শামীম নামে কাউকেই চিনতেন না।

এদিকে গত ৩০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থাই এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট থেকে বাংলাদেশের অনলাইন ক্যাসিনো প্রধান সেলিমকে নামিয়ে আনে র‌্যাব-১ এর একটি দল। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে নিয়ে গুলশান-২ এ তার বাসা কাম অফিস ‘মমতাজ ভিশনে’ অভিযানে যায় র‌্যাব। প্রথমে সেলিমকে সঙ্গে করে ঘটনাস্থলে যায় র‌্যাবের তিনটি গাড়ি। পরে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০টিতে। টানা ১৬ ঘণ্টা সেখানে অভিযান চলে। অভিযানের সময় সেলিম প্রধান ওই বাসার ভেতরে র‌্যাবের সঙ্গে ছিলেন।

দীর্ঘ অভিযান শেষে র‌্যাব-১ অধিনায়ক সারোয়ার বিন কাশেম এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, সেলিম প্রধানের গুলশানের অফিস ও বাসা থেকে জব্দ করা হয়েছে ৭ লাখ ৯৮ হাজার টাকা, সাতটি ল্যাপটপ, ৭৭ লাখ ৬৩ হাজার টাকা মূল্যমানের ২৬টি দেশের বিদেশি মুদ্রা এবং ৪৮ বোতল মদ। আর সেলিম প্রধানের বনানীর অফিস থেকে জব্দ করা হয়েছে ২১ লাখ ২০ হাজার টাকা। ওই অফিস থেকেই আক্তারুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে সারোয়ার বিন কাশেম জানান।

সেলিম প্রধান ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ‘প্রধান গ্রুপ’-এর কর্ণধার। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে জাপান-বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং অ্যান্ড পেপারস লিমিটেড, পি২৪ ল ফার্ম, এইউ এন্টারটেইনমেন্ট, পি২৪ গেমিং, প্রধান হাউস ও প্রধান ম্যাগাজিন। এর মধ্যে পি২৪ গেমিংয়ের মাধ্যমে তিনি জুয়াড়িদের ক্যাসিনোয় যুক্ত করতেন। অনলাইন ক্যাসিনোর বাংলাদেশ প্রধান সেলিম প্রধান যার বাড়ি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলাতে। সেলিমের অনেক আত্মীয় স্বজনও এ ক্যাসিনোর সঙ্গে সম্পৃক্ত। এই সেলিম প্রধানও বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন বলেন জানা গেছে।

অন্যদিকে গত ৩ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় দ্যা ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশন (ইউনাইটেড ক্লাব হিসেবে পরিচিত) এ অভিযান চালিয়ে সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন তাপু সহ ৭জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ তাপু ফতুল্লা থানা বিএনপির উপদেষ্টা কমিটিতে রয়েছেন। তিনি মূলত বিএনপির ডোনার হিসেবে পরিচিত। তিনি ফতুল্লা থানা বিএনপির সবশেষ কমিটির উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। একই সাথে জেলা বিএনপির সহ সভাপতি ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের মনোনয়বঞ্চিত নেতা শাহ আলমের ঘনিষ্টজন হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

তবে গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হওয়া একাদশ জাতীয়  সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা-সিদ্ধিরগঞ্জ) সংসদীয় এলাকার অনেক নেতাকর্মীই দল পরিবর্তন করছেন। তারই ধারাবাহিকায় এবার নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের মনোনীত প্রার্থী শামীম ওসমানের হাতে ফুল দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চেয়েছিলেন তাপু।  মোফাজ্জল হোসেইন তাপু গত ১২ ডিসেম্বর ইউনাইটেড অ্যাসোসিয়েশনে শামীম ওসমানের পক্ষে নির্বাচনী সভায় তিনি সভাপতিত্ব করেন।

এভাবে চলমান ক্যাসিনো ঝড়ে নারায়ণগঞ্জের যারাই ফাঁসছেন তাদের মধ্যে অনেকেই বর্তমানে আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িত। কিন্তু তারা একসময় বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন। ক্ষমতার রদবদলে তারাও দলের রদবদল করেছেন। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করে দলকে বিতর্কিত করছেন।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও