আসছে কমিটি : আওয়ামী লীগে বাড়ছে কর্তৃত্ব ধরে রাখার লড়াই

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৬ পিএম, ১০ অক্টোবর ২০১৯ বৃহস্পতিবার

আসছে কমিটি : আওয়ামী লীগে বাড়ছে কর্তৃত্ব ধরে রাখার লড়াই

নারায়ণগঞ্জে আবারো শুরু হতে যাচ্ছে রাজনৈতিক উত্তাপ। তবে এটা এবার প্রকাশ্যে ঘটছে না। রাজধানী সহ সারাদেশে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের ভেতরে শুদ্ধি অভিযানের কারণে এবারের উত্তাপ বিরাজ করবে স্নায়ুতে। আর এনিয়ে এখন থেকেই গ্রুপিং লবিং হচ্ছে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের। টার্গেট একটাই নীরবে নিজেদের কব্জা ঠিক রাখা। কোনভাবেই যেন কর্তৃত্ব খর্ব না হয়।

সূত্র মতে, আগামী নভেম্বরের মধ্যে স্বেচ্ছাসেবক লীগ, যুবলীগ, কৃষকলীগ ও শ্রমিক লীগের সম্মেলন হবে। সবগুলো সংগঠনের সম্মেলনই হবে নভেম্বরে, যা শুরু হবে ২ নভেম্বর কৃষক লীগের মধ্য দিয়ে। এরপর ৯ নভেম্বর শ্রমিক লীগ, ১৬ নভেম্বর স্বেচ্ছাসেবক লীগ এবং ২৩ নভেম্বর যুবলীগের সম্মেলন হবে।

এই ৪ সংগঠনের কমিটিই তিন বছর মেয়াদি। ২০১২ সালে এসব সংগঠনের সর্বশেষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সে হিসাবে আরও ৩ বছর আগেই সংগঠনগুলোর মেয়াদ শেষ হয়েছে।

গত ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকে আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর সম্মেলনের তারিখ নির্ধারণ করা হয়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সম্মেলনের আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সম্মেলন অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত হয়। এর আলোকে সহযোগী সংগঠনগুলোকে ১০ ডিসেম্বরের আগেই সম্মেলন শেষ করতে চিঠি দেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা জানান, আগামীতে নারায়ণগঞ্জে এসব সহযোগি সংগঠনের কর্তৃত্ব নিতে ইতোমধ্যে শীর্ষ নেতাদের ভেতরে শুরু হয়েছে অন্তরালের প্রতিযোগিতা। শুরু হয়েছে জোট বাধাবাধি। শীর্ষ নেতারা একে অন্যের সঙ্গে জোট বাধতে শুরু করেছে। টার্গেট যে কোন মূল্যে নিজেদের লোকজনদের দিয়েই কমিটি বাগানো।

সূত্র মতে, ইতোমধ্যে রূপগঞ্জের এমপি ও মন্ত্রী হওয়া গোলাম দস্তগীর গাজী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ নিজের কাছেই রেখেছেন। একই অবস্থা আড়াইহাজারেও। সেখানকার এমপি নজরুল ইসলাম বাবুও সভাপতি হয়েছেন। সোনারগাঁয়ের কমিটি নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। মন্ত্রী গাজী, এমপি বাবু, সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী সহ ৩৮ জন ইতোমধ্যে দলের সর্বোচ্চে চিঠি দিয়ে জেলা আওয়ামী লীগ ঘোষিত সামসুল ইসলাম ভূইয়া ও মাসুদুর রহমানের কমিটি বিলুপ্ত চেয়েছেন। সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামীলীগের বিরোধ নিস্পত্তির লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এখনো বাকি আছে বন্দর ও ফতুল্লা সহ নারায়ণগঞ্জ সদর থানা কমিটির সম্মেলন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, থানা কমিটির পাশাপাশি চারটি কমিটি নিয়েও আছে শীর্ষ নেতাদের মধ্যে টানাটানি। শ্রমিক লীগের কমিটি নিয়ে আছে বিরোধ। কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহমুদ আছেন নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি। যদিও জেলাতে আছে বিদ্রোহী কমিটি। বিতর্কিত শ্রমিক লীগ নেতা কাউসার আহমেদ পলাশ চাচ্ছেন শ্রমিক লীগের কমিটি বাগাতে। তিনি পাচ্ছেন মন্ত্রী গাজী, এমপি বাবু ও মেয়র আইভীর সমর্থন। অপরদিকে শুক্কুর মাহমুদ চাচ্ছেন তার অধীনেই কমিটি থাকতে। তিনি পাচ্ছেন শামীম ওসমানের সমর্থন।

যুবলীগের জেলার সভাপতি আবদুল কাদির এখন জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি। সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদল আছেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী পদে। জেলা যুবলীগের শীর্ষ পদে আগ্রহী জেলা ছাত্রলীগের সাবেক দুইজন সভাপতি এহসানুল নিপু ও সাফায়েত আলম সানি। অপরদিকে শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাত হোসেন সাজনু ও সেক্রেটারী আহাম্মদ আলী রেজা উজ্জল চাচ্ছেন ফের কমিটিতে থাকতে। তাদের মধ্যে সাজনু হলেন শামীম ওসমানের অনুগামী। আর উজ্জল মেয়র আইভীর ভাই।

এদিকে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক জেলা, মহানগর, উপজেলা, থানা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের মেয়াদোত্তীর্ণ সব কমিটির সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গত ১৫ সেপ্টেম্বর দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের পক্ষে পাঠানো চিঠিতে তিনি এই নির্দেশ দেন। দলের দফতর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়েছে।

চিঠিতে দেশের সব জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো এই নির্দেশনায় বলা হয়, গত ১৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত  আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগামী ২০ ও ২১ ডিসেম্বর ২০১৯ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হবে। আসন্ন জাতীয় কাউন্সিল অধিবেশনের আগেই সংগঠনের যে সব শাখা কমিটির মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে, সেসব কমিটির সম্মেলন অনুষ্ঠানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে ওই সভায়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলোর সম্মেলন আগামী ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ তারিখের মধ্যে সম্পন্ন করার জন্য নির্দেশনা হয়েছে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

যার ধারবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুযায়ী পরিচ্ছন্ন নেতারাই কমিটিতেই স্থান পাবেন। যাদের নামে কোন বিতর্ক কিংবা কোনো দোষ রয়েছে তাদেরকে পদায়ন করার সম্ভাবনা খুবই কম। তাদের ডিমোশন দিয়ে দল থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন ও আগামী বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগকে আরও শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি দিতে চান প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা। তাই এবারের ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে সেভাবেই ঢেলে সাজাতে চান আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব।

সূত্র বলছে, ২০১৩ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও অ্যাডভোকেট খোকন সাহাকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটি গঠন করা হয়। এর দুই বছর পর ২০১৫ সালের ১০ ডিসেম্বর ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। এর আগে বিলুপ্ত শহর আওয়ামী লীগের কমিটিতেও সভাপতি ও সেক্রেটারী পদে ছিলেন আনোয়ার হোসেন ও খোকন সাহা। কমিটির মেয়াদ ছিল ২ বছর। কিন্তু পার হয়ে গেছে ৭ বছর। ফলে শুদ্ধি অভিযানের পর পরই মহানগর আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি আসার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।

এদিকে ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর আবদুল হাইকে সভাপতি, সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীকে সহ সভাপতি এবং আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদলকে সাধারণ সম্পাদক করে তিন সদস্য বিশিষ্ট জেলা আওয়ামীলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। ১৩ মাস পর নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের ৭৪ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি অনুমোদন দেয় কেন্দ্র। ইতোমধ্যে এই কমিটিরও প্রায় ৩ বছর অতিবাহিত হয়ে যাচ্ছে। তবে জেলা আওয়ামী লীগের পদে থাকা অনেক নেতাই ইতোমধ্যে নানা বিতর্কে জড়িয়ে গেছেন। যাদের নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে নানা সামালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। ফলে দলকে শুদ্ধ করার লক্ষ্যে জেলাতেও নতুন কমিটি আসার সম্ভাবনা রয়েছে।

এছাড়া আসছে আইনজীবী সমিতির নির্বাচন। আগামী বছরের প্রথম দিকে অর্থাৎ জানুয়ারীতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনের এখনও প্রায় ৩ মাস সময় বাকী থাকলেও সম্ভাবনাময় প্রতিদ্বন্দ্বীতাকারী প্রার্থীরা এখন থেকেই প্যানেল ও নির্বাচনী মাঠ গোছানো শুরু করে দিয়েছেন। বিশেষ করে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগপন্থী প্যানেলের সম্ভাবনাময় প্রার্থীরাই বেশি সরব হয়েছেন। তবে এবারের নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে তাদের প্যানেল গঠনে অপেক্ষা করছে জটিল সমীকরণ। কারণ এখানে আওয়ামী লীগের কয়েকটি প্রভাবশালী মহল রয়েছে। যারা প্রত্যেকেই চেষ্টা করবেন তাদের সমর্থিত প্রার্থীদের দিয়ে প্যানেল গঠন করতে। আর এই প্যানেল গঠনে শেষ পর্যন্ত কে টিকে থাকতে পারবেন সেটাই দেখার বিষয়।

নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু অনেকটা প্রকাশ্যেই একসময়ের বন্ধু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সমর্থনের বিপক্ষে গিয়ে প্যানেল গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। সেই সাথে অ্যাডভোকেট খোকন সাহার অনুগামী কয়েকজনও দিপুকে পরোক্ষভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। আর তাদের পরোক্ষ সহযোগীতাকারী হিসেবে থাকবেন নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী ও নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য নজরুল ইসলাম বাবু। কারণ তাদেরও অনেক দিনের প্রচেষ্টা নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়া রাজনীতির প্রভাব থেকে শামীম ওসমানকে হটাতে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও