মির্জা ফখরুলকে বয়কট সেই সাখাওয়াতের

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৮ পিএম, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ বুধবার

মির্জা ফখরুলকে বয়কট সেই সাখাওয়াতের

নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি ঘোষণার শুরু থেকেই লাইনচ্যুত হয়ে আসছেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। মহানগর বিএনপির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সাথে কোন কর্মসূচিতেই তাকে দেখা যায়নি। সবসময় তিনি আলাদা আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করে আসছেন। মহানগরে ১৫১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণার পর পরিচিতি সভাতেও ছিলেন না অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তারই ধারাবাহিকতায় এবার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলকেও বয়কট করেছেন সাখাওয়াত। মহানগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা মহাসচিবের প্রতি সম্মান দেখিয়ে উপস্থিত থাকলেও অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন।

দলীয় সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা উপলক্ষ্যে ১৩ নভেম্বর বুধবার রাজধানী ঢাকার শেরে-ই বাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সমাধিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা ও দোয়া মোনাজাতের কর্মসূচি পালন করেন। যেখানে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর উপস্থিত ছিলেন। আর এই কর্মসূচিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটিতে থাকা নেতারা সহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু সেখানে উপস্থিত ছিলেন না অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। আর তার সেখানে উপস্থিত না থাকা মানে দলীয় মহাসচিবকেই অবজ্ঞা করা বলে মনে করছেন তূণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা।

এর আগে গত ১১ নভেম্বর বিকেলে শহরের কালীরবাজার এলাকার ফ্রেন্ডন্স মার্কেটে বিএনপির অস্থায়ী কার্যালয়ে পরিত্র ঈদ-এ মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে দোয়া ও মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খান সহ তার অনুগামীদের কেউই সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কমিটিতে দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত মহানগর বিএনপির নেতাদের সাথে কোন কোন কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায়নি তাকে। সবসময় তিনি দলীয় শৃঙ্খলার তোয়াক্কা না করেই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের সম্মতির বাইরে গিয়ে মহানগর বিএনপির ব্যানারে আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করে থাকেন। সেই সাথে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন নিজ স্বার্থের জন্য নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অনেক কমিটিতেই প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে থাকেন। ফলে কমিটির বিদ্রোহী নেতারা তার আশ্রয় পশ্রয় পেয়ে মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গসহযোগী সংগঠনগুলোতেও কোন্দল সৃষ্টি করে যাচ্ছে। সবকিছুতেই তিনি নাটের গুরু হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকেন।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমেই অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেনে বিএনপির রাজনীতি শুরু। তিনি বিএনপির সমর্থনে ও সমর্থন ছাড়াও কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক সহ বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। সেই সুবাধে তিনি বিএনপির রাজনীতিবিদ হিসেবেই নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত হতে থাকেন। ২০১৭ সালের এপ্রিলে সারাদেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টিকারী সাত খুনের ঘটনায় আসামীদের বিপক্ষে আইনজীবী হয়ে আলোচনায় আসেন তিনি। প্রায় প্রতিনিয়তই বিভিন্ন গণমাধ্যমে বক্তব্য দেয়ায় আলোচিত মুখ হয়ে যান তিনি।

এর পরপরই নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন ঘনিয়ে আসে। ওই নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কোন নেতা অংশগ্রহণ করতে ইচ্ছুক না থাকায় সহজেই বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী হয়ে যান অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। নিজের পক্ষে কোন জনসমর্থন না থাকা সত্ত্বেও বিনা বিরোধীতায় প্রার্থী হয়ে যান। ফলে নির্বাচন শেষে আওয়ামীলীগের সমর্থিত প্রার্থীর সাথে তার বিপুল ভোটের ব্যবধানে পরাজয় ঘটে। যদিও তার দাবি নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে। কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোথাও কোন অভিযোগ করিনি।

এরপর ২০১৭ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি ঘোষণা করা হয়। আর এতে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতাকে ডিঙ্গিয়ে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সহজেই নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি হয়ে যান। এর আগে ২০০৯ সালে শহর বিএনপির মুলধারার কমিটিতে ঠাই না পেয়ে বিদ্রোহী কমিটি গঠন করেছিলেন সাখাওয়াত। যেখানে নুরুল ইসলাম সর্দারকে সভাপতি ও সাখাওয়াত হোসেন খান নিজে সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন।

এদিকে মহানগর বিএনপিতে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের স্থান পাওয়ায় ক্ষোভ থেকে যায় অনেকেরই। তারপরেও তাকে মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীরা মানিয়ে নিতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির পদে আসার পর থেকেই তার দৌরাত্ম বেড়ে যায়। নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কোন নেতাকেই তিনি আর পাত্তা দিতে রাজী না। নারায়ণগঞ্জ মহানগর কমিটি হওয়ার পর কখনই তিনি মহানগরের একত্রিত ব্যানারে কোন কর্মসূচিতে আসেন নি। সবসময় সাখাওয়াত হোসেন খান আলাদা ব্যানারে দলীয় কর্মসূচি পালন করে থাকেন। আর তাকে দেখে মহানগর বিএনপির অন্য নেতারাও শৃঙ্খলা ভঙ্গে উৎসাহিত হয়ে থাকেন।

অন্যদিকে মহানগর বিএনপির আংশিক কমিটি থাকাবস্থায় ২০১৮ সালের ৮ এপ্রিল সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এটিএম কামাল বিদেশে পাড়ি জমান। তিনি বিদেশে যাওয়ার পর মহানগর বিএনপিতে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নিয়ে লাগে টানাটানি। সাংগঠনিক নিয়মেয় ব্যত্যয় ঘটিয়ে সহ সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী অ্যাডভোকেট সরকার হুমায়ুন কবিরকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব দেয়ার জন্য চেষ্টা করেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। এটিএম কামাল দেশে ফিরার আগ পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে মহানগর বিএনপিতে সৃষ্টি হয় টানাপোড়ন।

সর্বশেষ বিএনপির পুনর্গঠন করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৮ মার্চ রাজধানীর পল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠক শেষ পর্যন্ত সফল হয়নি নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির বাদানুবাদের কারণে। যেখানে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান সভাপতি অ্যাডভোকেট আবুল কালামের সাথে তর্ক বিতর্কে লিপ্ত হন। আবুল কালাম বলেন, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি হওয়ার পর ৫ মাস আমাদের মধ্যে কোন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়নি। যখনই সাখাওয়াত হোসেন আলাদা হয়ে যান তখনই মহানগর বিএনপিতে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দলের মনোনয়ন যে কেউ চাইতেই পারে। তবে এজন্য আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করতে হবে, সেটা তো কোন নিয়ম হতে পারে না।

এরপর নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিন্তু নিজের স্বার্থে লাগায় অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান এতে হস্তক্ষেপ করেন। যার ফলশ্রুতিতে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির পূর্ণাঙ্গ কমিটি কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যায়।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের কমিটিতেও হস্তক্ষেপ করেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। চেষ্টা করেন তার সমর্থিত নেতাকর্মীদেরকে পদে ঢুকানোর জন্য। ফলে নারায়ণগঞ্জ যুবদলের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বেগ পোহাতে হচ্ছে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের কারণে। মহানগর যুবদলের বিদ্রোহী নেতাদেরকে আশ্রয় দেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি মহানগর বিএনপির বাইরে গিয়ে ব্যক্তিগত শোডাউনে মহানগর যুবদলের বিদ্রোহী নেতাদেরকে নিয়ে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। পাশাপাশি মহানগর ছাত্রদলের নেতাদের পশ্রয় দিয়ে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের অনুমতির বাইরে গিয়ে আলাদাভাবে কর্মসূচি পালন করিয়ে বিভক্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

তবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের এসকল আলোচিত ও সমালোচিত কর্মকান্ডে নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকে ভাঙ্গনের নৈপথ্যে কারিগর হিসেবে দায়ী করছেন। সকল কোন্দলের মূলে তাকে নাটের গুরু হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। তাদের মতে, সাখাওয়াত হোসেন খান বিএনপির আন্দোলন সংগ্রামে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি ভাঙ্গন ও কোন্দলের ক্ষেত্রেও তার কুটকৌশল রয়েছে। তার কারণে মূল দলের পাশাপাশি অঙ্গ সহযোগী সংগঠনেও কোন্দল সৃষ্টি হয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও