সাখাওয়াতের ইন্ধনেই মামলা স্বীকার করলেন আইনজীবী!

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪১ পিএম, ১৭ নভেম্বর ২০১৯ রবিবার

সাখাওয়াতের ইন্ধনেই মামলা স্বীকার করলেন আইনজীবী!

সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে আলোচিত বিষয় হলো জেলা ও মহানগর কমিটির বিরুদ্ধে মামলা। মামলায় আসামী করা হয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও। যা নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য একটি লজ্জাজনক বিষয়। তবে এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির পিছনে মূল কারিগর হিসেবে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। যা আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতাকর্র্মীরা ধারণা করে নিয়েছিলেন। সবশেষ মামলার বাদীর পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিকও বিয়য়টি স্বীকার করেছেন।

১৭ নভেম্বর রোববার নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে অিকপটেই স্বীকার কেেরন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুুরোধেই তিনি মামলার ফাইল করেছেন। যার অডিও রেকর্র্ড প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে।

প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করতে না চাইলেও পরে অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘‘আমাকে অনুরোধ করে বলা হয়েছে, আপনি কাজটি করলে কমিটি ঠিক হয়ে যাবে। এটা দলের জন্য ভাল হবে। দলের জন্য কোন ক্ষতি হবে না। সেই সাথে আমি একজন আইনজীবী। পেশা হিসেবে আমি কাজ করতেই পারি। আপনারা যদি বিষয়টি নিয়ে সমাধানে চলে আসেন তাহলেই মামলা প্রত্যাহার হয়ে যাবে। এখানে ঝামেলার কিছু নাই।’’

অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিকের এই কথা বলার পর তাকে জিজ্ঞাসা করা হয় আপনাকে কি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান অনুরোধ করেছিলেন? প্রশ্নের উত্তরে অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, ‘‘অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুরোধেই বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে রাজী হয়েছিলাম।’’

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন দায়ের করেছেন বিএনপির দুইজন নেতা। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সীমানা ও গঠনতন্ত্র মানা হয়নি উল্লেখ করে ওই মামলার আবেদন করা হয়। গত ১২ নভেম্বর আদালতে শুনানী শেষে আদালত পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কেন কমিটি অবৈধ হবে না জানিয়ে বিবাদীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ১৩ নভেম্বর বুধবার আদালত থেকে এ সংক্রান্ত নোটিশ বিবাদীদের হাতে দেওয়া হয়।

মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে।

গত ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারি জজ শিউলী রানী দাসের আদালতে মহানগরের ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (পৌরসভাকালীন) বিএনপি নেতা নূর আলম শিকদার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ দুইজনই মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুগামী হিসেবে পরিচিত। তার বিভিন্ন সভা সমাবেশে ও মিছিল মিটিংয়ে এই দুই নেতার দেখা মিলে।

ফলশ্রুতিতে বিএনপি নেতারা মনে করছেন, এই মামলার পিছনে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের হাত রয়েছে। কারণ যে দুইজন মামলার বাদী হয়েছেন, তারা এত আইনের মারপ্যাঁচ বুঝে না। আর অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানও চেয়েছিলেন এই দুইজনকে যেন জেলা ও মহানগর বিএনপিতে মূল্যায়ন করা হয়। যেহেতু তাদের চাহিদা অনুযায়ী মূল্যায়ন করা হয়নি সে কারণেই গোলজার খান ও নূর আলমকে দিয়ে পরোক্ষভাবে মামলা করিয়েছেন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান।

বিএনপি নেতাদের মতে, নারায়ণগঞ্জ জেলা ও মহানগর বিএনপির কমিটি নতুন কিছু না। এটা অনেক আগে থেকেই এভাবে হয়ে আসছে। দলের সংশোধনের প্রয়োজন হলে আরও আগেই মামলা করা যেত। দলের ক্রান্তিলগ্নে বিভেদ সৃষ্টি করার জন্যই ক্ষমতাসীন দলের কারও ইদ্ধনেই অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান তার দুই অনুগামী দিয়ে মামলা করিয়েছেন। সাখাওয়াতের মতো নেতা দলের জন্য ক্ষতিকর। দলের মহাসচিবেরও প্রতিও তার কোনো শ্রদ্ধাবোধ নেই। যেখানে সরকারী দলের মামলায় জর্জরিত বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান নিজ দলের নেতা হয়ে নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে আরও মামলা দায়ের করছেন।

এরই মধ্যে মহানগর বিএনপির কার্য-নির্র্বাহী কমিটির প্রথম সাধারণ সভায় মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ ও কেন্দ্রে বহিস্কার সহ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

১৬ নভেম্বর কালিরবাজার এলাকার অস্থায়ী কার্যালয়ে ওয়ার্ড ও থানা পর্যায়ে কাউন্সিলের প্রস্তুতি নিয়ে আলাপ আলোচনার পাশাপাশি এসকল সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়।

সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে সাংগঠনিক সম্পাদক আবু আল ইউছুফ খান টিপু বলেন,  দল ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া আজকে প্রতিহিংসার কারাগারে বন্দী। সেখানে দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় অভ্যন্তরীণভাবে সমাধান না করে, শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছে সমাধান না চেয়ে সরকারী দলের উস্কানিতে দলকে বিপর্যস্ত করার জন্য তারা এই মামলা দায়ের করছে। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে দলের মধ্যে কোন্দল সৃষ্টি করে এবং উপদল করে যারা সংগঠনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তারাই এই মামলার পিছনের কারিগর। পর্দার অন্তরালে থেকে তারা যে দুইজনকে দিয়ে মামলা করিয়েছে, সেই দুইজন জেলা কিংবা মহানগর বিএনপির কেউ না। কিন্তু তারা দাবী করেছে জেলা ও মহানগর বিএনপির পদে রয়েছে এটা ঠিক না। তারা বিএনপির কর্মী হতে পারে কিন্তু কোন পদ পদবীতে নেই। তারা মূলত অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুসারী, এটাই তাদের পরিচয়। কারণ সাখাওয়াত হোসেন খানের সকল মিছিল মিটিংয়ে তাদের পাওয়া যায়।

তিনি আরও বলেন, মহানগর বিএনপির ব্যানারে আলাদা কর্মসূচি পালন করে নারায়ণগঞ্জ সহ সারাদেশে বিএনপির ভাবমূর্তিকে ক্ষুণ্য করে, যারা অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের সাথে বিতর্কিত কর্মকান্ডের মাধ্যমে দলকে সাধারণ মানুষের কাছে প্রশ্ন বিদ্ধ করেছে ও সাংগঠনিকভাবে যারা আমাদের মহানগর বিএনপিকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য বিভিন্ন ধরণের অসাংগঠনিক কাজকর্ম করে সাধারণ নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে, তাদের ব্যাপারে আমাদের মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে অব্যশই ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যেহেতু আমাদের প্রতিটি মিটিংয়ে তাদের আমন্ত্রণ জানানো সত্ত্বেও তারা আমাদের যেই কর্মসূচি সেই কর্র্মসূচিতে অংশ গ্রহণ করে না, সাংগঠনিক সভাতেও তারা আসে না। এমনকি সবশেষ বিএনপির মহাসচিব মিজা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও বয়কট করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। সেহেতু তার প্রতি আমাদের অনাস্থা প্রকাশ করা উচিত। তার দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ, কোন্দল সৃষ্টি এবং মহানগর বিএনপির ব্যানারে আলাদা কর্মসূচি পালন করা এবং বিভিন্ন অঙ্গ সহযোগী সংগঠনকে বিভক্ত করার পায়তারা করছে, এ ব্যাপারে কেন্দ্রে আমাদের অবহিত করতে হবে। এই কমিটির পক্ষ থেকে দল থেকে বহিস্কার সহ সাংগঠনিক ব্যাবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করতে হবে।

তার এই বক্তব্যে সভায় উপস্থিত থাকা অন্যান্য নেতাকর্মীরা সকলেই হাত নেড়ে সম্মতি জানান। সেই সাথে অন্যান্য বক্তব্যেও এসকল কথা উঠে এসেছে। যার প্রেক্ষিতে সবাই উপস্থিত সকলের সম্মতিক্রমে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত খানের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রকাশ ও বহিস্কার সহ সাংগঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কেন্দ্রী বিএনপিকে সুপারিশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও