ছাত্রদল সভাপতি যেভাবে জেলা আওয়ামী লীগে

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৩৫ পিএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৯ সোমবার

বিগত বিএনপি আমলে খালেদা জিয়া ও তৎকালীন মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়ার হাতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মীর সোহেল।
বিগত বিএনপি আমলে খালেদা জিয়া ও তৎকালীন মহাসচিব মান্নান ভূঁইয়ার হাতে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান মীর সোহেল।

আওয়ামী লীগে পদ দেওয়ার আগে বিগত দিনের রাজনৈতিক কর্মকান্ড ও অবস্থান যাচাই বাছাই করার কড়া নির্দেশনা ছিল দলটির কেন্দ্রীয় নেতাদের। খোদ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। দলে অনুপ্রবেশকারীদের স্থান না দিতেও ছিল নির্দেশনা। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদকের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে মীর সোহেল আলীর পদ নিয়ে এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এরই মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি মীর সোহেল আলীর বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। থানার ভেতরে মারধরের শিকার ব্যবসায়ী সিকদার সেলিম বাদী হয়ে ১৭ নভেম্বর বিকেলে ওই মামলাটি দায়ের করেন। এতে মীর সোহেলে সহযোগী শাহীন সহ অজ্ঞাত আরো ৮ থেকে ১০জনকে আসামি করা হয়।

ভুক্তভোগী হলেন ফতুল্লা থানাধীন পাগলা বউবাজার এলাকার আব্দুল খালেক সিকদারের ছেলে চাঁদ শিকদার সেলিম। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মলীগ নারায়ণগঞ্জ জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক। একই সঙ্গে তিনি পোশাক কারখানার মুজদকৃত পণ্যের ব্যবসায়ী।

অভিযোগ সূত্র জানায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে সদর উপজেলার ফতুল্লার কুতুবপুরের মীর হোসেন মীরুর বাহিনী কুতুবপুর ইউনিয়নের বউবাজার এলাকায় মুরাদ হোসেন নামে এক ব্যবসায়ীর মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে হত্যার হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করে। এ ঘটনায় ওই দিন রাতেই মুরাদ বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। ওই ঘটনায় থানায় অভিযোগ দায়েরের পর থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শক করেন এবং পরদিন শুক্রবার রাতে তাদেরকে থানায় যেতে বলেন।

মুরদারে ভাই সিকদার সেলিম জানান, বৃহস্পতিবার ফতুল্লা থানায় অভিযোগ দায়েরের পর এসআই মিজান ঘটনাস্থলে আসেন এবং পরদিন (শুক্রবার) রাতে আমাকে থানায় আসতে বলেন। সে মোতাবেক আমি থানায় প্রবেশ করছিলাম এমন সময় থানা থেকে বের হয়ে আসছিলেন মীর সোহেল আলী, শাহীনসহ আরও বেশ কয়েকজন। তখন মীর সোহেল আলী ও তার লোকজন থানার ভেতরই আমার উপর হামলা চালায়। এক পর্যায়ে আমাকে মারতে মারতে থানা থেকে রাস্তার নিয়ে আসে। আবার এখান থেকে টেনে ওসি তদন্তের রুমে নিয়ে যায় আমাকে লকআপে ঢুকিয়ে দিবে বলে।

তিনি আরও বলেন, ওসি তদন্তের রুমে নেওয়ার পর তিনি আমাকে উল্টো ধমকাচ্ছিলেন আর বলছিলেন ‘থানায় আপনার কাজ কি, কেন এসেছেন!’ এভাবে থানার ভেতরই যদি আমাদের উপর হামলা করে তাহলে বাইরে আমাদের নিরাপত্তা কতটুকু এবার বুঝে নেন।

সেলিম আরও বলেন, এর আগে মীর হোসেন মীরুর বিরুদ্ধে আমি চাঁদাবাজির মামলা দায়ের করেছিলাম। বৃহস্পতিবার রাতে আমাকে পেয়ে মীর সোহেল আলী ও তার লোকজন আমাকে থানার ভেতরে এলোপাথাড়ি মারধর ও হামলা চালায়।

নির্যাতনের শিকার ব্যবসায়ী সেলিম বাদী হয়ে রোববার বিকেলে মীর সোহেল ও তার সহযোগী শাহীন মিয়ার নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরো ১০/১৫ জনকে আসামী করে মারধর ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার অভিযোগ মামলা দায়ের করা হয়েছে।

তবে এ ব্যাপারে মীর সোহেল আলী বলেন, সেলিমকে থানার বাইরে গেটের সামনে দেখে আমি তাকে আমার অফিসে আসার কথা বলেছি। যাতে তাদের বিরোধটি নিষ্পত্তি করা যায়। কারণ সে এলাকায় আওয়ামীলীগের রাজনীতির পরিচয় দিয়ে চলে। আওয়ামীলীগের কর্মীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হলে এতে দলের জন্যই খারাপ হয়। তাই আমি জেলা আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে দুই পক্ষকেই আমার অফিসে ডেকেছি মিমাংসার জন্য। তাকে মারধরের প্রশ্নই উঠেনা। এছাড়াও এদিন বিকেলে বিষয়টি মিমাংসার জন্য ফতুল্লা থানার তদন্ত কর্মকর্তার আমাকে থানায় থাকতে বলেছিলেন।

ফতুল্লা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আসলাম হোসেন জানান, এই ঘটনায় মামলা হয়েছে। অভিযুক্ত আসামীকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।

এ ব্যাপারে জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম বলেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়। আইন অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে হঠাৎ করেই আলোচনায় চলে এসেছেন মীর সোহেল আলী। তিনি এখন ফতুল্লা থানা যুবলীগের সভাপতি। একই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক।

জানা গেছে, মীর সোহেল আলী এক সময়ে বিএনপির রাজনীতি করতেন। ছিলেন ছাত্রদলের ফতুল্লা থানা কমিটির সভাপতি। আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতে হলে গোড়া ও পূর্ব ইতিহাস থাকার বিধান থাকলেও ছাত্রদল সভাপতিকে কিভাবে যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আনা হয়েছে সেটা নিয়েও আছে নানা প্রশ্ন।

জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ থেকে ফতুল্লায় আসার পর বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সময়ে মীর সোহেলের বাবা মীর মোজাম্মেল আলী গ্রাম সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় থেকেই মীর সোহেল তার ছোট ভাই ফয়সাল, ফুফাতো ভাই হারুন অর রশিদ আরিফ ওরফে বাঘা আরিফ বেপরোয়া হয়ে ওঠে। বিগত ১৯৯১ সালে ফতুল্লা থানা ছাত্রদলের আহবায়ক নির্বাচিত হয়ে বেপরোয়া হয়ে উঠেন মীর সোহেল। ৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ফতুল্লা থেকে বাস যোগে মিছিল নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ডিআইটিতে বিএনপির এক মিটিং যাওয়ার পথে চাষাঢ়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মীর সোহেলকে বাস থেকে নামিয়ে মারধর করে। এ ঘটনার কিছুদিন পর মীর সোহেলের ছোট বোন জামাতা টিপু সুলতানের মধ্যস্থতায় ফতুল্লা ডিআইটি মাঠে আওয়ামী লীগের এক জনসভায় শামীম ওসমানের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন।

২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর সুবিধা বুঝে তৎকালীন সাংসদ কবরীর বলয়ে চলে যান মীর সোহেল। তার বাবা মীর মোজাম্মেল আলী নিজে সাংসদ কবরীর হাতে মীর সোহেলকে তুলে দেন। সাংসদ কবরীর বলয়ে চলে যাওয়ার পর ফতুল্লার দাপা ঘাট এলাকার অবস্থিত কেরানীগঞ্জের আওয়ামী লীগ নেতা রশিদ ও কাশেমের ঘাট এবং দোকান দখল করে নেয়। এ ঘটনায় মীর সোহেল ফতুল্লা থানা যুলীগের সভাপতি পদ থেকে সাময়িক বহিস্কার হোন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারী দলের সাইনবোর্ড ও ক্ষমতার দাপটে মীর সোহেল এখন ফতুল্লার অঘোষিত নিয়ন্ত্রক হিসাবে পরিচিত লাভ করেছে। তিনি প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা। ফতুল্লা মডেল থানার পাশে একটি অফিস তৈরি করে সেখানে বসেই সকল সেক্টর নিয়ন্ত্রন করছেন।

এদিকে নারায়ণগঞ্জ-৪ (ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ) আসনের এমপি শামীম ওসমান নিজ সংসদীয় আসনের আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগি সংগঠনের নেতাকর্মীদেরকে সংযত হয়ে রাজনীতি করার নির্দেশ দিয়েছেন।

তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে কেউ যদি কোন ধরনের অপকর্ম করে তাহলে ছাড় দেওয়া হবে না। তার বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা যেমন গ্রহণ করা হবে তেমনি আইনও তার নিজস্ব গতিতে চলবে। কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যা করার প্রয়োজন তাই করা হবে। আমি কেন দলও কোন অপকর্মকারীর ব্যাপারে দায়িত্ব নিবে না। আমাদের একটি বিষয় খেয়াল করতে হবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা এখন সুশাসন কায়েম করতে চান। কারণ উন্নয়ন তো হচ্ছেই, সেটা হবেই। এখন মানুষ চায় সুশাসন। তাহলেই দেশে পুরোপুরি শান্তি বিরাজ করবে। প্রধানমন্ত্রী সে কারণেই আগে নিজ ঘরে, নিজ দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না। আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতারাও পার পায়নি। কোন দুর্নীতিবাজকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না, হবেও না। এ বার্তা আমাদের অনুধাবন করতে হবে। এটা থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে প্রধানমন্ত্রী চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছেন দল করে অবৈধ আর বেআইনী কাজ করলে ছাড় পাওয়া যাবে না।’


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও