ক্ষিপ্ত মির্জা ফখরুল, বহিস্কারের পথে সাখাওয়াত

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০৩ পিএম, ২৯ নভেম্বর ২০১৯ শুক্রবার

ক্ষিপ্ত মির্জা ফখরুল, বহিস্কারের পথে সাখাওয়াত

নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানকে বহিস্কার করা হচ্ছে। দলের শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই তাকে সাময়িকভাবে দল থেকে বহিস্কার করা হবে। এ ব্যাপারে একটি কমিটি গঠনেরও সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে। কমিটি গঠন হবে মূলত আইওয়াশ। কারণ মহানগর বিএনপির কার্যক্রমে আদালতে স্থগিতাদেশ হলেও এ মামলার পেছনে সাখাওয়াতের কলকাঠি নাড়ার বিষয়টি এখন কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে স্পষ্ট। খোদ মহাসচিবকেও এ বিষয়টি অবগত করা হয়েছে।

এরই মধ্যে ২৯ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির নেতারা মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সাথে দেখা করেছেন। তাঁরা ২৮ নভেম্বর আদালতের দেওয়া আদেশ সম্পর্কে অবহিত করতে গিয়েছিলেন।

তবে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির একজন সাংগঠনিক সম্পাদক নিউজ নারায়ণগঞ্জকে বলেন, ‘শুক্রবার মহানগরের সভাপতি আবুল কালাম, সেক্রেটারী এটিএম কামাল সহ বেশ কয়েকজন নেতা মহাসচিবের সঙ্গে দেখা করেছেন। সেখানে মহানগরের নেতারা পুরো বিষয়টি অবহিত করেছেন। মির্জা ফখরুলও বিষয়গুলো সম্পর্কে আগেই ওয়াকিবহাল। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বেশ ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তিনি এও বলেছেন, ‘কমিটি নিয়ে বিষয় সেটা আলোচনা হবে দলের ভেতরে দলের ফোরামে। সেটা যখন আদালতে গড়ায় তখন বুঝতে হবে এর পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র আছে। যদি সাখাওয়াত পেছন থেকে মামলাটি করায় সেটা খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণিত হলে অবশ্যই বহিস্কার করা হবে। কারণ এটার প্রয়োজন আছে। নতুবা দলের চেইব অব কমান্ড ভেঙ্গে যাবে।’

অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান প্রথমে মামলায় বিষয়টি তার পক্ষে যাবে বলে ধরে নিলেও পরবর্তীতে বিষয়টি হিতে বিপরীতের দিকে যেতে শুরু করেছে। তার অনুসারী দিয়ে মামলা করিয়ে বিপাকে পড়েছেন অ্যাডভেকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়তে যাচ্ছেন তিনি।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জের একটি আদালতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন দায়ের করেছেন বিএনপির দুইজন নেতা। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে সীমানা ও গঠনতন্ত্র মানা হয়নি উল্লেখ করে ওই মামলার আবেদন করা হয়। গত ১২ নভেম্বর আদালতে শুনানী শেষে আদালত পরবর্তী সাত দিনের মধ্যে কেন কমিটি অবৈধ হবে না জানিয়ে বিবাদীদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। ১৩ নভেম্বর বুধবার আদালত থেকে এ সংক্রান্ত নোটিশ বিবাদীদের হাতে দেওয়া হয়।

মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে। গত ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারি জজ শিউলী রানী দাসের আদালতে মহানগরের ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (পৌরসভাকালীন) বিএনপি নেতা নূর আলম শিকদার বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। এ দুইজনই মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুগামী হিসেবে পরিচিত। তার বিভিন্ন সভা সমাবেশে ও মিছিল মিটিংয়ে এই দুই নেতার দেখা মিলে।

এরই মধ্যে গত ১৭ নভেম্বর মামলার নিয়োগকৃত আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক নারায়ণগঞ্জ আদালতপাড়ায় বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের সাথে কথা বলতে গিয়ে অকপটেই স্বীকার কেেরন অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুুরোধেই তিনি মামলার ফাইল করেছেন।

প্রথমে বিষয়টি নিয়ে সরাসরি কারও নাম উল্লেখ করতে না চাইলেও পরে অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক বলেন, আমাকে অনুরোধ করে বলা হয়েছে, আপনি কাজটি করলে কমিটি ঠিক হয়ে যাবে। এটা দলের জন্য ভাল হবে। দলের জন্য কোন ক্ষতি হবে না। সেই সাথে আমি একজন আইনজীবী। পেশা হিসেবে আমি কাজ করতেই পারি। অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুরোধেই বাদীপক্ষের আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে রাজী হয়েছিলাম।

এদিকে ১৯ নভেম্বর মামলার শুনানীর কথা থাকলেও বাদী পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিক শুনানী করতে আসেনি। বিবাদী পক্ষের আইনজীবীদের কাছে তিনি বলেছেন, এই মামলা থেকে তিনি নিজেকে সড়িয়ে নিয়েছেন। বাদী পক্ষ অ্যাডভোকেট শ্যামল নাথকে নিয়োগ করেছেন। আর তিনিও নাকি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খানের অনুরোধে মামলার আইনজীবী হিসেবে কাজ করতে রাজী হয়েছেন। ফলে মামলার পিছনের কারিগর হিসেবে অ্যাডভোকেট সাখাওয়াতের নামটি প্রথমে গোপন থাকলেও সেটা ধীরে ধীরে প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।

মামলার বিষয়ে মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামাল বলেন, যারা এই মামলাটি করেছে, তারা দাবী করে, তারা আমাদের দল করে। যদি তাই হতো, তাহলে এটা আমাদের দলীয় অভ্যন্তরীণ বিষয়। এটা সাংগঠনিক বিষয়। তারা আমাদের দলের নীতি নির্ধারক পর্যায়ে কথা বলতে পারতো কিংবা আপিল করতে পারতো। আমাদের নেতাকর্মীদের স্বাক্ষর নিয়ে তারা তাদের মতামত প্রকাশ করতে পারতো। প্রয়োজন তারা সাংবাদিক সম্মেলনও করতে পারতো। কিন্তু তারা সেটি না করে আমাদের মহাসচিব সহ জেলা ও মহানগর বিএনপির সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদককে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করেছেন। অবশ্যই এটা আমাদের দলের লজ্জাজনক বিষয়।

এদিকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছে দেওয়া মহানগর নেতাদের অভিযোগ পত্রটিতে উল্লেখ করা হয়, সরকারি দলের সাথে আতাত করে আদালতের মাধ্যমে দলীয় কর্মকান্ড ও কর্মসূচী বন্ধ করার এবং দলকে আদালতে আইনের মার প্যাচে সাংগঠনিক কার্যক্রমকে ব্যহত করার ষড়যন্ত্রে থাকার যে নীল নকশা সাখাওয়াত হোসেন খান গ্রহণ করেছেন তাতে, দল সরকার বিরোধী আন্দোলন করতে বাধাগ্রস্ত ও মহানগর বিএনপিকে সাংগঠনিক ভাবে দুর্বল করার হীন চক্রান্তে মেতে উঠেছে। তাই নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’কে সাংগঠনিক ভাবে শক্তিশালী করার স্বার্থে দলীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপি’র কার্যকরী কমিটির সভায় অনাস্থা প্রস্তাব গ্রহণ বাস্তবায়ন করে সাখাওয়াত হোসেন খানকে বহিস্কারের জোর অনুরোধ করছি।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির কমিটি ও কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছে আদালত। বৃহস্পতিবার ২৮ নভেম্বর আসে ওই আদেশ। এর আগে গত ১১ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জ সিনিয়র সহকারি জজ শিউলী রানী দাসের আদালতে মহানগরের ১০ নং ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি গোলজার খান ও একই ওয়ার্ডের সাবেক যুগ্ম সম্পাদক (পৌরসভাকালীন) বিএনপি নেতা নূর আলম শিকদার বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেন। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জেলা বিএনপির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, সাধারণ সম্পাদক মামুন মাহমুদ, মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম ও সাধারণ সম্পাদক এটিএম কামালকে।

উল্লেখ্য, মামলার বাদীদের একজন গুলজার হোসেন খান মহানগর কমিটির সহ সভাপতি সাখাওয়াত হোসেন খানের খুবই ঘনিষ্ঠজন। সা¤প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জ বিএনপিতে আলোচিত বিষয় হলো জেলা ও মহানগর কমিটির বিরুদ্ধে মামলা। যা নারায়ণগঞ্জ বিএনপির জন্য একটি লজ্জাজনক বিষয়। তবে এই লজ্জাজনক পরিস্থিতির পিছনে মূল কারিগর হিসেবে রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সহ সভাপতি অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন খান। যা আগে থেকেই নারায়ণগঞ্জ বিএনপির নেতার্কর্মীরা ধারণা করে নিয়েছিলেন। সবশেষ মামলার বাদীর পক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আবু বক্কর সিদ্দিকও বিয়য়টি স্বীকার করেছেন। তার এই স্বীকারোক্তিমূলক অডিও রেকর্ডিংটি স্থানীয় গণমাধ্যম কর্মীদের কাছেও রয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও