এবার জাতীয় পার্টিতে হাইব্রিড

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৩:৩৫ পিএম, ১ ডিসেম্বর ২০১৯ রবিবার

এবার জাতীয় পার্টিতে হাইব্রিড

এম এ জামানকে আহ্বায়ক ও শফিকুল ইসলামকে সদস্য সচিব করে ৭১ সদস্য বিশিষ্ট সোনারগাঁও পৌরসভা জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৩০ নভেম্বর শনিবার রাতে সোনারগাঁও রয়েল রিসোর্টে আলোচনা সভার মাধ্যমে এই কমিটির অনুমোদন করেন জাতীয় পার্টির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, জাতীয় স্বেচ্ছাসেবক পার্টির কেন্দ্রীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির আহ্বায়ক ও নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা।

এর আগে গত ৩ মে স্থানীয় খোকার হাত ধরে জাতীয়পার্টিতে যোগদান করেন পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি এমএ জামান, উপজেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ও তার ভাই যুবদল নেতা খোরশেদ আলম, কাঁচপুর ইউনিয়ন শ্রমিকদলের সেক্রেটারি মোহাম্মদ হানিফ, তাঁতীদল নেতা মজিবুর রহমান, ছাত্রদল নেতা ওমর ফারুক টিটু সহ শতাধিক নেতাকর্মীরা।

এমএ জামান শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে পৌর বিএনপির সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন। বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়েই বড় পদ বাগানোর কারণে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। অনেকেই এসব নেতাদের হাইব্রিড নেতা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

জাতীয় পার্টির কমিটিতে যুগ্ম আহ্বায়ক পদে আছেন মোহাম্মদ আলী, পৌরসভার কাউন্সিলর নাসিম পাশা, কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মধু, কাউন্সিলর রফিকুল ইসলাম, কাউন্সিলর নাঈম আহমেদ রিপন, কাউন্সিলর দুলাল মিয়া, কাউন্সিলর শাহজালাল, মহিলা কাউন্সিলর পারভীন আক্তার, মহিলা কাউন্সিলর নুরুন্নাহার রিতা, সাবেক মহিলা কাউন্সিলর রোকসানা আক্তার, সাবেক কাউন্সিলর গরীব নেওয়াজ, সাবেক কাউন্সিলর জসিম উদ্দিন, মো. শহীদ মিয়া, লিংকন শিকদার, শাখাওয়াত হোসেন, জামাল উদ্দিন, কাউসার আহমেদ ও সাবেক কাউন্সিলর শামীম মীর।

এছাড়া সদস্য পদে আছেন আবু নাইম ইকবাল, পৌরসভার কাউন্সিলর জাহেদা আক্তার মনি, শাহীন মিয়া, ওমর ফারুক টিটু, হাজী আলমগীর, আব্দুর রউফ ভূঁইয়া, মজিবর রহমান, খোরশেদ আলম, চাঁন মিয়া, জাহাঙ্গীর হোসেন, শহীদ মিয়া, লাল মিয়া, কিশোর কুমার সরকার, হুমায়ুন কবিরম দারোগ আলী প্রধান, মাহে আলম, কামাল হোসেন, মাসুম মিয়া, লিটন মিয়া, সোলায়মান ব্যাপারী, খোরশেদ আলম, রাজু মিয়া, জসিম উদ্দিন মোল্লা, জহির মিয়া, ডা. আব্দুর কাদির, ডা. সাইফুল ইসলাম, রোকন চৌধুরী, বুলবুল আহম্মেদ, মজিবুর রহমান, আবু বকর চৌধুরী, খোকন মিয়া, মনির হোসেন, ইলিয়াস আলী প্রধান, গিয়াস উদ্দিন মোল্লা, মুছা খান, আল আমিন রিপন, সোনা মিয়া, অখিল উদ্দিন, আমিন উদ্দিন, বাদল মিয়া, শহিদুল ইসলাম রাজু, ফয়সাল হোসেন, আনিস মিয়া, নুরুল ইসলাম, মোহাম্মদ আলী খেজু, আবুল হোসেন, আমান উল্লাহ, নুরুল ইসলাম, কামাল হোসেন, আয়নাল হোসেন ও মোহাম্মদ হোসেন।

বিএনপি ছেড়ে জাতীয় পার্টিতে যোগদানকারী নেতাকর্মীদের বেশির ভাগই সাবেক প্রতিমন্ত্রী রেজাউল করিমের সঙ্গে রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। তবে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে টিটু ও হানিফের যোগদানের বিষয়টি। কারণ দুটি পরিবারই বিএনপির রাজনৈতিক পরিবার হিসেবে পরিচিত। এর মধ্যে হানিফের বড় ভাই সেলিম হক রুমি জেলা বিএনপির পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক, যুবদলের রাজনীতিতে শামীম ও আপেল, ছাত্রদলের রাজনীতিতে জড়িত ইকবাল হক। তাদের পিতা কাচপুর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ফজল হকও বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। কিন্তু এই পরিবারের সদস্য হানিফ গেল জাতীয় পার্টিতে। আবার টিটুর বড় ভাই হারুন অর রশীদ মিঠু জেলা যুবদলের সহ-সভাপতির পদে রয়েছেন। এর আগে তিনি জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। তার ছোট ভাই রিতুকেও বিএনপির বিভিন্ন মিটিং মিছিলে দেখা গিয়েছিল। তাদের বাবা সালাউদ্দীনও বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত। গত নির্বাচনের আগে দুটি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যরা নাশকতার মামলায় আসামি হয়। সেলিম হক রাজনীতি করেন মান্নানের বলয়ে। ফলে আরও বেশি সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে সোনারগাঁও বিএনপির রাজনীতিতে।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সভাপতি পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন রেজাউল করিম। সোনারগাঁও আসন থেকে একাধিকবার এমপি নির্বাচিতও হয়েছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। এক সময়কার প্রতাপশালী এই রাজনৈতিক গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাননি। বয়সও হয়েছে তার বেশ। সোনারগাঁয়ের রাজনীতিতেও আগের মত নেই তার প্রভাব প্রতাপ। ফলে তার বলয়ের নেতাকর্মীরা বেশ হতাশ। মান্নানের নেতৃত্বও তারা মানতে পারছেন না। ফলে রেজাউল করিমের লোকজন দল ত্যাগ করে জাতীয়পার্টিতে যোগদান করছেন।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁও) আসনে ধানের শীষ প্রতীকে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি খন্দকার আবু জাফর ও সেক্রেটারি আজহারুল ইসলাম মান্নান। চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয়ার আগে দুজনকেই মনোনয়ন দাখিলের নির্দেশনা থাকলেও খন্দকার আবু জাফর মনোনয়ন পত্র জমা দেননি। ওই সময় জাফর মিডিয়াতে মান্নানকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, যে নমিনেশন উচ্চারণ করতেই জানেনা, তার ড্যামী প্রার্থী হওয়ার চেয়ে মনোনয়ন পত্র জমা না দেয়াই ভাল। তাই জমা দেইনি।

নির্বাচনে চূড়ান্ত প্রার্থী হয়ে মান্নান রেজাউল করিমের বাসায় গিয়ে দোয়া চেয়ে আসলেও রেজাউল করিমের লোকজন ধানের শীষের পক্ষে কাজ করেননি। বিএনপির অধিকাংশ নেতাকর্মীরা মান্নানের পক্ষে মাঠে নামেননি। নির্বাচনে মাত্র একদিন খন্দকার আবু জাফরকে মান্নানের সঙ্গে সনমান্দি ইউনিয়নের গণসংযোগে দেখা যায়। নির্বাচনের পর খন্দকার আবু জাফরকে আর রাজনীতিতে দেখা যায়নি। এমনকি সোনারগাঁয়ের বিএনপির নেতাকর্মীদের নিয়ে তার কোন বৈঠক সভাও দেখা যায়নি। একইভাবে মান্নান কিছুদিন আড়ালে থাকলেও সোনারগাঁয়ের রাজনীতির মাঠে ফিরে এসেছেন। সোনারগাঁয়ের বিএনপি সহ জেলা বিএনপি ও এর অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের অনেক কমিটিতে তার লোকজনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।

২০১৪ সাল ও ২০১৮ সালের দুটি নির্বাচনের আগেই মনোনয়ন প্রত্যাশি হিসেবে নিজেদের দাবি করে মাঠে নেমেছিলেন কেন্দ্রীয় যুবদলের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ওয়ালিউর রহমান আপেল, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওয়াহিদ বিন ইমতিয়াজ বকুল ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক নেতা আজিজুল হক আজিজ। এরা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে ব্যানার পোস্টার ফ্যাস্টুনে বেশ আলোচিত ছিলেন এই তিন নেতা। তার চেয়ে কিছুটা কম ছিল গত নির্বাচনে। দলের মনোনয়নও কিনেছিলেন। তবে মনোনয়ন নেননি আজিজুল হক আজিজ। এসব নেতাদের এখন সোনারগাঁয়ে ছায়াও দেখা যাচ্ছেনা। তবে ওয়ালিউর রহমান আপেল নির্বাচনের আগেই মাঠে নামেন এবং জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রাজনীতি করেছেন বলেও এলাকায় গণসংযোগ করতে গিয়ে দাবি করেন। কখনও বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বন্ধু আবার কখনও বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে ভাবি সম্বোধন করে এলাকার নেতাকর্মীদের কাছে টানার চেষ্টা করেন। কিন্তু দলের হাল ধরার মত কার্যক্রমে তিনিও কখনও ছিলেন না।

এসব কারনে নেতাকর্মীরা বলছেন, সোনারগাঁয়ে রেজাউল করিম তার বয়সের কারনে রাজনীতি থেকে পিছু হটলে এখানে বিএনপি অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। কারন মান্নানের নেতৃত্ব মানতে নারাজ বিএনপির মাঠ পর্যায়ের যোগ্য নেতাকর্মীরা। নতুনরা নেতৃত্বে আসার চেষ্টা করলেও পকেট ভারি না থাকায় আবার পিছিয়ে যাচ্ছেন। সোনারগাঁয়ে নেতাকর্মীদের টু পাইস দিয়ে নিজের বগল বন্ধি করতে পারদর্শী আজহারুল ইসলাম মান্নান। ফলে সোনারগাঁয়ের বিএনপির রাজনীতি মান্নানের কব্জায় থাকলেও ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে সোনারগাঁয়ের বিএনপি। মান্নানের নেতৃত্বের কারনে এখানে বিএনপি জনপ্রিয়তাও হারাচ্ছে বলেও দাবি করছেন নেতাকর্মীরা। আর তার কারনেই দল ছাড়তে বাধ্য হচ্ছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও