চুনকা ও আইভীর সঙ্গে জামায়াতের দলিল প্রদর্শন করলেন শামীম ওসমান

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:০১ পিএম, ৭ ডিসেম্বর ২০১৯ শনিবার

চুনকা ও আইভীর সঙ্গে জামায়াতের দলিল প্রদর্শন করলেন শামীম ওসমান

নারায়ণগঞ্জে সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী ও তার বাবা প্রয়াত আলী আহাম্মদ চুনকার সঙ্গে জামায়াতের সম্পর্কের একটি রেজিস্ট্রি দলিল ও ফাঁস হওয়া অডিও টেপের কথা জানিয়েছেন শামীম ওসমান।

৭ ডিসেম্বর শনিবার দুপুরে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কে (নম পার্ক) এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

ওই সম্মেলনের বক্তব্যে শহরে হকার ইস্যুতে সৃষ্ট সংঘর্ষের ঘটনার ২২ মাস পর উচ্চ আদালতে শরনাপন্ন ও মামলা রেকর্ড হওয়ার পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র দেখছেন শামীম ওসমান যাঁকে ওই মামলায় প্ররোচনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, ২২ মাস পর মামলার পেছনে মুখ্য একটি উদ্দেশ্য হলো দেশে আইনের শাসন নাই সেটা বিদেশীদের কাছে প্রমাণ করা। কারণ ইতোমধ্যে প্রিয়া সাহার মত একজনকে আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠিয়ে যড়যন্ত করা হয়েছিল ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। এখন যখন খালেদা জিয়ার কারাবন্দীর কারণে বিএনপি দেশে আইনের শাসন নাই গলা ফাটিয়ে ফেলছে তখন ২২ মাস পরের এই মামলায় দেশী বিদেশী ষড়যন্ত্রের মধ্যে বিএনপি ও জামায়াতের সম্পৃক্ততা আছে। কারণ হকার ইস্যুর পরে নারায়ণগঞ্জের মেয়রের একটি অডিও প্রকাশ পেয়েছে যেখানে যুদ্ধাপরাধ অভিযোগে ইতোমধ্যে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদন্ড কার্যকর হওয়া আলী আহসান মুজাহিদের সখ্যতার বিষয়টি উঠে এসেছে।

২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় আদালতের নির্দেশে সদর মডেল থানায় মামলাটি রেকর্ড হয়েছে। ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওই মামলাটি রেকর্ড হয়। এর আগেরদিন নারায়ণগঞ্জের একটি আদালত মামলা রেকর্ড করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ১ হাজার জনকে আসামী করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে হত্যার চেষ্টা, জখম, নাশকতা, ভাঙচুর সহ অরাজকতার অভিযোগ আনা হয়েছে।

মামলায় অভিযুক্তরা হলেন যুবলীগ নেতা নিয়াজুল ইসলাম, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম, মহানগর আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জাকিরুল আলম হেলাল, শহর যুবলীগের সভাপতি শাহাদাৎ হোসেন সাজনু, মহানগর স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি জুয়েল হোসেন, জেলা ছাত্রলীগের সেক্রেটারী মিজানুর রহমান সুজন, যুবলীগ নেতা জানে আলম বিপ্লব, আওয়ামীলীগ নেতা নাছির উদ্দিন ও চঞ্চল মাহমুদ।

আইনের শাসন নাই প্রতিষ্ঠার চেষ্টা
শামীম ওসমান বলেন, ‘২২মাস পরে মামলার কারণ হল, জামায়াত বিএনপি, কিছু পত্রিকা ও ১/১১এর সাথে জড়িত কিছু সুশীল বলে বেড়াচ্ছে এদেশে আইনের শাসন নেই। একথা বলেই তারা একজন প্রিয়া সাহার মত মহিলাকে আমেরিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিল। শুধু প্রিয়া সাহা-ই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতির সাথে জড়িত এমন একজনকেও বিদেশে পাঠিয়ে প্রিয়া সাহার মত ঘটনা ঘটানোর চেষ্টা করা হয়েছিল। এই আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে বিএনপির সাথে সাথে এরাও বলে বেড়াচ্ছে, খালেদাকে বেআইনী ভাবে আটকে রাখা হয়েছে, এ দেশে আইনের শাসন নেই বলে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চোর, দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করে মানুষকে আগুনে পুড়িয়েছে। তারা বলে দেশে আইনের শাসন নাই। একের পর এক গ্রেনেড মেরে আমার নেত্রীকে মেরেছে তারা আইনের কথা বলে গণতন্ত্রের কথা বলে। সেই কথাটিকে প্রমাণ করার জন্যই আইভীকে দিয়ে ২২মাস পর এই মামলা করাতে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে আর বিবাদী করা হয়েছে রাষ্ট্রকে। আমরা বিস্মিত যে, আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে যিনি মেয়র হয়েছেন, যিনি জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি, যার নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা দিনরাত এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সেই আওয়ামীলীগের নেতাদের আসামী করেছেন।

প্রেক্ষাপট তৈরির পরিকল্পনা
শামীম ওসমান বলেন, আমরা শুনেছি এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ২টি পত্রিকা যারা ওয়ান এলেভেনের মত সৃষ্টি করেছিল, এনজিও এর সাথে জড়িত ২জন মহিলা। যারা ইতোমধ্যেই আইভীর এই হাইকোর্টের রীটের কাগজ পত্র বিভিন্ন এম্বাসী ও বিদেশী প্রভুদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কারণ তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে, দেখেন বিএনপির কথা আমাদের কথা বাদ দেন, খোদ আওয়ামীলীগের নেত্রী ও সরকারী দলের মেয়র হয়েই আইভী ন্যায় বিচার পাচ্ছে না বিধায় তাকে হাইকোর্টের দরজায় কড়া নাড়তে হয়েছে, হাইকোর্টের মাধ্যমে মামলা গ্রহণের নির্দেশনা আনতে হয়েছে। অর্থ্যাৎ দেশে আইনের শাসন নেই এটা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা আইভীকে দিয়ে এই কাজটি করিয়েছে। কারা এরা কোন সুশিল সমাজ? বড় বড় টিপ পড়ে। কোন এনজিওরা এটা করে আমরা সব জানি। 

জামায়াত সম্পৃক্ততা আইভীর
সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামায়াত সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, গত বছর  নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামাতের আমীর সাহেব যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন সেই সব কথাবার্তার রেকর্ড কিছু সাহসী সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। সেখানে জামাতের আমীরের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ১৯৭৫ এর ১৫আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে যখন আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী জেলাখানায়, বাড়ীঘরে থাকতে পারেনি, তখন মেয়র আইভীর পিতা মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব রাজাকারদের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও আলবদর প্রধান মাওলানা আলী আহসান মুজাহিদকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে মিটিং করতেন। আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব আদমজীর অফিসারদের জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন এবং এই আলী আহসান মুজাহিদের সাথে মিলে মাত্র ১০হাজার টাকা মূল্যে ১৯৭৬ সালে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আদর্শ স্কুলের জন্য। 

সভায় শামীম ওসমান ওই দলিলও প্রদর্শন করেন। তিনি বলেন, আদর্শ স্কুলের প্রিন্সিপাল ছিলেন আল বদর প্রধান যুদ্ধাপরাধী আলী আহসান মুজাহিদ, যে আদর্শ স্কুলে এক সময় শহীদ মিনার ছিল না, যেখানে অস্ত্রের ট্রেনিংও দেয়া হতো, যে আদর্শ স্কুলকে জামায়াত শিবির গড়ার কারখানা বলা হতো। জামায়াতের নেতা আরো বলেছিলেন, ফাঁসি হওয়া রাজাকার মুজাহিদের স্ত্রী ছিল আইভীর বান্ধবী। মুজাহিদ যখন জেলে মুজাহিদের ফাঁসির দাবীতে যখন পুরো দেশ উত্তাল তখন মুজাহিদের ছেলে মেয়েরা যখন জন্ম নিবন্ধন পাচ্ছিল না তখন মুজাহিদের স্ত্রীর অনুরোধেই আইভী রাজাকার মুজাহিদের স্ত্রী ও সন্তানদের জন্মনিবন্ধন করে দিয়েছিল। জামাতের নেতা মইনউদ্দিন সাহেব যেসব কথা বলেছিলেন, যে আইভীর সাথে বেগম খালেদা জিয়ার যোগাযোগ ছিল এবং এই আইভী বিএনপিতে যোগ দিতে গিয়েছিল কিন্তু জামাত চায়নি আইভী বিএনপিতে যোগ দিতে দেয়নি। কারণ শামীম ওসমানকে ঠেকানোর ক্ষমতা বিএনপি জামাতের নেই। তাই আইভীকে আওয়ামীলীগে থেকেই শামীম ওসমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে হবে, কারণ শামীম ওসমানকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারাই মানে আওয়ামীলীগকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। যেটা আইভী বিএনপিতে গিয়ে পারবে না। মাইনুদ্দিন আরো বলেছিলেন আইভীর মধ্যে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে কারণ সে জামাতের সব কাজ করে দেয়। বেগম জিয়ার সাথে আইভীর সমঝোতা ছিল নির্বাচনের পর সে বিএনপিতে যোগ দিবে তাই আইভীকে জয়ী করতে সমস্ত শ্রম ও আর্থিকভাবে সাহায্য করেছিল।

খালেদার বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ায় সুইটকে হত্যা
হকার ইস্যুতে করা মামলার ইস্যুতে তিনি বলেন, কে এই নিয়াজুল ? কেন তাকে আজকে প্রধান আসামী করা হয়। এই নিয়াজুলের পরিচয় হচ্ছে তার বড় ভাই নজরুল ইসলাম সুইট ২০০১ সালে বিএনপির আমলে যখন আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে অত্যাচার নির্যাতন হচ্ছে তখন ফ্যাসিস্ট খালেদা জিয়া নারায়ণগঞ্জে আসলে এই সাহসী নেতা কালো পতাকা প্রদর্শন করেছিল। একারণে তাকে সেদিন পুলিশ ও র‌্যাব দিয়ে গ্রেফতার করা হয়েছিল। তারপরে কোর্টে থেকে তাকে রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডের আসামীকে ডান্ডাবেড়ি অবস্থায় নিয়ে যাওয়া হয়। পরেরদিন নিয়াজুলের ভাই সুইটের লাশ আমরা রাস্তায় দেখতে পারি। অপরাধ একটা বঙ্গবন্ধুর স্লোগান দিয়েছিল।

নিয়াজুল
শামীম ওসমান হকার ইস্যু টেনে বলেন, ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জে হকারদের সাথে মেয়র আইভীর ঘটনার পর শুধুমাত্র তাকে রক্ষা করতেই মামলা গ্রহণ করেনি পুলিশ। আইভী অভিযোগ করেছিল তাকে হত্যার জন্য হামলা করা হয়েছিল আর নিয়াজুল তাকে গুলি করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু ভিডিও ফুটেজে স্পষ্ট দেখা গেছে, সকল বাহিনী দেখেছে, সকল সংস্থার লোকেরা দেখেছে কিভাবে নিয়াজুলকে ওইদিন হামলা করা হয়েছিল। সেই নিয়াজুল সেদিন যখন গাড়ি নিয়ে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিল। নামাজের জন্য গাড়ি থেকে নেমে যায়। প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেন, কেউ যদি কাউকে হামলা করতে যায় একা যাওয়ারতো কথা না। তার সাথে তো ২০-৫০ জন লোক থাকার কথা। মিনিমাম ১০ জনতো লোক থাকবে। একা একা হেটে যাচ্ছিল। যখন দেখেছে গরীব মানুষের পেতে লাথি মারা হচ্ছে। তখন নিয়াজুল একটাই প্রতিবাদ করেছিল, ‘মারছো কেন ভাই মেরোনা, মেরোনা তাকে।’ এই বলার অপরাধে তার উপর হামলা করা হয়। হামলা কে করলো ওই ভিডিও ফুটেজ আছে যা প্রকাশিত হয়েছে। আইভীর সাথে থাকা সকলেই ছিল বিএনপি-শিবিরের চিহ্নিত ক্যাডাররা, যা ভিডিও ফুটেজের মাধ্যমে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও বিশেষ বিশেষ সংস্থার লোকেরাও দেখেছে। ফলে থানায় মামলা নেয়া হয়নি। আদালতেও আইভীর মামলা একারণেই গ্রহণ করা হয়নি। আইভী যে মামলাটি করেছে সেটির তদন্ত করা উচিত। কেউ দোষী হলে শাস্তি হোক। কিন্তু আমরা পরিস্কার ভাবে বলতে চাই ভিডিও ফুটেজ দেখা হোক, নিয়াজুলের মামলাটিও গ্রহণ করা হোক। মামলা গ্রহণ করে কারা নিয়াজুলকে হত্যার জন্য হামলা করলো, কারা নিয়াজুলকে অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে তার লাইসন্স করা অস্ত্রটি ছিনতাই করলো, সেই অস্ত্র ৩দিন পর কিভাবে ফুলের টবে পাওয়া গেলে, এসবই প্রশাসন নিশ্চয়ই জানে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও