কোনভাবেই থামছে না কিশোর গ্যাং

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৪৭ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার

কোনভাবেই থামছে না কিশোর গ্যাং

নারায়ণগঞ্জে আবারো সক্রিয় ও বেপরোয়া হয়ে উঠতে শুরু করেছে কিশোর গ্যাং সদস্যরা। সবশেষ তাদের হামলায় আক্রান্ত হয়েছে একজন সাংবাদিকের পুত্র। এ নিয়ে চলছে নানা বিশ্লেষণ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনো কিশোর গ্যাং দমছে না। বরং দিন দিন তাদের কর্তৃত্ব ও আগ্রাসন বাড়ছে। বিশৃঙ্খলা জীবন যাপন করা এই গ্যাংয়ের সদস্যরা কারো নিয়ন্ত্রণে থাকেনা। যেকারণে তাদের কুকর্ম প্রকাশ্যে উঠে আসছে। তাছাড়া তাদের এই বেপরোয়া জীবন যাপনই তাদের জন্য কাল হয়ে উঠে। আর প্রত্যেকটি গ্যাংয়ের পতনের মূলে রয়েছে তাদের বেপরোয়া জীবন যাপন। তবে এদের লাগাম কিছুতেই টেনে ধরা সম্ভব হচ্ছেনা।

সবশেষ নারায়ণগঞ্জে সাংবাদিক রফিকুল ইসলাম জীবনের ছেলে আবু বকর হামিম সিদ্দিকের উপর সন্ত্রাসী হামলার অভিযোগে থানায় জিডি হয়েছে। ৮ ডিসেম্বর রোববার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শহরের চাষাঢ়ায় রেলস্টেশন সংলগ্ন সড়কে এ ঘটনা ঘটে। রফিকুল ইসলাম জীবন ইংরেজি দৈনিক নিউ এইজের জেলা প্রতিনিধি ও নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক। ঘটনার পর তিনি বাদী হয়ে ফতুল্লা মডেল থানায় জিডিটি দায়ের করেন।

জিডিতে অভিযোগ করা হয়, কলেজ রোডের রুপক স্যারের ব্যাচ থেকে কোচিং করে বাসায় ফেরার পথে হামিমকে চাষাঢ়ায় ডাকবাংলোর বিপরীতে সড়কে ১২ থেকে ১৬ বছর বয়সী ১০-১২ জন সন্ত্রাসী পথরোধ করে। কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই তাকে এলোপাথাড়ি মারধর শুরু করে। পরে হামিম ডাকবাংলোর মোড়ে ট্রাফিক পুলিশের কাছে আশ্রয় নেয়। সেখানেও ওই হামলাকারী সন্ত্রাসীরা এসে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে। পরবর্তীতে হামিমকে চাষাঢ়া পুলিশ বক্সে নিয়ে যায়। ওই স্থান থেকে পরে রফিকুল ইসলাম জীবন এসে নিয়ে যায়।

২ ডিসেম্বর রাতে প্রায় একশ সন্ত্রাসী নিয়ে ঘোষেরবাগে তান্ডব চালিয়েছে গ্যাং। ২০ থেকে ২৫ জনের একদল কিশোর গ্রুপ। হঠাৎ করেই তাদের বেপরোয়া আচরণ শুরু হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে ওই গ্রুপটি নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার বৃহত্তর মাসদাইরে কয়েকটি অলিগলিতে মহড়া দিচ্ছে। তাদের ভয়ে বন্ধ হয়ে যায় এলাকার দোকানপাট। লোকজন ভয়ে দ্রুত ঘরে ফিরতে শুরু করে। এক ভয়ানক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। এসব গ্যাং এর সদস্যদের বয়স ১৩ থেকে ২৪। তবে তাদের পেছনে যারা রয়েছে তারা মধ্যবয়স্ক। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কতিপয় নেতা ও বিভিন্ন সেক্টর দখল করে রাখা শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ছাড়াও আধিপত্য টিকিয়ে রাখার জন্য অনেকেই গ্যাং পালে। তবে কিছুদিন ধরে দেওভোগ মাদ্রাসা এলাকা, ভোলাইল, মাসদাইর গুদারাঘাট, মিস্ত্রীবাগ, ঘোষেরবাগ, বাড়ৈভোগ, পশ্চিম মাসদাইর সহ বিভিন্ন এলাকায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছে গ্যাং।

এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় ৫ জনের নাম উল্লেখ করে অভিযোগ করেছেন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম। পুলিশ এ মামলার ৩ নম্বর আসামী সমরাটকে গ্রেপ্তার করতে পারলেও মূলহোতা ফেরদৌসকে এখনো ধরতে পারেনি।

৩ সেপ্টেম্বর রাতে দেওভোগ এলাকায় মেয়র আইভীর বাড়ির পাশের বালুর মাঠ থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্রসহ আসিফ গ্যাংয়ের তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করে সদর থানা পুলিশ। প্রাথমিক জবানবন্দিতে হোতা আসিফ জানায়, তাদের গ্রুপে ৩০-৩৫ জন সদস্য। রাজনৈতিক বড়ভাইদের শেল্টারে তারা বিভিন্ন অপকর্ম করে বেড়ায়। এর আগে ইসদাইর এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের ৫০-৬০ জন সদস্য দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ব্যাপক তা-ব চালায়। এ সময় শতাধিক বাড়িঘর ভাঙচুর করে তারা। ওই ঘটনায় ফতুল্লা থানায় মামলা হলে পুলিশ আলাদা অভিযানে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করে।

২৪ অক্টোবর র‌্যাব-১১ এর একটি আভিযানিক দল ফতুল্লা থানাধীন উত্তর ইসদাইর গাবতলী এলাকায় একটি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে নারীদের উত্ত্যক্তকারী গ্যাংস্টার গ্রুুপের ৭ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে।

২০ অক্টোবর ফতুল্লা থানার ইসদাইরের কিশোর গ্যাং লিডার হিসাবে পরিচিত ত্রাস ইভনকে ১ দিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের আদেশ দিয়েছেন আদালত। স্থানীয় কিশোর ফারদিনকে নির্যাতন ও ছুরিকাঘাতে আহত করার অভিযোগে দায়েরকৃত মামলায় ১৯ অক্টোবর বিকেলে ইভনকে গ্রেফতার করে ফতুল্লা মডেল থানা পুলিশ। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

কিশোর গ্যাংদের নৃশংস হামলায় অনেকে প্রাণ হারিয়েছেন আবার অনেকে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। গত ৩ অক্টোবর পূর্ব শত্রুতার জের ধরে দুই শিক্ষার্থীকে পিটিয়ে মোবাইল সেট ও গলার চেইন ছিনিয়ে নিয়েছে বন্দরে কিশোর গ্যাং গ্রুপের সদস্যরা। ৪ আগস্ট বন্দরের অলিপুরা কবরস্থান এলাকায় পূর্ব শত্রুতার জের ধরে জাহাঙ্গীর হোসেন মানিক নামের এক যুবককে পিটিয়ে ও গলাকেটে হত্যার চেষ্টা করে তিন কিশোর। ২৩ আগস্ট ফতুল্লার বাবুরাইলে সালেমান হোসেন অপু (৩০) নামের যুবককে বাড়ি হতে ডেকে এনে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে আসামী পারভেজ (২৮)।

২৭ জুলাই ফতুল্লার দেওভোগ হাশেম নগর এলাকায় মোটর সাইকেলের লাইটের আলো চোখে পড়ায় ক্ষিপ্ত হয়ে শাকিলকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ৩১ জুলাই ফয়সাল (১৯) নামে কিশোর শহরের খানপুর বরফকল এলাকায় বান্ধবীর মোবাইল ফিরিয়ে দিতে গেলে তাকে পিটিয়ে হত্যা করে ৫ কিশোর। ২২ আগস্ট গোলাকান্দাইল এলাকায় সন্ত্রাসীরা জিসান হোসেনকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করা হলে পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সে মারা যায়।

নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সকল সদস্যের পক্ষ থেকে সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম ও সাধারণ সম্পাদক হাসানুজ্জামান ভূইয়া শামীম বিবৃতিতে বলেন, বিষয়টি স্পষ্টতই পূর্ব পরিকল্পিত। একজন সাংবাদিকের শত্রু থাকবে এটা স্বাভাবিক। তার জন্য তার পরিবার কিংবা সন্তানের উপর হামলা ও শারিরীক নির্যাতন কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায়না। বর্তমানে সাংবাদিক জীবনের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরপত্তাহীনতায় রয়েছে। তারা বলেন, সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের কোন ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই দিন দিন নারায়ণগঞ্জের সর্বত্র সন্ত্রাসীরা সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের উপর বার বার আক্রমন করছে। এসময় তারা অভিলম্বে এই ঘৃন কাজের হোতাসহ সকল সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার দাবী জানান।

নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে পেশাদার সাংবাদিক প্লাটফর্ম। এক বিবৃতিতে তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত পুর্বক দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কাছে। বিবৃতিতে তারা বলেন, বিষয়টি স্পষ্টতই পূর্ব পরিকল্পিত। একজন সাংবাদিকের শত্রু থাকবে এটা স্বাভাবিক। তার জন্য তার পরিবার কিংবা সন্তানের উপর হামলা ও শারীরিক নির্যাতন কোনো ভাবেই মেনে নেয়া যায়না। বর্তমানে সাংবাদিক জীবনের পরিবারের সদস্যরা চরম নিরপত্তাহীনতায় রয়েছে।

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আরো ব্যাপকভাবে তৎপর হতে হবে। অন্যাথায় সন্ত্রাসীরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠবে। তাই বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করে ঘটনার সাথে জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনে আওতায় আনার জন্য প্রশাসনের কাছে দাবী জানাচ্ছি।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও