শামীম ওসমান পন্থীদের বিরুদ্ধে মামলায় বাকযুদ্ধের উত্তাপ

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫১ পিএম, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ মঙ্গলবার

শামীম ওসমান পন্থীদের বিরুদ্ধে মামলায় বাকযুদ্ধের উত্তাপ

সারা দেশ ব্যাপী আওয়ামী লীগের রাজনীতিক প্রতিক নৌকাকে আরো শক্তিশালী করতে চলছে শুদ্ধি অভিযান। দলের ভেতরে থাকা অনুপ্রবেশকারী সহ বিতর্কিতদের বিরুদ্ধে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে। এই অবস্থায় নারায়ণগঞ্জের আওয়ামী লীগ ধ্বংসের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ তুলেছে দুই বলয়ের নেতাকর্মীরা। দুই বলয়ের একটিতে মেয়র আইভী ও অন্যটিতে এমপি শামীম ওসমানের নেতৃত্বে তাদের নেতাকর্মীরা রয়েছেন। দীর্ঘ ২২ মাস পর শামীম ওসমান বলয়ের নেতাদের বিরুদ্ধে আইভীর পক্ষে মামলা নিয়ে নতুন বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এতে করে চারদিকে আলোচনা সমালোচনা ঝড় বইছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জামাত-শিবিরের সাথে সম্পৃক্ততা সহ আওয়ামীলীগ সরকারের বিচারহীনতার নানা দিক তুলে ধরে নারায়ণগঞ্জে আওয়ামীলীগের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ দোষারোপ চলছে। এতে করে আওয়ামীলীগের বদনামে দলটির নেতাকর্মীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কাজ করছে তা পরিষ্কার হয়েছে। তাদের রেশারেশির কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচেছ।

৭ ডিসেম্বর নাসিম ওসমান মেমোরিয়াল পার্কে (নম পার্ক) ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সম্মেলনে হকার ইস্যুতে করা মামলা প্রসঙ্গে এমপি শামীম ওসমান বলেন, ‘২২মাস পরে মামলার কারণ হল। তারা বলে দেশে আইনের শাসন নাই। সেই কথাটিকে প্রমাণ করার জন্যই আইভীকে দিয়ে ২২মাস পর এই মামলা করাতে হাইকোর্টে পাঠানো হয়েছে আর বিবাদী করা হয়েছে রাষ্ট্রকে। আমরা বিস্মিত যে, আওয়ামীলীগের মনোনয়ন নিয়ে যিনি মেয়র হয়েছেন, যিনি জেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি, যার নির্বাচনে আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা দিনরাত এক করে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। সেই আওয়ামীলীগের নেতাদের আসামী করেছেন।

শামীম ওসমান বলেন, আমরা শুনেছি এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে ২টি পত্রিকা যারা ওয়ান এলেভেনের মত সৃষ্টি করেছিল, এনজিও এর সাথে জড়িত ২জন মহিলা। যারা ইতোমধ্যেই আইভীর এই হাইকোর্টের রীটের কাগজ পত্র বিভিন্ন এম্বাসী ও বিদেশী প্রভুদের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং হচ্ছে। কারণ তারা প্রমাণ করতে চাচ্ছে, দেখেন বিএনপির কথা আমাদের কথা বাদ দেন, খোদ আওয়ামীলীগের নেত্রী ও সরকারী দলের মেয়র হয়েই আইভী ন্যায় বিচার পাচ্ছে না বিধায় তাকে হাইকোর্টের দরজায় কড়া নাড়তে হয়েছে, হাইকোর্টের মাধ্যমে মামলা গ্রহণের নির্দেশনা আনতে হয়েছে। অর্থ্যাৎ দেশে আইনের শাসন নেই এটা প্রতিষ্ঠিত করতে তারা আইভীকে দিয়ে এই কাজটি করিয়েছে। কারা এরা কোন সুশিল সমাজ? বড় বড় টিপ পড়ে। কোন এনজিওরা এটা করে আমরা সব জানি।

সিটি করপোরেশনের মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভীর জামায়াত সম্পৃক্ততা প্রসঙ্গে শামীম ওসমান বলেন, গত বছর নারায়ণগঞ্জ জামায়াতে ইসলামের আমীর মাওলানা মাঈনউদ্দিন আহমদ নাশকতার অভিযোগে গ্রেফতার হয়েছিলেন। পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জামাতের আমীর সাহেব যে স্বীকারোক্তি দিয়েছিলেন সেই সব কথাবার্তার রেকর্ড কিছু সাহসী সাংবাদিকদের মাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল। সেখানে জামাতের আমীরের বক্তব্যে উঠে এসেছে, ১৯৭৫ এর ১৫আগষ্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর নারায়ণগঞ্জে যখন আওয়ামীলীগের অধিকাংশ নেতাকর্মী জেলাখানায়, বাড়ীঘরে থাকতে পারেনি, তখন মেয়র আইভীর পিতা মরহুম আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব রাজাকারদের নেতা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী ও আলবদর প্রধান মাওলানা আলী আহসান মুজাহিদকে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে মিটিং করতেন। আলী আহাম্মদ চুনকা সাহেব আদমজীর অফিসারদের জায়গা দখল করে নিয়েছিলেন এবং এই আলী আহসান মুজাহিদের সাথে মিলে মাত্র ১০হাজার টাকা মূল্যে ১৯৭৬ সালে বিক্রি করে দিয়েছিলেন আদর্শ স্কুলের জন্য।

নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহা বলেছেন, ‘২২ মাস পরে মেয়র মামলা করেছে। শাহ নিজাম, জাকিরুল আলম হেলাল, সাজনুকে আসামী করে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। আমার প্রশ্ন, আপনি কি প্রিয়া সাহার মতো, খালেদা জিয়ার মতো হতে চান। এই মামলা আওয়ামী লীগের জন্য অসনি সংকেত। উনি মামলায় বিবাদী করেছে সরকারকে। সরকারী দলের লোক হয়ে সরকার দলীয় লোকদেরকে বিবাদী করেছেন। উনি এই মামলার মাধ্যমে কি প্রমাণ করতে চান।’

খোকন সাহা আরো বলেন, ‘উনার (আইভী) সাথে সংঘর্ষ হয়েছে হকারদের। আর উনি মামলা করেছেন নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। আমরা জানি কার ইঙ্গিতে এসব করা হচ্ছে। এর পিছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী চিন্তা। মার খেয়েছে নিয়াজুল। মামলা করার কথা নিয়াজুলের। কিন্তু নিয়াজুল নিজ দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করে নাই। বিএনপি জামায়াতকে খুশি করার জন্যই এই মামলা দায়ের করা হয়েছে। এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না।’

এর প্রেক্ষিতে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আব্দুল কাদির বলেন, জামায়াতের সম্পৃক্ততার কথা যে বলে তার (শামীম ওসমানের) সাথে জামায়াতের সখ্য অনেক। বিগত দিনগুলোতে হেফাজতে ইসলামের মানুষ দিয়ে সে মিছিল মিটিং বৈঠক করেছে। কোর্ট থেকে বের করে জামায়াতে ইসলামের লোকের সাথে কথা হয়েছে, এগুলো আমরা পত্রিকার মাধ্যমে আমরা দেখতে পাই। মিথ্যা ছলনা দিয়ে নারায়ণগঞ্জের পরিবেশকে নষ্ট করার কাজে শামীম ওসমান জড়িত। মিথ্যার মধ্যে তিনি ডুবে থাকেন। এখন আর কথা খায় না। একদিন মিথ্যা মিথ্যায় তার জীবনটা রচিত হবে।

কাদির শামীম ওসমান প্রসঙ্গে আরো বলেন, তিনি তো প্রত্যেকটা কথার মধ্যে ধরা খেয়ে যান। বিএনপি জামায়াত, জাতীয় পার্টির লোকজন যারা স্বাধীনতার বিরোধীতা করছে তারা তার কমিটির মধ্যে রয়েছে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় যেসব নির্বাচন হচ্ছে, সবগুলোতেই স্বাধীনতা বিপক্ষের শক্তিকে পাওয়া যায়। নারায়ণগঞ্জ ক্লাব ও রাইফেল ক্লাব সহ অনেক জায়গায় জামায়াত শিবিরের লোকদের কমিটিতে আনছে। তারা নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ধ্বংসের ধারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। ভালো লোকের মূল্যায়ণ নাই। মানুষ অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না। শামীম ওসমান একজন রাজনৈতিক বিচক্ষণ ব্যক্তি। তার প্রপাগান্ডার কারণেই সে জাতীয় নেতা হতে পারে না। মিথ্যা ও আর জামায়াত শিবিরের লোকদের নিয়ে কাজ করে অন্যের উপর দোষ চাপাতে চায়। সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনেও আইভীর বিপক্ষের প্রার্থী সাখাওয়াতকে টাকা দিয়েছে। শামীমরা আওয়ামী লীগকে কিভাবে ধ্বংস করবে সেটা নিয়েই তারা ব্যস্ত থাকে। শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের মধ্যে জাতীয় নেতা হিসেবে পদ পাইতেন। তার দুইটা কারণেই নিজকে নারায়ণগঞ্জের গন্ডির মধ্যে রেখে দিছে। একটি হলো সে বেশি মিথ্যা কথা বলে। আরেকটি হলো, সে মনে করে আমিই নারায়ণগঞ্জে থাকবো, আর কেউ থাকবে না। এই দুই কারণেই তার অবস্থান তুলে ধরতে পারেন না। তিনি সবসময় তার প্রতিপক্ষ দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন। তার গুণাবলী ছিল সে গুণাবলি সত্যভাবে উপস্থাপন করতে পারলে সে জাতীয় নেতা হতে পারতো।

প্রসঙ্গত ২০১৮ সালের ১৬ জানুয়ারী নারায়ণগঞ্জ শহরে ফুটপাতে হকার বসানো নিয়ে সংঘর্ষের ঘটনায় আদালতের নির্দেশে সদর মডেল থানায় মামলাটি রেকর্ড হয়েছে। ৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ওই মামলাটি রেকর্ড হয়। এর আগেরদিন নারায়ণগঞ্জের একটি আদালত মামলা রেকর্ড করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নিতে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ওসিকে নির্দেশ দেন।

মামলায় ৯ জনের নাম উল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো ১ হাজার জনকে আসামী করা হয়েছে। অভিযুক্তদের সবাই ওসমান বলয়ের অনুগামী হিসেবে পরিচিত। মামলার এজাহারে বাদী উল্লেখ করেন, বিবাদীরা সকলেই এমপি শামীম ওসমানের ইন্ধনে ও প্ররোচনায় উক্ত ঘটনা ঘটায়।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও