শামীম ওসমানের ‘পবিত্র’ শহরে কলঙ্ক

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১১:০৩ পিএম, ৮ ফেব্রুয়ারি ২০২০ শনিবার

শামীম ওসমানের ‘পবিত্র’ শহরে কলঙ্ক

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত একজন শামীম ওসমান। ইতোমধ্যে কয়েকটি রেকর্ড গড়েছেন। এগুলো আর কেউ ভাঙতে পারেনি। সবশেষ নারায়ণগঞ্জে সর্ববৃহৎ ঈদের জামাত আয়োজন করে রীতিমত প্রতিপক্ষের শিবিরের অনেকেরেই প্রশংসা পেতে শুরু করেছেন।

এছাড়া শামীম ওসমান প্রায়শই বিভিন্ন ওয়াজ মাহফিলে গিয়ে কোরআন হাদিস আলোকে বক্তব্য রাখছেন। হাতে কোরআন শরীফ রেখেও এটা পড়ার আহবান রাখছেন তরুণ প্রজন্মের কাছে। তিনি কিভাবে হতাশা থেকে আলোর পথ দেখেছেন কোরআনের মাধ্যমে সে উদহারণও দিচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শামীম ওসমানের রেকর্ডগুলোর মধ্যে তিনটি বেশ আলোচিত। একটি নারায়ণগঞ্জের কলংক হিসেবে পরিচিতি পাওয়া টানবাজার পতিতাপল্লী উচ্ছেদ, নারায়ণগঞ্জ থেকে প্রথম যুদ্ধাপরাধীদের দাবী উঠানো ও সবশেষ বৃহৎ ঈদের জামাতের আয়োজন। কিন্তু এবার সেই শামীম ওসমানের এলাকাতেই গড়ে উঠেছে মদের বার। আর এ মদের বার নিয়ে ইতোমধ্যে ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে। সমালোচনায় বিদ্ধ এ মদের বার। ইতোমধ্যে নারায়ণগঞ্জের আলেম ওলামারা বৃহৎ সমাবেশ করে আগামী ৭ দিনের আলটিমেটাও দিয়েছে।

সর্বত্র যখন এ বিষয়টি নিয়ে বেশ আলোচনা সমালোচনা তখন আলেম ওলামারা মনে করছেন শামীম ওসমান উদ্যোগ নিলেই বন্ধ হয়ে যাবে বারটি। আবারো কলংকমুক্ত হবে নারায়ণগঞ্জ।

গত ২ বছর ধরেই নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বৃহৎ ঈদ জামাতের আয়োজন করে সফল হয়েছেন এমপি শামীম ওসমান। নারায়ণগঞ্জ ঈদগাহ ও একেএম সামছুজ্জোহা স্টেডিয়ামে আয়োজন হলেও দুই মাঠ ভরে যাওয়ায় জায়গা না পেয়ে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরাতন সড়কে ও একটি মাদ্রাসার ছাদের উপরও ঈদের নামাজ আদায় করেছেন মুসল্লিরা। এতে করে মুসল্লিরা সবাই শামীম ওসমানের প্রশংসা করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শামীম ওসমান নারায়ণগঞ্জের পাশাপাশি দেশজুড়ে আলোচিত হয়েছিলেন ১৯৯৬ সালে প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়ে। সেবার নির্বাচিত হওয়ার পর ১৯৯৯ সালের ২৪ জুলাই তৎকালীন সময়ে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমান নগরীর টানবাজার এলাকার প্রায় ১১০ বছরের পতিতা পল্লী উচ্ছেদ করে জেলার দীর্ঘ দিনের কলংক মুক্ত করেছিলেন। এতে করে দেশজুড়ে আলোচিত হন তিনি।

২০০০ সালের ১৬ এপ্রিল সরকারী তোলারাম কলেজে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম নামের একটি ভবন নির্মাণের উদ্ধোধন করা হয়। সেদিন বরেণ্য বুদ্ধিজীবি হাসান ইমাম, সামছুর রহমান, শাহরিয়ার কবির, মুনতাসির মামুন, কবির চৌধুরী, ফেরদৌসি প্রিয়ভাষিনী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে কলেজ প্রাঙ্গনে মুক্তমঞ্চের সমাবেশ থেকে রাজাকার, স্বাধীনতা ও যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবী করা হয়।

সেদিন সমাবেশ শেষে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডে নারায়ণগঞ্জে গোলাম আজম, দেলোয়ার হোসেন সাইদী ও আলী আহসান মুজাহিদকে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। ওই সমাবেশের ৩দিন পর মুন্সীগঞ্জে একটি কর্মসূচী ছিল নিজামী। কিন্তু তারা সেই অনুষ্ঠানে যেতে পারেনি নিজামী।

এছাড়া ওই বছরেই নারায়ণগঞ্জ শহরের ডিআইটি বাণিজ্যিক এলাকায় প্রতীকি বিচার করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য সাঈদী, গোলাম আজম, নিজামীর ফাঁসি দেওয়া হয় প্রতীকি ভাবেই।

সম্প্রতি একাধিক সমাবেশে শামীম ওসমান বলেন, ‘পরিষ্কারভাবে একটি কথা বলতে চাই, আমি শামীম ওসমান ব্যক্তিগতভাবে আগে অন্য কিছুর উপর ভরসা করতাম। কোমরে হাত দিতাম। এখন ভরসা করি একমাত্র আল্লাহর উপর। সাহায্য করার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট আর কারো দরকার নাই। টানবাজার থেকে তখন প্রতিদিন থানা পেত ৪৫ লাখ টাকা। এগারো হাজার মেয়ে ছিল যাদের বয়স ৯ থেকে ১১ বছর। টেলিভিশনে এখন কথা বলেন এমন নামকরা লোক, সুশীল সমাজ এখান থেকে ৩০০ মেয়ে নিতো প্রতিমাসে। তাদের পুনর্বাসন দেখিয়ে জনপ্রতি তখন ৫০ হাজার টাকা নিতো। ৫ হাজার টাকা খরচ করে এই ৩০০ মেয়েকে আবার নারায়ণগঞ্জে ফেরত নিয়ে আসতো। চোরাচালান, মাদকের ব্যবসা চলতো এখানে। সন্ত্রাসীদের স্বর্গরাজ্য ছিলো এখানে। আমি তখন নিয়ত করেছিলাম যদি এই নিষিদ্ধ পল্লী উঠে যায় প্রয়োজন হলে আমি এমপিত্ব ছেড়ে দেবো। আমার নেত্রী আমাকে এটি উচ্ছেদ করতে বলেছিলেন। এবং বলেছেন ভালো কাজ করতে গেলে বাধা আসবেই। প্রত্যেকটি মসজিদের ইমাম সাহেবদের নিয়ে, মন্দিরের পুরোহিতদের সাথে, গীর্জার পাদ্রীর সাথে বসেছি। ওই সুশীল সমাজ, ওই তথাকথিত এনজিওরা আমাকে এমন কিছু খারাপ নাই যে বানায় নাই। আজমীর শরীফের খাদেমকে কন্ট্রাক্ট করা হয়েছিলো আমাকে প্রস্তাব দেয়ার জন্য। প্রস্তাবটি হলো আমি যদি দুইদিন দেশের বাইরে থাকি তাহলে আমারে তখনকার সময়ে ২০ কোটি টাকা দেবে। খাদেম বলেছিলো এসব প্রস্তাব নিয়ে আমার কাছে আইসো না। পরে আমরা গিয়ে পতিতাপল্লী উচ্ছেদ করলাম।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাঢ়ায় বালুর মাঠ এলাকায় প্যারাডাইস ভবনে ‘ব্লু পিয়ার’ নামক রেস্টুরেন্ট কাম মদের বার বন্ধে প্রভাবশালী শামীম ওসমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় আলেম ওলামারা। তাঁরা বলেছেন, সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমান উদ্যোগ নিলে কোনভাবেই চাষাঢ়াতে বার থাকতে না।

প্রসঙ্গত শহরের চাষাঢ়ায় বালুর মাঠ এলাকায় প্যারাডাইস ভবনে ‘ব্লু পিয়ার’ নামক রেস্টুরেন্ট উদ্বোধনে এবার আনুষ্ঠানিকভাবেই মদ বিয়ার বিক্রি শুরু হয়েছে। সম্প্রতি উদ্বোধনের সময়ে মালিক পক্ষ মূলত রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কথা জানালেও ৪ ফেব্রুয়ারী থেকে সেখানে কিছুটা গোপনে মদ ও বিয়ার বিক্রি শুরু হয়েছে নিশ্চিত হওয়া গেছে। রাতে মদ পান শেষে অনেকেউ উল্লাস করতে করতে বের হয়।

ডিআইটি মসজিদের খতিব ও নারায়ণগঞ্জ জেলা উলামায়ে পরিষদের সভাপতি আব্দুল আউয়াল বলেন, আমি সেলিম ওসমান ও শামীম ওসমানকে উদ্দেশ্য করে বলছি আপনারা একটু নজর দেন। নারায়ণগঞ্জের তৌহিদি জনতা একত্রিত হয়েছে এই মদের বার উচ্ছেদ করার জন্য। আপনার এক অর্ডারে এখান থেকে মদের বার উৎখাত হয়ে যাবে। ২৪ ঘণ্টা লাগবে মদের বার সরতে। যদি আপনারা বন্ধ না করেন তাহলে তৌহিদি জনতা উচ্ছেদ করবে। মদের বার বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি যাবো না। নারায়ণগঞ্জের মাটিকে আর অপবিত্র করতে দেয়া হবে না।

অনৈসলামিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটির আমির আতিকুর রহমান নান্নু মুন্সি বলেন, আমরা বুড়ো মানুষ, যা ঘটছে নারায়ণগঞ্জের প্রশাসন তা জানে না। কিন্তু নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম ওসমান জানে। শামীম ভাই আমরা চায় আমরা আবার মাঠে নামি। আপনি যেভাবে পতিতালয় উচ্ছেদ করেছেন ঠিক সেভাবে মদের বার উচ্ছেদ করেন। শুধুমাত্র আপনার একটি কথা। অন্যথায় কি অবস্থা হতে পারে একমাত্র আল্লাহ পাকই ভাল জানে।

মুফতি হারুনুর রশিদ বলেন, প্রশাসন ও শামীম ওসমান বিভিন্ন সভা সমাবেশে মাদকের বিরুদ্ধে জেহাদ ঘোষণা দিয়ে থাকেন। কিন্তু তারা কি মাদক ব্যবসায়ীদের মদদদাতাদের দেখেন না।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও