দুর্ধর্ষ পলাশের দুর্গে হানা

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩১ পিএম, ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সোমবার

দুর্ধর্ষ পলাশের দুর্গে হানা

দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় থাকলেও খেলাধুলা ও সামাজিক কর্মকান্ডে সচল রয়েছেন নারায়ণগঞ্জের পাগলার বহুল আলোচিত সমালোচিত দুর্ধর্ষ খ্যাত কাউসার আহমেদ পলাশ। শ্রমিকদের একটি বড় সেক্টর তার অধীনে। অনেকেই তাকে ডাকেন শ্রমিক বান্ধব নেতাও। যদিও এর পেছনে রয়েছে বিতর্কিত ইতিহাস।

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি প্রার্থী হতে চাইলেও মামলার তথ্য গোপন আর স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে শতকরা একভাগ ভোটারের সাক্ষর জমা দিতে পারেনি তিনি। বাদ হয়ে যায় মনোনয়নপত্র। ভোটের আগে চলে যান ওমরা হজে।

যদিও এ পলাশের নিয়ন্ত্রনে ফতুল্লার লোড আনলোড, ব্যাটার চালিত ইজিবাইক, ট্রাক চালক ও শ্রমিক ইউনিয়ন সহ শ্রমিক সংশ্লিষ্ট অনেক সেক্টর। এবার সেই পলাশের রাজ্যেই ক্রমশ হানা দেওয়া হচ্ছে। ইতোমধ্যে সেখানে অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি সংবর্ধনার অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের নেতারাও।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৮ ফেব্রুয়ারী ফতুল্লার পাগলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পাগলা বাজার সমিতির উদ্যোগে মুজিব জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এবং ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের নব-নির্বাচিত সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদল ও সাধারণ সম্পাদক শওকত আলীকে গণসংবর্ধনা প্রদান করা হয়। সেখানে ঠাঁই হয়নি পলাশের। পাগলা বাজার কমিটির সাবেক সভাপতি শাহ আলম গাজী টেনুর সভাপতিত্বে কমিটির সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও সাধারণ সম্পাদক বাচ্চুর তত্ত্বাবধায়নে বক্তব্য রাখেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদল, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সভাপতি এম সাইফউল্লাহ বাদল, সাধারণ সম্পাদক শওকত আলী, মহানগর আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শাহ নিজাম, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এইচএম ইসহাক, সাবেক কৃষি বিষয়ক সম্পাদক ইউনুছ দেওয়ান, সদর উপজেলার মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান ফাতেমা মনির, জেলা পরিষদের সদস্য মোস্তফা হোসেন চৌধুরী, জাহাঙ্গীর হোসেন, কুতুবপুর ইউনিয়ন ২নং ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সভাপতি আলাউদ্দিন হাওলাদার, ফতুল্লা থানা স্বেচ্ছাসেবকলীগের সভাপতি ফরিদ আহম্মেদ লিটন, জেলা যুবলীগের সদস্য এসএম খোকন, ফতুল্লা থানা আওয়ামীলীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক জাহেদুল হক খোকন, যুব ও ক্রীয়া বিষয়ক সম্পাদক শফিউদ্দিন সফি, কাশিপুর ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত) আইয়ুব আলী, সাধারণ সম্পাদক এমএ সাত্তার, বক্তাবলী ইউনিয়ন আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক কামরুল ইসলাম, সাংগঠনিক সম্পাদক মো: বাবুল মিয়া, ফতুল্লা থানা যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রেহান শরীফ বিন্দু, থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এমএ মান্নান, কুতুবপুর আওয়ামীলীগ নেতা জাহাঙ্গীর আলম প্রমুখ।

পাগলা এলাকার একাধিকজন জানান, ওই সংবর্ধনার আড়ালেও ছিল রাজনীতি। মূলত পাগলা ও আলীগঞ্জ এলাকাতে পলাশ বিরোধী গ্রুপকে সক্রিয় করতেই ওই সংবর্ধনার আয়োজন করা হয়। সেখানেও বক্তব্য দেওয়া হয় যাতে বিতর্কিতদের প্রশ্রয় দেওয়া না হয়। ওই শো ডাউনেও মূলত একটি বার্তা দেওয়া হয়েছে।

ওই অনুষ্ঠানে জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ মোহাম্মদ বাদল বলেন, আমরা অন্যায়ের কাছে কোন আপোষ করবো না। শামীম ওসমান এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সুখ দেয়ার জন্য দিন রাত খেটে মরছে আর আপনারা দলের নাম ভেঙ্গে অপকর্ম করবেন তা কিছু হতে দেয়া যাবে না। দলের নাম ভেঙ্গে কেউ অপরাধ করবে তা কিছুতেই মেনে নিবো না। ভাল লোকেরা আওয়ামীলীগের দায়িত্ব পালন করবে। যাদেরকে আমাদের মা বোনেরা এবং মুরুব্বীরা ভাল বলবে তারাই দলের নেতৃত্ব দিবে।

পাগলা ও আলীগঞ্জ এলাকা ঘুরে জানা গেছে, পাগলা, আলীগঞ্জ ও ফতুল্লা এলাকাতে বুড়িগঙ্গার তীরে অন্তত ১৫টি ঘাট হতে দৈনিক নৌ যান হতে মালামাল লোড আনলোড হয়। সেখানে প্রত্যেক শ্রমিকের কাছ থেকে মজুরি হতে প্রতিদিন মোটা অংকের টাকা কেটে নেওয়া হতো। বিভিন্ন সংগঠনের নামে এসব টাকা কেটে নেওয়া হলেও সংগঠনগুলো ছিল পলাশের নেতৃত্বে।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লায় কুতুবপুর ইউনিয়নে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশা (ইজিবাইক) থেকে জাতীয় শ্রমিকলীগের শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কাউসার আহাম্মেদ পলাশের নেতৃত্বে বছরে ৫৭ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগ করেছে ব্যাটারীচালিত অটোরিকশার মালিক ও শ্রমিকরা। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করলে কিংবা চাঁদা দিতে দেরী হলে শ্রমিকদের উপর নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ।

কুতুবপুর ছাড়াও পঞ্চবটি, ফতুল্লা ও আশেপাশের কয়েকটি স্ট্যান্ড থেকেও প্রতিদিন করা হতো চাঁদাবাজী। পাগলার ট্রাক স্ট্যান্ড থেকেও তোলা হতো মোটা অংকের টাকা।

তবে দেরিতে হলেও কিছুটা কৌশলীভাবে পলাশের এসব অপ রাজ্যে হানা দিতে দেখা যাচ্ছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। অচিরেই এসব বিষয় ক্রমশ দৃশ্যমান হবে মনে করা হচ্ছে।

সম্প্রতি ফতুল্লার পঞ্চবটি এলাকায় অভিযান চালিয়ে পলাশ অনুগামী ৪ জন চাঁদাবাজকে চাঁদাবাজির অর্থ ও রশিদসহ আটকের পরে মামলা দায়ের করেছিল ফতুল্লা মডেল থানার পুলিশ। ওই মামলায় পলাশ অনুগামী আজিজুল হকসহ আরো দু’জনকে আসামী করা হয়েছিল।

জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জে আরেক ‘নূর হোসেন ফতুল্লার গডফাদার পলাশ ও তার চার খলিফা’ শিরোনামে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয়। এছাড়া পলাশের কোন নাম না থাকলেও একটি সংবাদের রেশ ধরে সময়ের নারায়ণগঞ্জ, ডান্ডিবার্তা ও অনলাইন নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের ৫ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ২০ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন ও দুইটি তথ্য প্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় মামলা করেন। এর মধ্যে দৈনিক যুগান্তরের ফতুল্লা প্রতিনিধি আলামিন প্রধানের বিরুদ্ধে ১০ কোটি, ইত্তেফাকের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা ও স্থানীয় দৈনিক ডান্ডিবার্তা পত্রিকার সম্পাদক হাবিবুর রহমান বাদলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি এবং দৈনিক সময়ের নারায়ণগঞ্জ পত্রিকার সম্পাদক জাবেদ আহমেদ জুয়েলের বিরুদ্ধে ৫ কোটি টাকার মানহানি মামলা করেন। একই সঙ্গে আলামিন প্রধান ও নিউজ নারায়ণগঞ্জ ডটকমের নির্বাহী সম্পাদক তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে দুইটি ৫৭ ধারায় মামলা করেন।

ওই সংবাদ প্রকাশের পর শুধু মামলা নয় তার বাহিনীর সদস্যরা ফতুল্লায় মিছিল করে সাংবাদিকদের চামড়া তুলে নেওয়ার হুমকি দেয়।

‘এক পলাশেই সর্বনাশ’ শিরোনামে ও নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকলীগের নাম তা-ব, চাঁদার জন্য ৩৬ শিল্প-কারখানা বন্ধ, এলাকা ছাড়ছেন ব্যবসায়ীরা’ বিশেষণে বাংলাদেশ প্রতিদিন পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হয় যা নিয়ে রীতিমত তোলপাড় হয়।

নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী শ্রমিকলীগ নেতা কাউসার আহম্মেদ পলাশ এবার সবকূল হারিয়েছে। বিতর্কিত কর্মকান্ডের ফলে সমালোচিত এই নেতা শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই না পেয়ে আওয়ামীলীগের মূল কমিটির সম্মেলনের দিকে তাঁকিয়ে ছিল। কিন্তু সেখানেও জায়গা হয়নি এই নেতার। জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচনে বারবার চেষ্টা করেও বিতর্কিত এই নেতা কোন মনোনয়নের সোনার কাঠি পাননি। তবে এবার কেন্দ্রীয় কোন কমিটিতে জায়গা হয়নি তার। এতে করে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে সবকুল হারিয়েছে এই নেতা।

জানা গেছে, কাউছার আহমেদ পলাশ শ্রমিক লীগের বিগত কমিটির শ্রমিক উন্নয়ন ও কল্যাণবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন। কেন্দ্রীয় নেতা হয়েও নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতির পদ দখল করে আছেন এক যুগের বেশি সময় ধরে। তবে শ্রমিকলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির পর মূল দলের সম্মেলনের দিকে তার নজর ছিল। কিন্তু সেখানেও আশাহত হয়েছেন তিনি। এতে করে বিতর্কিত কর্মকা-ের মধ্য দিয়ে ললাটে এঁটে দেয়া কলঙ্ককে বড় কারণ হিসেবে দেখছেন রাজনীতিক বোদ্ধারা।

এদিকে ২৬ ডিসেম্বর ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। রাজধানীর ধানমন্ডিতে আওয়ামীলীগের কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে ঠাঁই পাওয়া নেতাদের নাম ঘোষণা করেন। সেখানে শ্রমিকলীগ নেতা পলাশের নাম ছিলনা।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও