বিএনপি নেতা রাজীব ও খোরশেদের লুকিয়ে করা সেই প্রেম কাহিনী

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১০:৩৭ পিএম, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ বৃহস্পতিবার

বিএনপি নেতা রাজীব ও খোরশেদের লুকিয়ে করা সেই প্রেম কাহিনী

১৪ ফেব্রুয়ারী বিশ্ব ভালোবাসা দিবস। নারায়ণগঞ্জের অনেক রাজনীতিক, এমপিদের বিয়ে হয়েছে প্রেম করে। অনেক পেশাজীবীও একই কাতারে। ভালোবাসা দিবস তথা ভ্যালেন্টাইন দিবসে বিএনপি নেতা মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ ও মাসুকুল ইসলাম রাজীবের প্রেম কাহিনী নিয়ে আয়োজন।

তামান্না যেভাবে রাজীবের জীবনসঙ্গী
বিশ্ব ভালবাসা দিবস উপলক্ষ্যে নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুকুল ইসলাম রাজীব বলেন, ২০০৩ সালে কলেজের ভিপি থাকাবস্থায় আমার বাবা, মা আমাকে কয়েকটি মেয়ের ছবি দেখায় আমার বিয়ের জন্য। আমার কাউকে পছন্দ হয়নি। বাসা থেকে বিয়ের জন্য আমার উপর চাপ দিচ্ছিল আমার পরিবার। যেহেতু আমি কলেজের ভিপি ছিলাম কলেজে থাকাবস্থায় আমি ছিলাম সর্বোচ্চ সতর্ক। একদিন আমি প্রতিদিনের মত কলেজ সংসদে বসে ছিলাম এমন সময় সকালের দিকে আমার শ্বশুর ইসহাক আহমেদ আমার কাছে একটি বিচার নিয়ে আসে। সে জানায় তাঁর মেয়েকে (তামান্না) কয়েকটি ছেলে ডিস্টার্ব করে। তারা বাইক নিয়ে তার মেয়ের পিছনে পিছনে বাড়ি পর্যন্ত যাই। আমি তাকে পরদিন তার মেয়েকে নিয়ে আসতে বলি। কথামত পরদিন সকালে তার মেয়েকে নিয়ে সে কলেজ সংসদে আসে। এসময় মেয়েটি সংসদে ঢুকেই আমাকে খুব সুন্দর করে সালাম দেয়। সেই সালামেই আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। তবে প্রেমে পড়লেও আমি কাউকে তেমন কিছু বুঝতে দেইনি। আমি তখন তাদেরকে বলি আপনারা এখানে এসেছেন এতেই হবে যদি এর পর আবার আপনাকে কেউ ডিস্টার্ব করে আমাকে জানাবেন। যারা এমন ডিস্টার্ব করে তারা যদি দেখে থাকে তাহলে আর সমস্যা করবেনা।

তারপর থেকে আমি সকলের অজান্তে ও অগোচরে তামান্নার খেয়াল রাখতাম। দেখতাম সে ঠিকমত কলেজে আসতো কিনা তাকে আর কেউ জ্বালাতন করে কিনা। আমার কেন জানি মনে হত আল্লাহ তামান্নার সাথেই আমার জুড়ি মিলিয়ে রেখেছে। কেন জানি মনে হত ওর সাথেই আমার বিয়ে হবে। ওই হবে আমার জীবনসঙ্গিনী। তারপর ২০০৪ সালে যখন কলেজে নবীনবরন অনুষ্ঠান হয় তখন আমি খেয়াল করি সেখানে তামান্না আসে।

আমি তখন একটি গান গেয়েছিলাম অঞ্জন দত্তের ‘হ্যালো বেলা বোস তুমি শুনতে কি পাচ্ছো’ গানটি গাওয়ার সময় আমি মাঝখানে একটি লাইন বলে ফেলি নিজের অজান্তেই সেটি হচ্ছে ‘হ্যালো তামান্না তুমি শুনতে কি পাচ্ছো’।

এই ছিল আমার প্রথম চেষ্টা তাকে বুঝানোর যে আমি তাকেই ভালবাসি এবং বিয়ে করতে চাই। যদিও আমি আজও জানিনা সে বুঝেছিল কিনা।

এটি নিয়ে একটি স্থানীয় পত্রিকা শিরোনামও করেছিল কে এই রাজীবের তামান্না। প্রেমের বিয়ে না হলেও পছন্দ করেই ওকে আমি বিয়ে করেছি। আমি সুখী ওকে পেয়ে কারণ এখনো যদি রাত ৩ টা বা ৪ টায় বলি যে আমার কিছু খেতে ইচ্ছা করছে ও নির্দ্বিধায় তা রান্না করে দেয় কোন প্রশ্ন করা ছাড়াই। আমাদের এই বিবাহিত জীবনে ৪ থেকে ৫ বার মাত্র ঝগড়া করেছি তাই ইচ্ছা করেই। আমার আর তামান্নার বিয়ের ঘটনার পর আমার মনে পড়ে ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ ছবির নায়ক আমির খানের ডায়ালগ জীবন সঙ্গিনী আগে থেকেই নির্ধারিত হয়ে থাকে এটা তুমি তাকে পেলেই বুঝবে। মূলত ওর সব কিছুই আমার চাওয়া পাওয়ার সাথে মিলে গিয়েছিল। আমিও ওকে প্রথম দেখায় বুঝেছি যে আমি তাকে ভালবেসে ফেলেছি আর তাই আমার পরিবারকে পরবর্তীতে ওদের বাসায় প্রস্তাব দিয়ে পাঠিয়ে ওকে বিয়ে করি।

মাসকুল ইসলাম রাজীবের স্ত্রী তামান্না ফেরদৌস জানান, আমি বিয়ের আগে থেকে তাকে কলেজের বড় ভাই হিসেবে চিনতাম। তখন তাকে বড় ভাই হিসেবেই পছন্দ করতাম কিছুটা ভালোবাসতাম। আমাদের বিয়েটা মূলত পারিবারিকভাবেই কিন্তু পারিবারিকভাবে হলেও আমাদের প্রেমে তেমন এক বিন্দুও ভালবাসার ঘাটতি নেই।

কাউন্সিলর খোরশেদের দেড়যুগের প্রেম
মাকছুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ : মধ্যবিত্তের ভালবাসা নিয়ে প্রয়াত কথা সাহিত্যিক হুমায়ুন আহম্মেদের একটি জনপ্রিয় উক্তি আছে। তিনি তার একাধিক উপন্যাসে বলেছেন,“মধ্যবিত্তের প্রেম ভালবাসার শুরুটা হয় নিজের চাচাতো, মামাতো, খালাতো ভাই বোনের মধ্যে”। হুমায়ুন আহম্মেদ স্যারের ভালবাসা বিষয়ক তত্ত্ব¡টি আমার জীবনে ফলেছে অক্ষরে অক্ষরে। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসাবে আমার জীবনেও ভালবাসার হাতেখড়ি চাচাতো বোন লুনাকে ভাল লাগার মধ্য দিয়ে। বিপরীত লিঙ্গের কাউকে ভাল লাগার অনুভূতি হওয়ার পরে যাকে প্রথম ভাল লেগেছে সেই লুনার সাথেই দীর্ঘ দেড় যুগের প্রেম পর্বের কন্টকময় পথ পাড়ি দিয়ে জীবন সঙ্গী করেছি। যা আমার জীবনে আল্লাহর অশেষ রহমত।

স্কুল জীবনের ভাললাগা কলেজ জীবনে এসে পরিণত হয় ভালবাসায়। লুনারা থাকত ঢাকার মিরপুরে, আমরা নারায়ণগঞ্জে। প্রেমের প্রথম দিকে পারিবারিক অনুষ্ঠানাদিই ছিল আমাদের দেখা সাক্ষাতের একমাত্র সুযোগ। তাই আমরা দুই জনই কোন আত্মীয় স্বজনের অনুষ্ঠান মিস করতাম না। আমাদের বিভিন্ন দিকের কাজিনদের মধ্যে আমরা বেশ জনপ্রিয় ছিলাম। ওরাই আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দিত। মাঝে মাঝে ল্যান্ড ফোনে কথা হতো,তাও খুব কম সময়ের জন্য। আবার কখনো দশ বার ফোন করলে একবার লুনা ধরার সুযোগ পেত, অন্য কেউ ধরলে রেখে দিতাম। আর আমার বাবার ভয়ে লুনা আমাদের বাসার ফোনে কখনো ফোন দিত না। লুনাদের প্রাইভেট কারের দীর্ঘদিনের ড্রাইভার আব্বাস ভাইও ছিল আমাদের যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম। লুনার চিঠি আব্বাস ভাই আমাকে পোস্ট করে দিত, আর আমি আব্বাস ভাইয়ের ঠিকানায় চিঠি পাঠাতাম। সেই চিঠি তিনি লুনাকে পৌছে দিতেন। দীর্ঘদিন এভাবে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতেই আমাদের প্রেম চলেছে।

১৯৯৩ সালে এসএসসি পাশ করে লুনা ঢাকা সিটি কলেজে ভর্তি হয়। আর আমি ১৯৯৪ সালে ডিগ্রী পাশ করে শাব্বির ভাইয়ের সাথে গার্মেন্টস ব্যবসা শুরু করি। ইচ্ছা করেই আমি গার্মেন্টের কমার্শিয়াল বিভাগের দায়িত্ব নেই। ফলে ব্যাংক, ইপিবি, বিজেএমইএ, শিপিং লাইন, বায়িং হাউজ ইত্যাদির কাজে সপ্তাহের ৬ দিনই আমার ঢাকা যাওয়ার সুযোগ হয়। প্রায় প্রতিদিনই আমাদের দেখা সাক্ষাৎ হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়। দুপুরের মধ্যে অফিসিয়াল কাজ শেষ করে প্রতিদিনই আমার গন্তব্য ছিল সিটি কলেজের কাছের এলিফ্যান্ট রোডের “ডাক চাইনিজ রেস্টুরেন্টে”। কেউ দেখে ফেলার ভয়ে আমরা কখনো পার্কে বা রিক্সায় ঘুরতাম না।

এতদিন নীরবে দু’জনের মন দেয়া নেয়া, চিঠি চালাচালি, দেখা সাক্ষাৎ চললেও ১৯৯৫ সালের দিকে উভয় পরিবারের মধ্যে আমাদের সর্ম্পকের কথা জেনে যায়। যথারীতি শুরু হয় বিভিন্ন ঝামেলা। যেহেতু আমরা আপন চাচাতো ভাই বোন সেই জন্যই আমার পরিবার বেশী আপত্তি তোলে। তাদের প্রধান যুক্তি মেডিক্যাল সাইন্স অনুযায়ী একই পরিবারের মধ্য বৈবাহিক সম্পর্ক হলে সন্তান প্রতিবন্ধি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। অতএব আমাদের সর্ম্পক কোন ভাবেই মেনে না নেয়ার জন্য উভয় পরিবার ঐক্য জোট করে। অপর দিকে আমি ও লুনাও মনস্থির করি আমাদের ভালবাসার চুড়ান্ত পরিণতি দিতে হবে। তবে আমরা উভয়েই আমার বাবাকে এত ভয় পেতাম যে তার বিরুদ্ধে গিয়ে কখনো কিছু করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। এবং আমাদের পরিবার তো দূরের কথা আমাদেও বংশে কিংবা এমন কোন পারিবারিক বন্ধু বা শুভাকাংখী নাই যে আমার বাবাকে ম্যানেজ করতে পারে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যত দিনই লাগুক না কেন, যতই কষ্টই হোক না কেন আমরা আমাদের পরিবারের সম্মতি আদায় করেই ও তাদের আয়োজনেই যা কিছু করার করবো। কোনদিনই বাবা মায়ের অসম্মতিতে কিছু করবো না।

বছরের পর বছর চলতে থাকে আমাদের অপেক্ষার পালা। সময়ের ব্যবধানে লুনা ঢাকা সিটি কলেজ থেকে বিকম ও জগন্নাথ কলেজ থেকে এমকম পাশ করে ফেলে। ১৯৯৮ সালে এমকম পাশ করার পরে লুনার পরিবার লুনাকে বিয়ের জন্য প্রচন্ড চাপ দিতে শুরু করে। প্রায় প্রতিদিনই লুনাকে তার পরিবারের সম্মুখীন হতে হয়। লুনা এক পর্যায়ে অতিষ্ঠ হয়ে রাগ করে একদিন ওর বান্ধবী জয়ার বাসাবোর বাসায় চলে আসে। ততদিনে আমি কোম্পানীর কাজে মোবাইল ফোন পেয়েছি। লুনা আমাকে ফোন করে জয়ার বাসায় যেতে বলে। দুপুরের দিকে জয়ার বাসায় গিয়ে জানতে পারি লুনা বাসা থেকে চলে এসেছে। আর বাসায় ফিরবে না। যেহেতু পরিবারের সম্মতির বাইরে আমার কিছু করার সাহস নেই, সেহেতু বাধ্য হয়েই একটা বুদ্ধি আটি। লুনাকে বলি আজকে তো আমি রেডী হয়ে আসিনি, আজ তুমি জয়াদের বাসায় থাকো। কাল সকালে এসে তোমাকে আমি নারায়ণগঞ্জে নিয়ে যাব। লুনাও সরল মনে আমার কথা বিশ্বাস করে। আমি জয়াদের বাসা থেকে বেড়িয়ে রিক্সা নিয়ে মতিঝিলে এসে আমার আরেক চাচাতো ভাইকে ফোন করে জানিয়ে দেই লুনা জয়াদের বাসায় আছে। কিছুক্ষন পরেই লুনার ভাই ভাবী ওকে জয়াদের বাসা থেকে ধরে নিয়ে আসে। লুনার সাথে বেঈমানী করে ওই সময় কষ্ট পেলেও আজো ঐদিনের কথা মনে করে হাসি পায়।

আমাদের বয়সের চেয়ে আমাদের প্রেমের তুলনামূলক বয়স অনেক বেশী। বলতে ও শুনতে আশ্চর্য লাগলেও আমাদের ভাললাগা ও প্রেমের বয়স দেড় যুগ। দেড় যুগ সাধনার পরে আল্লাহ মুখ তুলে তাকালেন আমাদের দিকে। আমার বাবার ভয়ে এতদিন কেউ সাহস না করলেও অবশেষে তৈমূর ভাইয়ের সম্মতি নিয়ে শাব্বির ভাই আমার বড় বোনকে সাথে নিয়ে আব্বার সাথে কথা বলেন ও আমাদের একাগ্রতার কথা বলে কোনমতে রাজী করান। অবশেষে ২০০১ সালের ২৫ মে পারিবারিকভাবে আমাদের বিয়ে হয়। শুরু হয় নতুন জীবনের।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও