এমপি বাহিনীর দাপট

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৮ পিএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০ রবিবার

বায়ের ছবিতে কলেজ ছাত্রের কব্জি কেটে দেওয়ায় অভিযোগ উঠা ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের সঙ্গে এমপি বাবু। ডানে বালু সন্ত্রাসে অভিযুক্ত সাত্তারের সঙ্গে এমপি বাবু।
বায়ের ছবিতে কলেজ ছাত্রের কব্জি কেটে দেওয়ায় অভিযোগ উঠা ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের সঙ্গে এমপি বাবু। ডানে বালু সন্ত্রাসে অভিযুক্ত সাত্তারের সঙ্গে এমপি বাবু।

নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের টানা তিনবারের সংসদ সদস্য ও আওয়ামীলীগের প্রভাবশালী নেতা নজরুল ইসলাম বাবু ধরাকে সরা জ্ঞান করে ক্ষমতার রাম রাজত্ব কায়েম করেছেন।

সবশেষ আড়াইহাজারের মেঘনা নদীতে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের দায়ে যুবলীগ নেতা সাত্তারসহ ৫জনকে বিনাশ্রম কারাদন্ড দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সহকারী কমিশনার ভূমি ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: উজ্জল হোসেনের নেতৃতে ২০ ফেব্রুয়ারী দিনব্যাপী মেঘনা নদীতে এই অভিযান পরিচালনা করা হয়।

নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো: উজ্জল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে আড়াইহাজার, সোনারগাঁ ও কুমিল্লা এলাকাতে মেঘনা থানার চালিভাঙ্গা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান লতিফ ও আড়াইহাজারের যুবলীগ নেতা সাত্তারসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী অধৈব ভাবে বালু উত্তোলন করে আসছিল।

আড়াইহাজার উপজেলা চেয়ারম্যান মুজাহেদুর রহমান হেলো সরকার জানান, দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছিল। যা আমরা উপজেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত আমি নিজে থেকে এই অভিযান চালাই। এতে মেঘনা ভাঙন থেকে আমার উপজেলার অনেক গুলো গ্রাম রক্ষা পাবে।

স্থানীয়রা জানান এ সাত্তার মূলত এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর অনুগামী হিসেবেই পরিচিত। সে কালাপাহাড়িয়াতে বাবুর নাম ব্যবহার করেই রাজত্ব কায়েম করে।

সম্প্রতি উপজেলার কদমীরচর এলাকার বালু সন্ত্রাসী জয়নাল লোকজন নিয়ে মেঘনা নদীতে খননযন্ত্র বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করেন। খবর পেয়ে আরেক বালু সন্ত্রাসী আবদুস সাত্তার শতাধিক সশস্ত্র লোকজন নিয়ে ট্রলারে করে মেঘনা নদীতে জয়নালের খননযন্ত্র দখলের চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ বেধে যায়। এ সময় উভয় পক্ষে গোলাগুলি শুরু হয়। ঘণ্টাব্যাপী সংঘর্ষ ও গোলাগুলিতে উভয় পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হন। তাঁদের ঢাকা, কুমিল্লার হোমনা, বাঞ্ছারামপুরসহ বিভিন্ন এলাকার হাসপাতালে পাঠানো হয়। সংঘর্ষের একপর্যায়ে জয়নালের লোকজন পিছু হটলে সাত্তারের লোকজন খননযন্ত্রে আগুন ধরিয়ে দেন। বিবদমান দুটি পক্ষই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সমর্থক।

সংঘর্ষে সাত্তারের পক্ষের হালিম, আক্তার, আ. সাত্তার, জয়নাল, দাউদ, মনির ও আলম গুলিবিদ্ধ হন। তাঁদের মধ্যে হালিম ও আক্তারকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে স্থানীয় লোকজন জানান। এ ছাড়া জয়নালসহ তাঁর পক্ষের খলিল, জলিল, রুবেল ও ইয়াছিন গুলিবিদ্ধ হন। খলিল ও জলিলকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অন্যদের চিকিৎসার জন্য কুমিল্লার হোমনা, বাঞ্ছারামপুরসহ আশপাশের বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

এদিকে ১৯ ফেব্রুয়ারী আড়াইহাজার উপজেলায় হত্যা মামলার আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করায় বাদীর বাড়িতে হামলা চালিয়ে পরিবারের লোকজনকে কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছে এমপি বাবুর অনুগামী হিসেবে চিহ্নিত ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। ওই সময়ে মামলার বাদীর ছোট ভাই কলেজছাত্রকে কুপিয়ে হাতের কবজি দ্বিখন্ডিত করে ফেলে তারা। এ হামলাকারীরা স্থানীয় এমপি নজরুল ইসলাম বাবুর অনুগামী হিসিবে তিনি স্বীকার করলেও এ হামলার ঘটনার দায় এড়িয়ে যান।

হামলাকারীদের বিরুদ্ধে আহতের বোন জোছনা বেগম বাদি হয়ে আড়াইহাজার থানায় মামলা দায়ের করেন। এর আগে মঙ্গলবার ১৮ ফেব্রুয়ারী দুপুরে উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে এ হামলা চালানো হয়। ঘটনার ২ দিন হলেও বুধবার বিকাল পর্যন্ত কোন মামলা হয়নি। সাদ্দাম এমপি বাবুর অনুগামী জানা গেছে। এমপি বাবুর অনুষ্ঠানে তার পাশে এই সাদ্দাম সহ তার লোকজনদের দেখা যায়। এমনকি একটি ছবিতে এমপি বাবুর সাথে কথাও বলতে দেখা যায় হামলাকারীকে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আড়াইহাজার উপজেলার কালাপাহাড়িয়া ইউনিয়নের ইজারকান্দি গ্রামে আট বছর আগে খুন হন রব মিয়া। এ ঘটনায় মামলা করেন নিহতের ছেলে মাঈনউদ্দিন। শনিবার ওই মামলার এক আসামিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে মঙ্গলবার ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেনের নেতৃত্বে ইয়ানুছ আলী, রাসেল, জুয়েল, জাকির, আলী হোসেন, হালিম ও আলামিনসহ ১৫-১৬ জনের ছাত্রলীগের এক দল নেতাকর্মী বাদীর বাড়িতে হামলা চালায়।

এলোপাতাড়ি কোপানোর সময় বাদীর ছোট ভাই কলেজছাত্র রনির মাথায় গুরুতর আঘাত ও বাম হাতের কবজি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অন্যরা স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। এ নিয়ে আতঙ্কে রয়েছে নিহত রব মিয়ার পরিবার।

এই ঘটনায় তার জড়িত থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেন ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম। আর নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের এমপি নজরুল ইসলাম বাবু বলেন, এ বিষয়ে থানায় বলা আছে। আইন তার নিজের গতিতে চলবে। অন্যায়কারীর বিচার হবে।

এর আগে নারায়ণগঞ্জ-২ (আড়াইহাজার) আসনের সংসদ সদস্য ও ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলাম বাবু অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ থেকে দায়মুক্তি পান গত বছরের ৩ মার্চ। তবে দায়মুক্তি পাওয়া এই সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রী সায়মা আফরোজের বিরুদ্ধে আবার অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। বাবু দম্পতির বিরুদ্ধে ৫১৩ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দায়মুক্তি দেয়ার পর কোনো সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে নতুন করে অনুসন্ধানের ঘটনা নজিরবিহীন বলে জানিয়েছে দুদকের ঊর্ধ্বতন সূত্র। সাত সদস্যের অনুসন্ধান টিম এ নিয়ে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছে। অনুসন্ধান টিমের প্রধান হলেন দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।

দুদক জানায়, নজরুল ইসলাম বাবু ও তার স্ত্রী এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের সম্পদের হিসাব জানতে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্সকে (বিএফআইইউ) চিঠি পাঠিয়েছে দুদক। বিএফআইইউকে চিঠি পাঠানো হয় সম্প্রতি। চিঠিটি পাঠান দুদক পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন। দুদকের পাশাপাশি বাবু ও তার স্ত্রী সায়মা আফরোজের সম্পদ অনুসন্ধান করছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

ভূমি অফিসে জমি রেজিস্ট্রি করতে এমপির নাম ভাঙিয়ে চাঁদাবাজির বিষয়টি একেবারেই ওপেন সিক্রেট। আড়াইহাজার, পাঁচরুকি, বাজবী, তিনগাঁও, লস্করদী, মনোহরদী, পাঁচগাঁঁও ও সাতগেরাম মৌজায় জমি কেনাবেচার বিষয়টি এমপির লোকজনেরা নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। এ কারণে জমি কেনাবেচায় বাধ্যতামূলক দলিলপ্রতি ৫ হাজার থেকে শুরু করে দলিল ভেদে বিভিন্ন অংকের চাঁদা আদায় করা হয়। এ ছাড়া উপজেলা দলিল লেখক সমিতির নামেও চাঁদা আদায় করা হচ্ছে।

আড়াইহাজার উপজেলার পরিবহন সেক্টর থেকেও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। সড়কের বিভিন্ন মোড়ে টিকিটের মাধ্যমে চাঁদা আদায় করা হয়। আড়াইহাজারের সদর উপজেলায় প্রবেশ করার আগে মোড়ে টিকিট দিয়ে চাঁদা আদায় করা হয়।

এমপির নামে চাঁদাবাজির আরেকটি বড় উৎস স্থানীয় কয়েকটি বালুমহাল। এখন বালু তোলার ভরা মৌসুমে সম্ভুপুরা ও ইজারকান্দি বালুমহাল সহ বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। এছাড়া বসত বাড়ির জমির মাটি কাটারও অভিযোগ রয়েছে। তাছাড়া তার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা নেতাকর্মী ও লোকজনের বিরুদ্ধে ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ও বসত বাড়ি দখলের অনেক অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে, এমপি বাবু ও তার ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা নেতাকর্মী ও লোকজনের মতের বিরুদ্ধে গেলেই নেমে আসে নির্যাতনের খড়গ। তারা আড়াইহাজারে রাম রাজত্ব কায়েম করতে চান। তাই এই আসনটি সব সময় তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে যে কোন পদক্ষেপ নিতে পিছ পা হয়না।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও