ধনীদের জেলায় গরীবদের কান্না

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ১২:২০ এএম, ২৬ মার্চ ২০২০ বৃহস্পতিবার

উপরের সারি বা থেকে - মন্ত্রী গাজী, বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান, শিল্পপপি মোহাম্মদ আলী ও এফবিসিসিআই পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা। নিচের সারি বা থেকে চেম্বার সভাপতি কাজল, ইয়ার্ন মার্চেন্টের সভাপতি লিটন, হোসিয়ারীর সভাপতি সজল ও নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সভাপতি টিটু।
উপরের সারি বা থেকে - মন্ত্রী গাজী, বিকেএমইএ সভাপতি সেলিম ওসমান, শিল্পপপি মোহাম্মদ আলী ও এফবিসিসিআই পরিচালক প্রবীর কুমার সাহা। নিচের সারি বা থেকে চেম্বার সভাপতি কাজল, ইয়ার্ন মার্চেন্টের সভাপতি লিটন, হোসিয়ারীর সভাপতি সজল ও নারায়ণগঞ্জ ক্লাব সভাপতি টিটু।

বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধনীদের জেলা হচ্ছে নারায়ণগঞ্জ। এই জেলার মানুষ সবচেয়ে ভাল অবস্থানে রয়েছেন। সেই সাথে রয়েছে জাতীয় পর্যায়ের অনেক সংগঠন। বসবাস করছেন দেশের শীর্ষ ধনীরা। তবে সাম্প্রতিক সময়ে আবির্ভাব হওয়া প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে এই ধনীদের জেলা নারায়ণগঞ্জে অসহায়দের আত্মসমর্পন করতে হচ্ছে। তারা এখন কাঁদছে। কর্মবিমুখ হয়ে বিপাকে পড়তে হচ্ছে অসহায়দেরকে। জীবীকার তাগিদে তাদেরকে নানামুখী চিন্তায় গ্রাস করছে। পাশাপাশি ধনীরাও অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না।

ইতোমধ্যে কয়েকজন ব্যক্তি উদ্যোগে অসহায়দের বাড়িতে বাড়িতে খাদ্য সামগ্রী পাঠানোর ব্যবস্থা করেছেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন বলেছেন, ‘আপনারা ঘরে থাকুন। যারা গরীব, ঘরে নিতান্তই খাবারের সংকট এমন ব্যক্তিদের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। এ নিয়ে কোন দুঃশ্চিন্তা করতে হবে না। এজন্য সরকারের নির্দেশনা রয়েছে।’

সূত্র বলছে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ খানার আয় ও ব্যয় নির্ধারণ জরিপ অনুযায়ী সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছেন নারায়ণগঞ্জের মানুষ। এই জেলার প্রতি ১০০ জনে গড়ে ২ দশমিক ৬ জন মানুষ গরিব। বাকিরা সবাই দারিদ্র্য সীমার ওপরে বাস করেন।

একই সাথে এই নারায়ণগঞ্জে বসবাস করেন দেশের শীর্ষ ধনীরা। এই জেলায় রয়েছে বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতি, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্টিজ ও বাংলাদেশের সুতা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইয়ার্ন মার্চেন্ট। এই তিনটি জাতীয় পর্যায়ের সংগঠন সহ মোট ৪৫ টি ব্যবসায়িক সংগঠন রয়েছে নারায়ণগঞ্জ জেলায়। তারপরেও এই নারায়ণগঞ্জ জেলায় অসহায়দেরকে বিপাকে পড়তে হচ্ছে। অসহায়দের সহযোগিতায় কোন রকমের উপকারে আসছেন না সবচেয়ে ধনীদের জেলা খ্যাত এই নারায়ণগঞ্জ।

জানা যায়, প্রাণঘাতি এক ভাইরাসের নাম হচ্ছে করোনা ভাইরাস। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। আর এই ভাইরাসটি খুব কম সময়ের মধ্যে এক জায়গা থেকে অন্য জায়াগায় স্থানান্তর করতে পারে। ইতোমধ্যে বিশে^র বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন। এতদিন এই ভাইরাস বাংলাদেশের বাইরে থাকলেও এবার বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে এই করোনা ভাইরাস। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে চারজন মারাও গিয়েছেন।

যার সূত্র ধরে নারায়ণগঞ্জে ৩৮ জনকে নতুন করে হোম কোয়ারেন্টাইন করা হয়েছে। এ নিয়ে জেলায় মোট হোম কোয়ারেন্টাইনে রয়েছেন ২০১ জন। আর এসকল বিষয়কে কেন্দ্র করে দেশের অন্যান্য জেলার মতো নারায়ণগঞ্জও করোনা ভাইরাসের আতঙ্কের বাইরে নয়। সারা দেশের মতো নারায়ণগঞ্জে বন্ধ রয়েছে সকল অফিস আদালত ও সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিও বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে রয়েছে।

তবে এমতাবস্থায় নারায়ণগঞ্জের ব্যবসায়িক সংগঠনগুলো ও প্রভাবশালীরা নারায়ণগঞ্জবাসীর সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না। এখন পর্যন্ত বাস্তবিক কোন কার্যক্রমে তাদের দেখা পাওয়া যায়নি। শুধুমাত্র বক্তৃতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছেন তারা।

জানা যায়, নারায়ণগঞ্জের বিত্তশালীদের তালিকায় রয়েছেন নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমাম ও বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী। এই দুইজনেরই রয়েছে বিশাল অর্থ সম্পদ। সেই এই দুই প্রভাবশালী নেতাই বিভিন্ন উৎসব পার্বনে অঢেল পরিমাণ দান দক্ষিণা করে থাকেন।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর ২০১৪-২০১৭ সাল পর্যন্ত গত ৪ বছরে মোট ১লাখ ১৬  হাজার প্যাকেট ঈদ সামগ্রী বিতরন করেছেন। যার মধ্যে ২০১৪ সালে ২০ হাজার প্যাকেট, ২০১৫ সালে ২৬ হাজার প্যাকেট, ২০১৬ সালে ব্যক্তিগত তহবিল ও ব্যবসায়ীদের সহযোগীতায় ৫৬ হাজার প্যাকেট, ২০১৭ সালে ২০ হাজার প্যাকেট, ২০১৮ সালের ৪৫ হাজার ঈদ সামগ্রীর প্যাকেট বিতরন করা হয়েছে। যার মধ্যে ছিল একটি শাড়ী, ১ কেজি ফ্রেস চিনি, ২৫০ গ্রাম ফ্রেস গুড়া দুধ, ১ লিটার ফ্রেস সয়াবিন তেল, ১ কেজি ফ্রেস আটা, ১ কেজি প্রাণ চিনিগুড়া চাল, ৪০০ গ্রাম চিকন সেমাই ছিল।

সবশেষ ২০১৯ সালে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ৩৫ হাজার ৫০০ প্যাকেট এবং ব্যবসায়ী সংগঠন বিকেএমইএ এর পক্ষ থেকে বাকি ২ হাজার ৫০০ প্যাকেট সহ মোট ৩৮হাজার প্যাকেট ঈদ সামগ্রীর বিতরণ করেছিলেন। সেই সাথে অন্যান্য ধর্মালম্বীদের বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এবং বিভিন্ন মাজারের ওরশে দান করে থাকেন।

এদিকে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীরও রয়েছে বিপুল অর্থ সম্পদ। তিনি বাংলাদেশের শীর্ষ ধনীদের মধ্য অন্যতম। গোলাম দস্তগীর গাজীরও বিভিন্ন সময় বিপুল পরিমাণে দান করে থাকেন। নারায়ণগঞ্জের অনেক জায়গাতেই তার অর্থায়নে বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে উঠেছে। সেই সাথে দেশের মন্ত্রীসভাতেও দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।

কিন্তু বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী ও নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য এই দুইজনের কেউই প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছে না। বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন থেকে শুরু করে কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক ব্যাক্তি ও সংগঠন এগিয়ে আসলেও নারায়ণগঞ্জের বিত্তশালী খ্যাত এই দুইজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অসহাদের পাশে পাওয়া যাচ্ছে না।

নারায়ণগঞ্জে গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ রয়েছে। এর আওতাভুক্ত রয়েছে কয়েক হাজার কারখানা।

একই সাথে নারায়ণগঞ্জের জাতীয় পর্যায়ের তিনটি সংগঠন বাংলাদেশ হোসিয়ারি সমিতি, চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্টিজ ও বাংলাদেশের সুতা ব্যবসায়ীদের সংগঠন ইয়ার্ন মার্চেন্টের সংগঠনগুলোও অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না। পাশাপাশি চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্টিজের সভাপতি খালেদ হায়দার খান কাজল ও কিং মেকার খ্যাত মোহাম্মদ আলীরাও অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না। সেই সাথে অন্যান্য বড় বড় ধনীরাও নারায়ণগঞ্জের অসহায়দের সহযোগিতায় এগিয়ে আসছেন না।

ফলশ্রুতিতে নারায়ণগঞ্জে বসবাসরত অসহায়দেরকে বিপাক পড়তে হচ্ছে। কর্মবিমুখ হয়ে তারা দিশাহীন অবস্থায় পড়তে যাচ্ছেন। জীবীকার তাগিদে গ্রাম শহরে এসেছেন। আর শহরে এসেও তাদেরকে জীবিকাহারা হতে হচ্ছে। জীবীকার তাগিদে না পারছেন গ্রামে ফিরে যেতে না পারছেন শহরে অবস্থান করতে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও