টাকাওয়ালা শামীমকে চেয়েছিলেন ভিপি বাদল

স্টাফ করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৯:৪৮ পিএম, ৬ জুলাই ২০২০ সোমবার

টাকাওয়ালা শামীমকে চেয়েছিলেন ভিপি বাদল

নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল একেক সময় একেক রূপ ধারণ করে থাকেন। নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাম্প্রতিক সময়ে জন্ম নেয়া সকল বিতর্কের নায়ক হিসেবেও উদয় হয়েছেন। গত দুই বছরে তিনি কয়েকবার এমপি সেলিম ওসমান সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন। আর এতে তিনি বেশ বিতর্কের মুখে পড়েন। এবারও সেলিম ওসমান ইস্যুতে তিনি বেশ সমালোচিত।

তবে গত কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশী বিতর্কিত হয়েছেন আলোচিত ঠিকাদার জিকে শামীমকে গ্রেপ্তারের পরে। কারণ তখন কিছু ছবি প্রকাশিত হয়েছে যা নিয়ে চলছে নানা কানাঘুষা।

সূত্র বলছে, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনা হলো সোনারগাঁ আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটি ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় যুবলীগ নেতা গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জি কে শামীমের সাথে ঘনিষ্ঠতা। আর এই দুই ঘটনাতেই সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল নেপথ্যে থেকে কাজ করেছেন।

জানা যায়, সোনারাগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক কমিটির অনুমোদন দেন জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। কমিটিতে সামসুল ইসলাম ভূইয়াকে আহবায়ক এবং সোনারগাঁয়ের পিরোজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মাসুদুর রহমানকে যুগ্ম আহবায়ক করা হয়েছে। কমিটির বাকি সদস্যরা হলেন জেলা আওয়ামীলীগের যুগ্ম সম্পাদক প্রফেসর ডা. আবু জাফর চৌধুরী বিরু, জেলা আওয়ামীলীগের শিল্প ও বানিজ্য বিষয়ক সম্পাদক এস এম জাহাঙ্গীর, মোগরাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আরিফ মাসুদ বাবু, সোনারগাঁ উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান বাবু ওমর, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান মাহমুদা আক্তার ফেন্সী ও সামসুদ্দিন খান আবু।

আর এই কমিটির ঘোষণা পরপরই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগে তোলপাড় সৃষ্টি হয়ে যায়। জেলা আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট নেতারা সভাপতি আব্দুল হাই ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে সভাপতি আব্দুল ও সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদলের সিদ্ধান্তের প্রতি অনাস্থা কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগে অভিযোগ করেন জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারা। সেই সাথে সোনারগাঁ উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতারাও বিদ্রোহ করে আহবায়ক কমিটির বিরুদ্ধে মাঠে নামেন। ফলে দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে সোনারগাঁ আওয়ামী লীগ।

এই ঘটনার আড়াল হতে না হতেই নতুন করে বিতর্কের জন্ম নেয় রাজধানী ঢাকার নিকেতন থেকে গ্রেফতারকৃত যুবলীগ নেতা জি কে শামীমের সাথে আব্দুল হাই ও আবু হাসনাত শহীদ বাদলের ঘনিষ্ঠতা। আর এই সম্পর্কের বিষয়টিকে তারা অস্বীকার করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঠিকই তাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছে। যা তাদের বক্তব্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল নয়।

গত ২০ সেপ্টেম্বর রাজধানীর নিকেতন থেকে নগদ টাকা ও ৭ দেহরক্ষী সহ যুবলীগের কেন্দ্রীয় নেতা পরিচয় দানকারী জি কে শামীম গ্রেফতার হন। কিন্তু জিকে শামীমের গ্রেফতারের পর যুবলীগের কেন্দ্রীয় শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক মিজানুর রহমান মিজু দাবী করছেন জি কে শামীম যুবলীগের কেউ নয়, তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি। তবে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি না হলেও ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের বর্ধিত সভায় কমিটিতে রাখার জন্য এই জি কে শামীমের নামই প্রস্তাব করা হয়েছিল। আর এই নাম প্রস্তাব করেছিলেন সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। জেলা আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতারাও নাম প্রস্তাবের বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

ওই সময়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি সেলিনা হায়াৎ আইভী বলেন, ‘জিকে শামীমকে আমরা চিনি না। অথচ তাকে জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি করতে প্রস্তাব দেন সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল। তখন আমরা এ নিয়ে বিরোধীতা করেছিলাম। স্পষ্ট বলেছিলাম রাজনীতিতে সক্রিয় ও সকলে চিনে এমন কাউকেই অন্তর্ভুক্ত করতে। টাকার বিনিময়ে জিকে শামীমকে কমিটিতে ঢুকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।’

জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘সহ সভাপতি হিসেবে জিকে শামীমের নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল। তাকে আমরা কেউ চিনি না। এ নিয়ে তখন তর্ক হয়েছিল। বাদল তার নাম বলেছিল। তখন তাকে অন্তর্ভুক্ত করা যায়নি।’

সদস্য ও সোনারগাঁও উপজেলা আওয়ামী লীগের আহবায়ক সামছুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, ‘জিকে শামীম এক সময়ে বিএনপি করতো। তার বাড়ি সোনারগাঁও হওয়ায় তাকে আমরা চিনতাম। সে কারণেই আপত্তি তুলেছিলাম।’

এদিকে নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত শহীদ বাদল দাবী করছেন, জি কে শামীমকে তিনি চিনেনই না। জি কে শামীমের সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই। জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা যারা খন্দকার মোস্তাকের প্রেতাত্মা তারাই তাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু কার্যতপক্ষে তার এই বক্তব্য মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের একসাথে ছবি প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায়।

প্রসঙ্গত ২ জুলাই দুপুরে শহরের খানপুর এলাকায় ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে করোনা রোগীদের জন্য আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধন উপলক্ষে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি সেলিম ওসমান বলেন, ‘আজকে একটি পত্রিকায় দেখলাম আমার ছবি সহ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে বন্দরের একটি ঘটনায়। তিনি চাষাঢ়া রেলওয়ে হেড কোয়ার্টারে থাকতেন। একজন এমপি সাহেবের আশীর্বাদে ওনি বলে এখন লেতা (নেতা)। ওনি নাকি এখন লেতা। এ লেতা বন্দরে গিয়ে বললো, ‘সেলিম ওসমান বন্দরের এমপি না। বন্দরের উপজেলা চেয়ারম্যান বন্দরের এমপি। প্রশ্ন থাকবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে, এমপি সিট বদলায় দিতে পারে এটি কি করে সম্ভব হতে পারে। দুই দিনের যোগি না ভাতেরে অন্য বইলেন না। আমরা দেশটা স্বাধীন করেছি। আমরা মুক্তিযোদ্ধা। হাজার বার বলি সেলিম ওসমানের থাবা বাঘের চেয়েও ভয়ংকর। বাঘের চেয়েও ভয়ংকর সেলিম ওসমানের থাবা। মতলব থেকে থেকে এসে নেতা হয়েছেন। ধানমন্ডিতে অট্টালিকা করেছেন। দুই নাম্বার স্কুল বানিয়েছেন। কত টাকার মালিক হয়েছেন সেলিম ওসমান দেখিয়ে দিবে। দেখবো আপনি আমাকে সরাতে পারেন কি না। ওনাকে আবার মতলব ফিরে যেতে হবে। আপনি আওয়ামী লীগ করেন যাই করেন সেটা দেখার বিষয় না। আমাকে কেউ মাইরা ফেলতে পারবে না। আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় মরি নাই, পঁচাত্তরে মরি নাই, এক-এগারোতে মরি নাই আমি শহীদ না, গাজী। আমি সংসদ সদস্য না জনগণের গোলাম। জীবন যতদিন থাকবে ততদিন জনগণের গোলাম থাকবো। দেখি মতলব পার্টি আমাকে সংসদ সদস্য থেকে সরায়ে দেন। ওনাকে আবার মতলবে ফিরে যেতে হবে। উনি কত পয়সার মালিক হয়েছেন সেটা সেলিম ওসমান দেখে দিবে নে। উনি আওয়ামী লীগ করেন আর যাই করেন না কেন!’

এর আগে সবশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জ-৫ ও নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী আবু হাসনাত শহীদ বাদল ও তার স্ত্রী কেন্দ্রীয় মহিলা লীগ নেতা নাহিদা হাসনাত। কিন্তু শেষতক তারা কেউ মনোনয়ন পায়নি। বরং নির্বাচনের সময়ে নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী না দেওয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশী সরব ছিলেন বাদল।

ভিপি বাদল আরও বলেন, ‘সেলিম ভাই সম্মানিত লোক। তাকে আমি এ ধরণের কথা কি ভাবে বলবো। উনারা দুই ভাই আট-দশটা মন্ত্রীর চেয়েও বেশি ক্ষমতা রাখেন। নারায়ণগঞ্জের জন্যও অনেক কিছু করেছেন। সেলিম ভাই মহাজোটের নেতা। মহাজোট থেকে তাকে প্রার্থীতা দিয়েছে। একই সাথে তিনি আমাদের অভিভাবকও। এটাকে ভায়লেট করার দুঃসাহস কার হতে পারে? আমি উনাকে নিয়ে এই ধরণের কোন বক্তব্য রাখিনি। আমার বক্তব্যের অপব্যাখ্যা করে পত্রিকায় প্রচার করা হয়েছে। এ ধরণের কর্মকান্ডের জন্য আমি হলুদ সাংবাদিকদের প্রতি নিন্দা জানাই। একই সাথে আমাদের সাংবাদিক অভিভাবকদের কাছে বিচারেরও দাবি করছি।’


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও