দুষ্টচক্রে বন্দী তৈমূর

স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ ০৮:৫৪ পিএম, ৪ আগস্ট ২০২০ মঙ্গলবার

দুষ্টচক্রে বন্দী তৈমূর

নেতাকর্মীদের প্রতি অতিরিক্ত আস্থা রাখতে গিয়ে বিগত দিনে বেশ কয়েকবার হোচট খেয়েছেন অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকার যিনি এখন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সেক্রেটারীর মত গুরুত্বপূর্ণ পদে। আসছে জেলা বিএনপির কমিটিতেও তৈমূরকে নেতৃত্বে কিংবা তাঁর মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার খবরে কিছুটা ব্যাকফুটে থাকা তৈমূর এখন ফ্রন্টলাইনে। আর এ সুযোগে দুষ্টচক্র ফের তৈমূরকে ঘিরে রাখতে শুরু করেছে।

২০১৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাজী মনিরুজ্জামানকে সভাপতি করে ও মামুন মাহমুদকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা এবং আবুল কালামকে সভাপতি ও এটিএম কালামকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর বিএনপির কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্র। গত ২১ ফেব্রুয়ারী এ কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। এর পরেই আলোচনায় আসে নতুন কমিটি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেলা বিএনপির নতুন নেতৃত্ব প্রস্তুত হচ্ছে যা যাচাই বাছাই করে দ্রুত সময়েই জেলা বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হবে। ইতোপূর্বে জেলা বিএনপির নতুন কমিটির জন্য একাধিক খসড়া প্রস্তুত করা হলেও অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকারকে সভাপতি করার পক্ষেই কেন্দ্রের মতামত।

এ খবরে ইতোমধ্যে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীরাই এখন তৈমূরকে ধর্না দিতে শুরু করেছে। তাঁর বাসা ও চেম্বার এখন নেতাকর্মীদের ভীড়। অথচ ২০১৭ সালে জেলা বিএনপির কমিটি গঠনের পর সেটা অনেক কমে যায়। এছাড়া বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান বিএনপির রাজনীতিতে নিস্ক্রিয় থাকার কারণে তাঁর অনুগামীরাই এখন তৈমূরের পক্ষ নিচ্ছেন। এক সময়ে যেসব নেতাকর্মীরা তৈমূরের ঘোর বিরোধী ছিলেন তারাই এখন তৈমূরের শুভাকাংখী সাজছেন। আর এতে করে তৈমূর পন্থী অনেকেই ক্ষোছ প্রকাশ করেছেন।

তৈমূরের ঘনিষ্ঠ একাধিকজন জানান, তৈমূরের সঙ্গে এখন কাজী মনিরের লোকজন ভীড়েছে। অথচ তারাই এক সময়ে তৈমূরের বিরোধীতায় ছিলেন। তাদের কারণে যারা দীর্ঘদিন তৈমূরের পক্ষে ছিলেন তাদেরকে অবহেলা করা হচ্ছে।

এরই মধ্যে ৪ আগস্ট সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মতিন চৌধুরীর অষ্টম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া, কবর জিয়ারত ও পুষ্পস্তবক অপর্ণ করা হয়েছে। সেখানে তৈমূরের সঙ্গে ছিলেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান হুমায়ন, জেলা যুবদলের সাবেক সভাপতি মোশারফ হোসেন, সাবেক সেক্রেটারী আশরাফুল হক রিপন, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ সভাপতি দুলাল হোসেন, কায়েতপাড়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গোলজার হোসেন, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি তরিকুল ইসলাম বিপুল, আলাল খন্দকার, সাবেক কাউন্সিলর মহিবুর রহমান, জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান ইমন, ছাত্রদল নেতা আবু মাসুম, সোহেল মিয়া, ছাত্রদল নেতা সজিব, কাইয়ুম প্রধান প্রমুখ।

বিএনপি নেতারা জানান, তৈমূরের সঙ্গে থাকা মাহফুজুর রহমান হুমায়ূন, দুলাল হোসেন, আশরাফুল হক রিপন সহ অনেকেই মূলত কাজী মনিরের অনুগামী।

এরই মধ্যে একটি গ্রুপ তৈমূরের ঘাড়ে বন্দুক রেখে রূপগঞ্জের ছাত্রদলের কমিটি নিজেদের কব্জায় নিতে চাচ্ছে। আর এতে কাজ করছেন আশরাফুল হক রিপন, স্বেচ্ছাসেবক দলের জেলার সভাপতি এস এম সায়েম সহ একটি প্রভাবশালী গ্রুপ।

রূপগঞ্জের একাধিক নেতা জানান, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে রূপগঞ্জে তৈমূর আলম নির্বাচন করবেন এমন ঘোষণা দেয়ার জন্য এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ওই ঘটনার খবর পেয়ে শহর বিএনপির নেতাদের নিয়ে দেওভোগ এলাকায় দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে শহরের নেতারা তৈমূরকে চাপ প্রয়োগ করেন যে তাকেই শহর বন্দর আসন থেকেই নির্বাচন করতে হবে। আর রূপগঞ্জে কাজী মনিরকে ছেড়ে দিতে হবে।

নেতাদের এমন দাবির প্রেক্ষিতে তৈমূর আলম রাজি হয়ে রূপগঞ্জ যান। সাথে গিয়েছিলেন বিএনপি নেতা জান্নাতুল ফেরদৌস, এটিএম কামাল, সরুজ্জামান, নুরুল হক চৌধুরী দিপু সহ বেশকজন নেতা। ওই অনুষ্ঠানে কাজী মনিরকে ডেকে আনা হয়। পরে অনুষ্ঠানে তৈমূর আলম খন্দকার তার অনুগত লোকজনদের কাজী মনিরের সাথে কাজ করার নির্দেশ দিলেই চেয়ার ভাংচুর শুরু হয়। ওই ঘটনার পর থেকে তমূরের প্রতি চরম ক্ষুব্ধ কাজী মনির।

এর আগে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরে ১০ জানুয়ারী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস উপলক্ষে রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, যারা নমিনেশন নিয়ে ট্রেড (বাণিজ্য) করেছে, অকশন (নিলাম) করেছে, তারা কী করে আশা করে যে নির্বাচনী জয়ী হবে। সিলেটে ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি, যে বেশি টাকা দিয়েছে তাকেই নমিনেশন দেওয়া হয়েছে। ইনাম আহমেদ চৌধুরীকে নমিনেশন দিলে তিনি হয়তো জিততে পারতেন। ধামরাইয়ে আতাউর রহমান খানের ছেলে জিয়াউর রহমান খান নমিনেশন পাবে বলেই ধারণা ছিল। তিনি হয়তো জিততেনও কিন্তু তাকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি, নারায়ণগঞ্জে তৈমুর আলম খন্দকারকে নমিনেশন দেওয়া হয়নি- এরকম আরও অনেক জায়গায় তারা যে বেশি টাকা দিয়েছে তাকে নমিনেশন দিয়েছে।’

এর আগে ৩১ ডিসেম্বর গণভবনে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেখতে আসা দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষক এবং বিদেশি গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তখন বলেন, ‘যে বেশি টাকা দিতে পেরেছে সেই মনোনয়ন পেয়েছে এবং এ কারণে তারা তাদের অনেক জয়ী হওয়ার যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। এমন অনেকেই মনোনয়ন পাননি। ‘আমি উদাহরণ দিয়ে দেখাতে পারি, ঢাকার ধামরাইয়ে জিয়াউর রহমান তাদের যোগ্য প্রার্থী ছিলেন, কিন্তু তিনি মনোনয়ন পাননি। নারায়ণগঞ্জের তৈমূর আলম তিনিও তাদের বিজয়ী প্রার্থী হতে পারতেন। তাঁকেও মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। সিলেটে তাদের বিজয়ী হওয়ার মতো নেতা ইনাম আহমদ চৌধুরীকেও তারা মনোনয়ন দেয়নি।’

বিএনপির বিরোধী দল ও বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের প্রধান ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মুখে অ্যাডভোকেট তৈমূর আলম খন্দকারের প্রশংসা ও ত্যাগী নেতা হওয়ার বিষয়টি তাকে সারা দেশ ব্যাপী হিরো বাড়িয়েছে।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের সাথে প্রকাশ্য ও গোপন আতাঁত করে এবং নিজেদের গাঁ বাঁচাতে রাজনীতিক কর্মসূচিতে মাঠে না নামা নেতাকর্মীদের অবস্থান ও কার্যক্রম সকলের জানা। এরুপ নানা কারণে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে অসংখ্য অভিযোগ উঠেছে। তবে দলের ত্রাহিদশার কথা বিবেচনা করে মূলত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। কিন্তু এসব বিষয়াদি ঠিকই নোট করা হচ্ছে যা আগামীতে সময়মত ঠিকই সুদে আসলে ফেরত দেয়া হবে।

তবে এবার করোনা পরিস্থিতিতে খন্দকার পরিবারের দুই সদস্য তৈমূর আলম খন্দকার ও মাকসুদুল আলম খন্দকার খোরশেদ নেতাকর্মী ও জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে সবাইকে তাঁক লাগিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সে দিক থেকে খন্দকার বলয়ের প্রতিদ্বন্দ্বীরা একেবারে গৃহবন্দি ছিল। জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান একেবারে নিখোঁজ ছিল। তার পথ ধরে হেঁটেছেন মহানগর বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম। যদিও কালাম অনুসারীদের কেউ কেউ নামে মাত্র ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করেছেন। তবে এসব লোক দেখানো সহায়তায় বরাবরের মত পিছিয়ে আছে এই বলয়টি। এমনকি দলীয় কর্মসূচিতে এসব বলয়ের নেতাকর্মীদের বরাবরের মত সুবিধাবাদী চরিত্রে দেখা গেছে। ক্ষমতাসীন ও পুলিশের চোখ রাঙানিতে নিজেদের গাঁ বাচাতে কখনো তাদের সাথে গোপন আতাঁত করেছে আবার কখনো দলীয় কর্মসূচি থেকে বিরত রয়েছে। আর তাতে করে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছে বেশ সমালোচিত হয়েছে।


বিভাগ : রাজনীতি


নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আরো খবর
এই বিভাগের আরও