৮ বৈশাখ ১৪২৫, রবিবার ২২ এপ্রিল ২০১৮ , ৮:৫৫ পূর্বাহ্ণ

Kothareya1150x300

‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’


সিটি করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৮:৫৮ পিএম, ২৩ মার্চ ২০১৮ শুক্রবার | আপডেট: ১০:৩২ এএম, ২৪ মার্চ ২০১৮ শনিবার


ফাইল ফটো

ফাইল ফটো

নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে শনিবার ২৪ মার্চ থেকে শুরু হরে স্নানোৎসব। ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় সংকীর্নতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় হিন্দু পুন্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুরু হয়েছে।

হিন্দু পুন্যার্থীদের মতে পবিত্র নদ ব্রহ্মপুত্রে স্নানমন্ত্র পাঠপূর্বক নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী ফুল, বেলপাতা, ধান, দুর্বা, হরতকী, ডাব, আম্রপল্লব ইত্যাদি দিয়ে পিতৃকূলের উদ্দেশ্যে তর্পণ করে ভক্তরা। স্নান শুরু পরে আশেপাশের মন্দিরগুলোতে সাধু সন্যাসীরা সমবেত হয়ে ভক্তিমূলক গান, বাজনা শুরু হয়।

স্নান উপলক্ষ্যে লাঙ্গলবন্দের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে মেলা। তবে নিরাপত্তার জন্য ঘাটের পাশের সড়কে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পাপ মোচনের আশায় নারায়ণগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদে প্রতিবছর চৈত্রের মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে স্নান করতে আসেন দেশ বিদেশের সনাতন ধর্মালম্বীদের লাখ লাখ পুন্যার্থী। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্য স্নান করলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়।

হিন্দু ধর্মালম্বীদের তিথি অনুযায়ী শনিবার ২৪ মার্চ সকাল ১০টা ১৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডে মহাষ্টমী স্নানোৎসবের লগ্ন শুরু হবে। লগ্ন রোববার ২৫ মার্চ পরদিন সকাল ৭টা ৫২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত তিথি রয়েছে।

বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সদস্য রনজিৎ মোদক জানান, এবার ললিত সাধুর ঘাট, অন্যপূর্ণ ঘাট, রাজ ঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মা কুঁড়ি সাধুর ঘাট, মহাত্মা গান্ধী ঘাট, বড় দেশ্বরী ঘাট, জয়কালি ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, প্রেম তলা ঘাট, চর শ্রীরাম ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাটে স্নান করা হবে।

লাঙ্গলবন্ধ স্নান উৎসব উদযাপন পরিষদের কার্যকরী সদস্য ও বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ নারায়ণগঞ্জ জেলার সভাপতি শংকর সাহা বলেন, এবছর স্নানের তিথি দুইদিনে হওয়ায় ভক্তরা শান্তিপূর্ণভাবে স্নান করতে পারবে। ২০০ থেকে ২৫০ স্বেচ্ছাসেবক কর্মী ২৪ ঘণ্টা কাজ করে যাবে। বিদ্যুৎতের বিকল্প হিসেবে এবারই প্রথম হাই পাওয়ারের ২টি জেনারেটার থাকবে। ১৬টি ঘাটের ৩৬টি পয়েন্টে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকবে।

লাঙ্গলবন্ধ স্নান উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি সরোজ কুমার সাহা বলেন, ‘পুণ্যার্থীদের জন্য ১০০টি অস্থায়ী পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ৬০টি গভীর নলকূপ সহ ট্যাংকের সাহায্যে অস্থায়ী বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা থাকবে।’

নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার মঈনুল হক বলেন, ‘কঠোর ব্যবস্থা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ১২শ বেশি পুলিশ সদস্য সেখানে নিরাপত্তায় থাকবে। তার মধ্যে টহল পুলিশ, সাদা পোশাকে, ট্রাফিক সার্বক্ষনিক কাজ করবে।’

লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার কাহিনী
লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরান মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুষেণ, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।  

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ধর্ম -এর সর্বশেষ