৩ আশ্বিন ১৪২৫, মঙ্গলবার ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ , ৮:২৫ অপরাহ্ণ

‘আমার পাপ হরণ কর’ স্নানোৎসবের চমকপ্রদ কাহিনী


স্পেশাল করেসপনডেন্ট || নিউজ নারায়ণগঞ্জ

প্রকাশিত : ০৩:৪২ পিএম, ২৪ মার্চ ২০১৮ শনিবার


‘আমার পাপ হরণ কর’ স্নানোৎসবের চমকপ্রদ কাহিনী

নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে শনিবার ২৪ মার্চ সকালে শুরু হয়েছে স্নানোৎসব। ‘হে মহাভাগ ব্রহ্মপুত্র, হে লৌহিত্য আমার পাপ হরণ কর’ এ মন্ত্র উচ্চারণের মধ্য দিয়ে জগতের যাবতীয় সংকীর্নতা ও পঙ্কিলতার আবরণে ঘেরা জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় হিন্দু পুন্যার্থীরা ব্রহ্মপুত্র নদে অষ্টমী স্নান শুরু করে।

হিন্দু ধর্মালম্বীদের তিথি অনুযায়ী শনিবার ২৪ মার্চ সকাল ১০টা ১৪ মিনিট ১০ সেকেন্ডে মহাষ্টমী স্নানোৎসবের লগ্ন শুরু হয়। লগ্ন রোববার ২৫ মার্চ সকাল ৭টা ৫২ মিনিট ৫০ সেকেন্ড পর্যন্ত তিথি রয়েছে। পুণ্যার্থীদের বিশ্বাস তিথির নির্দিষ্ট সময়ে ব্রহ্মপুত্র নদে পুণ্য¯œান করলে সব পাপ মোচন হয়ে যায়।

অন্য বছরের মতো এবারও নদের ১৪টি ঘাটে স্নানোৎসবে জীবন থেকে পাপমুক্তির বাসনায় বাংলাদেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের লাখ লাখ সনাতন পুন্যার্থী যোগ দিবেন আশা করছেন আয়োজকেরা। ২ বছর আগে গুজবে ১০ পুন্যার্থীর মৃত্যু হলেও এবার সেটার প্রভাব পড়বে না মনে করছেন আয়োজকেরা।

বাংলাদেশ হিন্দু কল্যাণ সংস্থার কেন্দ্রীয় সদস্য রনজিৎ মোদক জানান, এবার ললিত সাধুর ঘাট, অন্যপূর্ণ ঘাট, রাজ ঘাট, কালীগঞ্জ ঘাট, মা কুঁড়ি সাধুর ঘাট, মহাত্মা গান্ধী ঘাট, বড় দেশ্বরী ঘাট, জয়কালি ঘাট, রক্ষাকালী ঘাট, প্রেম তলা ঘাট, চর শ্রীরাম ঘাট, সাবদি ঘাট, বাসনকালী ও জগৎবন্ধু ঘাটে স্নানে প্রচুর লোকজনের সমাগম ঘটেছে।

সকালে সরেজমিনে দেখা যায়, পুলিশ ও র‌্যাবসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আগত সকলকে বিশেষভাবে তল্লাশি করা হচ্ছে, কাউকে মোবাইল ফোনে ছবি তুলতে দেয়া হচ্ছেনা। রয়েছে পুলিশ ও র‌্যাবের বিশেষ টহল।

নদীতে প্রতিটি ঘাটকে কেন্দ্র করে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বিশেষ টহলসহ মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং যারা সাতার না জানেন তাদেরকে পানিতে নামতে বিশেষ সাবধানতা অবলম্বন করা হয়েছে। খানিক দূরে দূরে মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে যেন কেউ হারিয়ে গেলে তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নেয়া যায়।

স্নান উপলক্ষে ৩৩টি ধর্মীয় স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সেবামূলক সংগঠন পূণ্যার্থীদের সেবা দিতে ক্যাম্প স্থাপন করেছে। এসব ক্যাম্প থেকে পূণ্যার্থীদের রান্না করা খাবার ও চিকিৎসা সেবা দেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় সংসদ সদস্য একেএম সেলিম ওসমান জানান, স্নান উৎসব শান্তিপূর্ণভাবে এবং সুন্দরভাবে করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।

লাঙ্গলবন্ধ স্নানোৎসব উদযাপন পরিষদের কার্যকারী সদস্য শংকর সাহা বলেন, এবছর স্নানের তিথি দুইদিন হওয়ায় ভক্তরা শান্তিপূর্ণভাবে স্নান করতে পারছেন।

স্নান উপলক্ষ্যে লাঙ্গলবন্দের কয়েক কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসেছে মেলা। তবে নিরাপত্তার জন্য ঘাটের পাশের সড়কে সকল প্রকার যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার কাহিনী
লাঙ্গলবন্দ স্নান এবং নদের উৎপত্তি সর্ম্পকে চমৎকার এক কাহিনী প্রচলিত আছে। হিন্দু পুরান মতে, ত্রেতাযুগের সূচনাকালে মগধ রাজ্যে ভাগীরথীর উপনদী কৌশিকীর তীর ঘেঁষে এক সমৃদ্ধ নগরী ছিল, যার নাম ভোজকোট। এ নগরীতে ঋষি জমদগ্নির পাঁচ পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রথম সন্তানের নাম রুষন্নন্ত, দ্বিতীয় পুত্রের নাম সুষেণ, তৃতীয় পুত্রের নাম বসু, চতুর্থ পুত্রের নাম বিশ্বাসুর, পরশুরাম ছিলেন সবার ছোট। পরশুরামের জন্মকালে বিশ্বজুড়ে চলছিল মহাসঙ্কট। একদিন পরশুরামের মা রেণুকা দেবী জল আনতে গঙ্গার তীরে যান। সেখানে পদ্মমালী (মতান্তরে চিত্ররথ) নামক গন্ধবরাজ স্ত্রীসহ জলবিহার করছিলেন (মতান্তরে অপ্সরী গণসহ)। পদ্মমালীর রূপ এবং তাদের সমবেত জলবিহারের দৃশ্য রেণুকা দেবীকে এমনভাবে মোহিত করে যে, তিনি তন্ময় হয়ে সেদিকে তাকিয়ে থাকেন। অন্যদিকে ঋষি জমদগ্নির হোমবেলা পেরিয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তার মোটেও খেয়াল নেই। সম্বিত ফিরে পেয়ে রেণুকা দেবী কলস ভরে ঋষি জমদগ্নির সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ান। তপোবলে ঋষি জমদগ্নি সবকিছু জানতে পেরে রেগে গিয়ে ছেলেদের মাকে হত্যার আদেশ দেন। প্রথম চার ছেলে মাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু পরশুরাম পিতার আদেশে মা এবং আদেশ পালন না করা ভাইদের কুঠার দিয়ে হত্যা করেন। পরবর্তীকালে পিতা খুশি হয়ে বর দিতে চাইলে তিনি মা এবং ভাইদের প্রাণ ফিরে চান। তাতেই রাজি হন ঋষি জমদগ্নি। কিন্তু মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে কুঠার লেগেই থাকে। অনেক চেষ্টা করেও সে কুঠার খসাতে পারেন না তিনি। এক পর্যায়ে পিতার কথামত পরশুরাম তীর্থে তীর্থে ঘুরতে লাগলেন। শেষে ভারতবর্ষের সব তীর্থ ঘুরে ব্রহ্মপুত্র পুণ্যজলে স্নান করে তার হাতের কুঠার খসে যায়। পরশুরাম মনে মনে ভাবেন, এই পুণ্য বারিধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করে দিলে মানুষ খুব উপকৃত হবে। তাই তিনি হাতের খসে যাওয়া কুঠারকে লাঙ্গলে রূপান্তর করে পাথর কেটে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে মর্ত্যলোকের সমভূমিতে সেই জলধারা নিয়ে আসেন। লাঙ্গল দিয়ে সমভূমির বুক চিরে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন তিনি। ক্রমাগত ভূমি কর্ষণজনিত শ্রমে পরশুরাম ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বর্তমান নারায়ণগঞ্জ জেলার বন্দর থানায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করেন। এই জন্য এই স্থানের নাম হয় লাঙ্গলবন্দ। এরপর এই জলধারা কোমল মাটির বুক চিরে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। পরবর্তীকালে এই মিলিত ধারা বঙ্গোপসাগরে গিয়ে পড়েছে।  

নিউজ নারায়ণগঞ্জ এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

আপনার মন্তব্য লিখুন:
Shirt Piece

ধর্ম -এর সর্বশেষ